স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে তাই লেগুনায় চেপে বসলাম। সুনামগঞ্জ থেকে লেগুনা সার্ভিসগুলো বেশ ভালো।
লেগুনায় আমার সিটের মুখোমুখি বসেছিলেন চেক শার্ট ও লুঙ্গি পরিহিত এক ভদ্রলোক। পরিচয় জিজ্ঞেস করতে বললাম সাংবাদিক। শাল্লা থেকে আসছি।
শাল্লা থেকে আসার খবর পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বরাম হাওর দেখেছি কি না। জানালাম শাল্লা থেকে দিরাই আসার পথে বরাম হাওরও দেখে এসেছি।
ভদ্রলোক জানালেন, শাল্লা ও দিরাই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের জন্য বরাম হাওর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সুরমা হয়ে কালনি নদীর পানি বাধাপ্রাপ্ত হয় এই বরাম হাওরে। কালনি নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় দ্রুত পানি প্রবাহিত হওয়া সম্ভব হয় না। ফলে নদীর দুই কূল উপচে পানি প্রবেশ করে আশপাশের হাওরে।
ভদ্রলোকের নাম কামাল হোসেন। তার বাড়ি দিরাইয়ের তাড়ল ইউনিয়নে। বরাম হাওরের তীরে ধল গ্রামে। গ্রামের অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারের মধ্যে তাদের পরিবার অন্যতম। বরাম হাওরে এবার তার ৬২ কানি জমির ধান ডুবে গেছে অকাল প্লাবনে।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তুলে ধরলেন তার এলাকার ক্ষয়ক্ষতির নানা চিত্র। কামাল হোসেনের মতে প্রতি বছর বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি দিরাই-শাল্লার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় প্রবেশ করে সুরমা ও সুরমার শাখা নদী কালনি হয়। মূলত কালনি নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত এই পানি ধারণ করে রাখতে পারে না নদীর বুক। কালনি হয়ে পাহাড়ি ঢল ধাক্কা দেয় বরাম হাওরে। বরাম হাওরে পানি ঢোকার পর সেই পানি প্রবেশ করে ছায়ার হাওর, ভান্ডার বিল হাওরসহ আশপাশের প্রায় সব হাওরে। তাই বরাম হাওরে বাঁধ ছুটলে অন্য হাওরগুলোও আর রক্ষা পায় না।
কামাল হোসেনের কথায় ‘বরাম হাওর রক্ষা পেলে বাঁচবে, আশপাশের ৪০টি হাওর ও বিল। ’ আর বরাম হাওরে পানির প্রবেশ রোধ করা গেলে অকাল প্লাবন থেকে রক্ষা পাবে এ সব বিল ও হাওর।
শাল্লা থেকে দিরাই যাওয়ার পথে পড়ে বরাম হাওর। বরাম হাওরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কালনি নদী ও কুশিয়ারার শাখা দাড়াইন নদী। হাওরের চারদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট বড় হাওর ও বিল। বরাম হাওরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে ভাণ্ডার বিল হাওর ও ছায়ার হাওর। পূর্ব দিকে রয়েছে হুরামান্দারি হাওর এবং টাঙ্গুয়া হাওর, উত্তর দিকে সুরমা নদী, চাপতির হাওর, শানঘাইর হাওর আর পশ্চিম দিকে পড়েছে উদগল হাওর এবং কালিকোটা হাওর। এছাড়া এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাওর দেখার হাওরসহ আরও বেশ কয়েকটি হাওরের সংযোগ রয়েছে এই বরাম হাওরের সঙ্গে।
কামাল হোসেনের মতে বরাম হাওরই দিরাই শাল্লার হাওর এলাকার মূল মুখ। কালনি ও সুরমার পানি বরাম হাওর হয়েই এ অঞ্চলের অন্যান্য হাওরে প্রবেশ করে। তাই তার দাবি, যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাম হাওরকে রক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতো তাহলে হয়তো বেঁচে যেত দিরাই-শাল্লার আরও অনেকগুলো হাওর ও বিলের ফসল।
তার কথায় সমর্থন জানালেন পাশের সিটে বসা একই এলাকার আলি আহমেদ। বরাম হাওরে তারও প্রায় শতাধিক বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে এবারের ঢলে।
বরাম হাওর তলিয়ে যাওয়ার কারণ কি? প্রশ্নের জবাবে আলি আহমেদ দুষলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার এবং পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সদস্যদের।
আলি আহমেদের দাবি, ঠিকাদাররা বাঁধে ঠিকমতো কাজই করেনি। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিআইসি সদস্যরা তাদের কাজে অবহেলা করেছে।
আলি আহমেদ জানান, বাঁধ মেরামতের কাজ করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিআইসি সদস্যদের পাউবোতে ঘুষ দিতে হয়েছে। কাজ এনে পিআইসিরা আবার সাব কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়েছেন আরেকজনকে। সেই সাব কন্ট্রাক্টররা কোনোমতে নাম কা ওয়াস্তে মাটি ফেলেছেন বাঁধে। আর এসব কাজে কোনো তদারকি ছিলো না পাউবোর। এছাড়া বাঁধের কাজে পিআইসিদের উপর অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে বখরা আদায় করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল। যাদের অনেকেই আবার ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ অবস্থার অবসানে সেনাবাহিনীর দিয়ে বাঁধ মেরামতের কাজের দাবি জানালেন আলি আহমেদ।
** পাউবোর জবাবদিহিতা চান দিরাই-শাল্লার এমপি জয়া সেন
** হাওরে বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ের বীর একজন বিধানচন্দ্র
** পাউবোর গাফিলতি-দুর্নীতিকেই দুষলেন ছায়ার হাওরের কৃষকরা
** কোমর ভাঙলো হাওরের ‘বড় গেরস্থদের’
** ‘ছাবনি’ ধানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম রাজিয়া-নজরুলদের
** ‘দেহি যদি কিছু মেলে’
** প্রতি ওয়ার্ড-পরিবারে ওএমএস-ভিজিএফ চান চেয়ারম্যান সোহাগ
** হাওরের জলে অপরূপ সূর্যাস্ত
** নাড়ি ছেঁড়া ধনে টান কৃষকের
** হাওর ডোবার দায় নিলেন না কিশোরগঞ্জের পাউবো কর্তারা
** সরকার হাওরবাসীকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখবে
** অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনি
** হাওরের বুকে ‘কালবৈশাখী’ দর্শন
বাংলাদেশ সময়: ২০০৫ ঘণ্টা, মে ১৪, ২০১৭
জেডএম/