ঢাকা, শনিবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯, ২০ আগস্ট ২০২২, ২১ মহররম ১৪৪৪

অর্থনীতি-ব্যবসা

তিন হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১১৩১ ঘণ্টা, জুলাই ৬, ২০২২
তিন হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড

ঢাকা: রপ্তানি আয় প্রথমবারের মতো এক অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও আমদানি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি মে শেষে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারে (তিন হাজার ৮১ কোটি ডলার) ঠেকেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।  

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মে পর্যন্ত আমদানি ব্যয়ের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ হলেও জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত পুরো বছরের আমদানির তথ্য এখনও আসেনি।  

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মে পর্যন্ত অর্থবছরের ১১ মাসে রপ্তানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় এবং রেমিটেন্সে নেতিবাচক ধারা বজায় থাকায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ৩০ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।  আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ঘাটতি বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ (১০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার)।  আগের অর্থবছরের আলোচিত সময়ে যা ছিল ২০ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।

এর প্রভাবে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ঘাটতিও ১৭ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার পার করেছে, যেটিও ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।  এক মাস আগেও এপ্রিল শেষে যা ছিল ১৫ দশামিক ৪২ বিলিয়ন ডলার।  আর গত বছরের মে থেকে এক বছরের ব্যবধানে চলতি হিসাবের এ ঘাটতি ৬ গুণের বেশি বেড়েছে।  ২০২০-২১ অর্থবছরের মে মাসে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭৫ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৯ শতাংশ। এক মাস আগে এপ্রিলে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৮ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।  অপরদিকে মে শেষে রপ্তানি আয় এসেছে ৪৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।  গত বছরের মে মাসের তুলনায় বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ হিসাবে গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের মে শেষে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।  এ সময়ে আমদানি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে পেট্রোলিয়াম এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য।  মূলধনী যন্ত্রপাতি রয়েছে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে।  

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি এ পর্যায়ে যাবে তা আগেই অনুমান করে ছিলাম। ঘাটতি কমিয়ে আনতে ডিমান্ড কাট (চাহিদা কমিয়ে আনতে হবে) করতে হবে প্রথমেই।  সরকার ইতোমধ্যে কিছু নীতি গ্রহণ করেছে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে, যেমন নতুন গাড়ি ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।  এরকম কিছু সিদ্ধান্তের ফলে ৪০ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারি পর্যায় আরও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন, কিছু পণ্যের যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে৷ দাম বাড়লে মানুষ সচেতন হয়ে ব্যবহার তথা চাহিদা কমাবে।  দ্বিতীয়ত বিনিময় হার আরও বাড়ার সুযোগ দিতে হবে।  তাহলে একটি পর্যায়ে টাকা স্থিতিশীল হবে।  এতে রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে, যেটা এবার হয়েছে।  পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে বেশকিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, চাহিদা যদি কমিয়ে আনা যায়, তাহলে আমদানি কমে যাবে, তাতে কিছুটা বাণিজ্য ঘাটতিও কমে যাবে।  তবে মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জন্য আবশ্যকীয় যেমন চাল-গমসহ খাদ্যপণ্যের যথেষ্ট সরবরাহ রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

জানা গেছে, দেশের আমদানি ও রপ্তানির এ ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।  গত অর্থবছরের শেষ সময়ে ঋণাত্বক প্রবৃদ্ধি ছিল।  রপ্তানি আয় এবং ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে থাকা রেমিট্যান্স মিলে আমদানি খরচ পূরণ করতে না পারায় চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।  চলতি হিসাবে এত ঘাটতিতে বাংলাদেশ এর আগে কখনোই পড়েনি।  

গত ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ঘাটতিতে পরে এক সময়ে উদ্বৃত্ত থাকা চলতি হিসাবের ভারসাম্য।  ওই অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।  এর আগে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।  এর আগে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতিই ছিল সবচেয়ে বড়।  নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।  এই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না।  আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।

এদিকে বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতির প্রভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে ডলারের বাজার আর সস্তা হচ্ছে টাকা।  গত অর্থবছরের শুরুতে থাকা ৮৪ দশমকি ৮১ টাকার ডলারের বর্তমান বিনিময় হয় ব্যাংকিং চ্যানেলেই ৯৩ দশমিক ৪৪ টাকা।  আর খোলা বাজারে তা এখন ৯৮-১০০ টাকার ঘরে, সম্প্রতি যা ১০২ টাকাতেও উঠেছিল।  ডলারের সংকট দেখা দেওয়ায় রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রণোদনার পাশাপাশি নিয়ম শিথিল করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ সময়: ১১৩০ ঘণ্টা, জুলাই ০৬, ২০২২
জিসিজি/এসআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa