এ রকমই একজন বিধান চেয়ারম্যান। নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি থাকতেই শোনা গিয়েছিলো ইউপি চেয়ারম্যান বিধান চন্দ্র চৌধুরীর কথা।
শাল্লার বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিধান চন্দ্র চৌধুরী। এই জনপদের প্রায় প্রত্যেক কৃষকই কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছিলেন তাকে। বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে তারা সাথে পেয়েছিলেন বিধান চেয়ারম্যানকে।
সবার মুখে প্রশংসা শুনে ইচ্ছে হলো তার সাথে দেখা করার। রওনা দিলাম তাই বাহাড়া ইউনিয়নের পথে।
খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষ্ণপুর থেকে নৌকায় পুরো ছায়ার হাওর পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় বাহাড়া ইউনিয়নে। ছায়ার হাওরের অপরপ্রান্তে শাল্লা উপজেলার এই বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ। যেতে লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। শাল্লা কলেজ ঘাটে নেমে বিধান চেয়ারম্যানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই পথ দেখিয়ে দিলো সবাই।
দুপুর নাগাদ পৌঁছানো গেল ৩ নং বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে। ইউপি ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, এলাকার লোকজন নিয়ে সেখানে বসে আছেন একজন লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান লোক। তিনিই বিধান চেয়ারম্যান।
পরিচয় দেয়ার আগেই বসতে দিলেন নিজের পাশের চেয়ারে। আন্তরিক এই মানুষটির কাছে জানা গেল হাওরাঞ্চল এবং এবারের ঢলে এই এলাকার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা শাল্লা। চারটি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ হাজার পরিবারের প্রায় সবাই। উপজেলার কোনো কৃষক কাটতে পারেননি এক গোছা ধানও।
হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাওরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছায়ার হাওর ও ভান্ডার বিল পড়েছে এই শাল্লায়। এই দুই হাওর এবং হাওর সংলগ্ন ছোট ছোট বিলগুলোতে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছিলো হাজার হাজার হেক্টর জমিতে। এসব বিলের কোনো জমিতে আর ধানের চিহ্ন মাত্র নেই। যেদিকে তাকানো যায় সবদিকে শুধু পানি আর পানি। পানিতে পানিতে সাদা হয়ে গেছে চারিদিক।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম গাফিলতিতে যখন ফসল রক্ষা বাঁধগুলো প্রায় ডুবুডুবু। তখন বসে ছিলো না হাওরাঞ্চলের কৃষক। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে বাঁধ রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাজার হাজার কৃষক।
বিধান চেয়ারম্যান জানালেন, ৪ এপ্রিল অর্থাৎ চৈত্র মাসের ২১ তারিখে বাঁধ ভাঙ্গে বরাম হাওর পয়েন্টে। বরাম হাওর প্লাবিত হওয়ায় পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে ৫ তারিখে ভেঙ্গে যায় ৫ ভান্ডার বিল। সেই পানির চাপে ফাঁটল ধরে ছায়ার হাওরের ভেলানগর পোতার মুখ পয়েন্টে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও খুব একটা গা করেনি তারা। হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁধ রক্ষার কাজে। এ সময় পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় ফাঁটল স্বল্প সময়ের মধ্যে মেরামতের জন্য পাউবোর কাছে স্থানীয় ইউএনও মাসুম বিল্লাহর মাধ্যমে চাওয়া হয় এক্সেভেটর। কিন্তু সুনামগঞ্জ থেকে কোনো সাড়া না আসায় স্থানীয়রা তাদের সাধ্যে যতটুকু আছে ততটুকু সামর্থ্য দিয়েই চেষ্টা করে যায় বাঁধের ফাঁটল মেরামতের।
এভাবে তারা নয় এপ্রিল পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে পারেন বাঁধের ফাঁটলকে। এ সময় ফাঁটল ধরে কাছাকাছি ছায়ার হাওরে সুলতানপুরের মাউতির বাঁধেও। খবর পেয়ে কোদাল গাইতি নিয়ে কৃষকদের নিয়ে সেখানেও ছোটেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। দুটি পয়েন্টেই বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয় পুরো ছায়ার হাওর।
স্থানীয়রা জানালেন, বাঁধ রক্ষার এই সংগ্রামে তারা পেয়েছিলেন বিধান চেয়ারম্যানকে। কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক ফারুক, নুরুল আমিন, জুয়েল রানা, স্থানীয় বাজার কমিটির সেক্রেটারি মশিউর রহমান রনি, মাহমুদ নগরের মিষ্টির দোকানি প্রশান্ত মোদক, ইউপি সদস্য প্রসেনজিৎ জানান, বাঁধ রক্ষার কাজে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিলেন বিধান চেয়ারম্যান। নিজের উদ্যোগে তিনি বাঁধ রক্ষার কাজে যোগ দেয়া গ্রামবাসীর জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন চিড়া মুড়ির।
বিধান চেয়ারম্যান জানালেন, হাজার হাজার কৃষকের জন্য চিড়ার যোগান দিতে শেষ হয় শাল্লা উপজেলা সদরের সব চিড়ার দোকানের চিড়া। চিড়া আনানো হয় পার্শ্ববর্তী দিরাই থেকে। এভাবেই তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন বাঁধ রক্ষার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁধ রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা এখনও পোড়ায় বিধান চেয়ারম্যানকে। বিধান চেয়ারম্যান জানান, যেদিন বাঁধ ভেঙ্গে যায়, সেদিন বুক ফেটে কান্না বের হয়েছিলো তার। এত চেষ্টার পরও বাঁধ রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা এখনও তাকে দংশন করে। এ দুঃখ ভোলা তার জন্য অনেক কঠিন।
এভাবেই এ রকম আরও বিধান চন্দ্রের অবদান হাওরে ভেসে গেছে ভারত থেকে নেমে আসা অকাল ঢলে। এই লোকগুলোর নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টাই যা একটু সান্ত্বনা যোগায় সর্বস্ব হারানো হাওরবাসীর হৃদয়ের ক্ষতে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৪২ ঘণ্টা, মে ১৩, ২০১৭
আরআই/জেডএম/
** পাউবোর গাফিলতি-দুর্নীতিকেই দুষলেন ছায়ার হাওরের কৃষকরা
** কোমর ভাঙলো হাওরের ‘বড় গেরস্থদের’
** ‘ছাবনি’ ধানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম রাজিয়া-নজরুলদের
** ‘দেহি যদি কিছু মেলে’
** প্রতি ওয়ার্ড-পরিবারে ওএমএস-ভিজিএফ চান চেয়ারম্যান সোহাগ
** হাওরের জলে অপরূপ সূর্যাস্ত
** নাড়ি ছেঁড়া ধনে টান কৃষকের
** হাওর ডোবার দায় নিলেন না কিশোরগঞ্জের পাউবো কর্তারা
** সরকার হাওরবাসীকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখবে
** অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনি
** হাওরের বুকে ‘কালবৈশাখী’ দর্শন