ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ০৭ জুলাই ২০২২, ০৭ জিলহজ ১৪৪৩

জাতীয়

যেভাবে ফেরত আনা হবে পি কে হালদারকে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩১১ ঘণ্টা, মে ১৭, ২০২২
যেভাবে ফেরত আনা হবে পি কে হালদারকে ফাইল ছবি

ঢাকা: দেশের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে ১০ হাজার কোটি টাকা নানা কৌশলে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছেন প্রশান্ত কুমার ওরফে পি কে হালদার। পাঁচ সহযোগীসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দেশটির আর্থসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি।

 

পি কে হালদারকে কূটনৈতিক (ডিপ্লোম্যাটিক) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। মঙ্গলবার (১৭ মে) এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকায় অবস্থিত ইন্টারপোলের শাখা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা।  

রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে থাকার সময়ই পি কে অর্থ লুটপাট শুরু করেন। তিনি তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধবদের আরও কয়েকটি লিজিং কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক পদে বসান। এরপর তাদের সহযোগিতায় ঋণের নামে বিভিন্ন কৌশলে ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেন। এসব অর্থ সিঙ্গাপুর, কানাডা ও ভারতে পাচার করেন পি কে হালদার।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ১৪ মে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরের একটি বাড়ি থেকে পি কে হালদার সহ তার পাঁচ সহযোগীকে গ্রেফতার করে ইডি। তাদের তিন দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (১৭ মে) পশ্চিমবঙ্গের আদালতে তোলা হয়েছে।  

পি কে হালদার গ্রেফতারের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি ভারত। তবে ঢাকায় অবস্থিত ইন্টারপোল শাখা থেকে পি কে হালদারকে গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চেয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই চিঠির কোনো জবাব এখনও পায়নি ঢাকায় অবস্থিত ইন্টারপোলের শাখা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত ইন্টারপোলের শাখা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এআইজি-এনসিবি) মহিউল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, পি কে হালদার গ্রেফতারের বিষয়ে ভারতের নয়া দিল্লির এনসিবি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছুই জানায়নি। আমরা বরং রোববার নয়া দিল্লির এনসিবি’কে একটি চিঠি দিয়েছি। ওই চিঠির কোনো উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।  

পি কে হালদারকে দেশে ফেরত আনার বিষয়ে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ভারত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে তারপর পি কে হালদারকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কারণ পি কে হালদারকে অবশ্যই ডিপ্লোম্যাটিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত আনা হবে।

এদিকে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, ভারত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পর আমরা পি কে হালদারকে দেশে ফেরত আনার বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু করবো। তারপর তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইগত সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।  

পি কে হালদার অবৈধভাবে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। এ বিষয়ে ভারতের প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। ওই বিচার শেষ না হলে তাকে ফেরত নাও পাঠাতে পারে ভারত। এতে কিছুটা দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। মন্তব্য ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের।   

ভারতের অর্থসংক্রান্ত গোয়েন্দা সংস্থা ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তাদের এক বিবৃতিতে বলেছে, হাজার কোটি টাকা পাচারকারী পি কে হালদার নাম পাল্টে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে বসবাস করতেন। প্রদেশের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরের একটি বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। ১৪ মে সেখানে অভিযান চালিয়ে পি কে হালদারসহ মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ভারতে পি কে হালদারের পাচার করা টাকায় গড়া বিপুল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে  সেখানকার গোয়েন্দারা। পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বাড়ি ও কয়েকশ বিঘা সম্পত্তি। একইসঙ্গে তল্লাশিতে কলকাতা ও এর আশপাশের বিভিন্ন জেলায় বেআইনি আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হদিস মিলেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, পি কে হালাদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কমিশন এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করতে সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়াকে প্রধান করে টিম গঠন করে।  

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় পি কে হালদারের সঙ্গে ৮৪ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতায় এখন পর্যন্ত ৮৩ ব্যক্তির প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের মাধ্যমে আটকে দিয়েছে দুদক। অনুসন্ধান চলাকালে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য ৬৪ জনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নির্দেশনার দেওয়ার আগেই পি কে হালদার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ইতোমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ চাহিদা করা নথিপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

দুদক সূত্র আরও জানায়, পি কে হালদারের একাধিক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট করে তা থেকে কোটি কোটি টাকা বান্ধবীদের দিয়েছেন তিনি।   

এছাড়াও পি কে হালদার তার বান্ধবীদের নিয়ে বিভিন্ন সময় বিদেশে ঘুরতে গিয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পি কে হালদার তার বান্ধবী নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়ালকে নিয়ে ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।  

এছাড়াও পি কে হালদার যখন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন, তখন তার বান্ধবী নাহিদা রুনাইকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের কর্ণধার এবং পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার ক্রয় করে সেখানে অবন্তিকাকে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার করেন।

দুদকের সূত্র জানায়, পি কে হালদার সিন্ডিকেটের সদস্যরা ৩০টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে দুই হাজার ৫০০ কোটি, ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে দুই হাজার ২০০ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে দুই হাজার ৫০০ কোটি এবং পিপলস লিজিং থেকে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন। ফাস ফাইন্যান্স থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করা পি কে হালদারের ২২টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ২০টিই ভুয়া।

বাংলাদেশ সময়: ১৩১১ ঘণ্টা, মে ১৭, ২০২২
এসজেএ/এসএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa