কথাগুলো বলছিলেন ৬৫ বছর বয়সী বানভাসি বৃদ্ধ আশরাফ আলী।
তিনি আরও বলেন, আমরা মানুষ নিজেগো খিদার কতা কইবার পাইরতাছি-কিন্তু বোবা জানোয়ারগুলোর কষ্ট কেডায় দেহে।
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শহীদ এম মনসুর আলী ইকোপার্ক আশ্রয় কেন্দ্রে আশরাফ আলীর মত শতাধিক বানভাসি মানুষ পলিথিনের তাবু দিয়ে তাদের গবাদি পশুসহ বসবাস করছেন।
সোমবার (২২ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গেলে এসব মানুষের পাশাপাশি গরু-ছাগল ও হাস মুরগির কষ্টের চিত্র দেখা যায়।
মাইজবাড়ি ইউনিয়নের মাইজবাড়ি চরের বৃদ্ধ আজিজুর রহমান বলেন, বন্যার পানিতে খড়ের পালা ডুইব্যা গেছে আজ প্রায় ১০ দিন। ডুবন্ত পালা থেইক্যা কিছুটা পচা খড় আইনা গরুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাছি। কিন্তু কিছুতেই তা নিতাছে না। এখন গরুর কষ্ট দেইখা আমাগোরে কান্দন আসতাছে।
নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের ফুলজোড় গ্রামের আয়েজ উদ্দিন ১৬টি গরু পালন করেন। গরু থেকে পাওয়া আয় দিয়েই তার সংসার চলে। গরুগুলোকে কোনমতে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে পারলেও দিতে পারছেন না খাবার। এতে তার গরুর দুধ উৎপাদনও অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি।
একই ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের মালেকা খাতুন বলেন, ৬টি গরুর মধ্যে ষাড় রয়েছে চারটি। গত ৭ দিনে ঠিকমতো খাবার দিতে না পারায় হাড়গোর বেড়িয়ে গেছে। প্রতি গরুর ওজন পাঁচ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানান তিনি।
খাস রাজবাড়ী ইউনিয়নের ভাটি মেওয়াখোলা গ্রামের আশরাফ হোসেন বলেন, আমরা চরের ঘাস খাইয়েই গরু লালন-পালন করি। কিন্তু বানের পানিতে সব চরই ডুবে গেছে। দু’এক বোঝা খড় কিন্যা খাওয়ামু সে সামর্থ্য আমাদের নেই।
কথা হয় গরু খামারি ফুলজোড় গ্রামের শিরিনা খাতুন, আব্দুল খালেক, মোতালেব হোসেন, পোড়াবাড়ি গ্রামের আব্দুল বারিক, লেবু, সুখিতন বেগম, শ্রীপুর গ্রামের মুকুলসহ অনেকের সঙ্গে।
বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে গো-খামারিরা বলেন, বন্যায় মানুষের চেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে গরু-ছাগল আর ভেড়া। অনেকে দু’দিনে একবারও খাবার তুলে দিতে পারছেন না বোবা প্রাণীগুলোর মুখে। চরাঞ্চলের অধিকাংশ চাষিদের খড়ের পালা ডুবে গেছে। উঁচু স্থানে যাদের খড়ের পালা ছিল-তারা চড়া দামে সেগুলো বিক্রি করছেন।
চাষিরা বলেন, এখন ছোট্ট এক বোঝা খড় কিনতে দাম লাগছে ৫শ’থেকে ৭শ’ টাকা। এ রকম চড়া দামে খড় কেনার সামর্থ্য নেই ক্ষুদ্র এসব খামারিদের। অপরদিকে চালের কুড়া, গমের ভূষির মূল্যও দিগুণ বেড়ে গেছে বলে জানান তারা।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজিপুর ছাড়াও জেলার সবচেয়ে বেশি দুগ্ধ উৎপাদন এলাকা শাহজাদপুরের রুপবাটি, পোতাজিয়া, কৈজুরী, পোরজনা, গালা, সনাতনি, জালালপুর ইউনিয়নেও গো-খাদ্যেও চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
পোরজনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা এলেও গবাদি পশুর খাদ্য সরবরাহ করা হয় না। আর দুগ্ধ সমৃদ্ধ শাহজাদপুরে হাজার হাজার গরু ভয়াবহ খাবার সংকটে রয়েছে। এতে গরুর দুধের উৎপাদনের পাশাপাশি মাংসের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া গো-খাদ্য সংকটের কথা স্বীকার করে বাংলানিউজকে বলেন, বন্যা কবলিত পাঁচটি উপজেলায় ৭৬ হাজার গরু, পাঁচ হাজার ছাগল, দুই হাজার ভেড়া ও দুই লাখ হাস-মুরগি বাঁধ কিংবা আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে। জেলার ১৩৪ একর নেপিয়ার ঘাষ সম্পূর্ণ ডুবে গেছে যার আনুমানিক মূল্য ৭৫ লাখ টাকা।
এছাড়াও সব গোচারণ ভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যে কারণে এসব প্রাণীগুলো চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে। সম্প্রতি সদর উপজেলা চেয়ারম্যানের দেওয়া তিন টন গো-খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের কাছে ক্যাটল ফিড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি এসিআই ও আমান ফিড কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যদি মানবিক কারণে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবে এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা কবলিত অঞ্চলগুলোতে পাঁচটি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম গবাদি পশুর যেকোন রোগের চিকিৎসায় কাজ করছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৫২০ ঘণ্টা, জুলাই ২৩, ২০১৯
আরএ