ঢাকা, বুধবার, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯, ১০ আগস্ট ২০২২, ১১ মহররম ১৪৪৪

আইন ও আদালত

কে সন্ত্রাসী আর কে সন্ন্যাসী?

মানবাধিকার ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮১৪ ঘণ্টা, আগস্ট ৪, ২০১৪
কে সন্ত্রাসী আর কে সন্ন্যাসী?

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে আজ অবধি নিজভূমে পরবাসী হয়ে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইলের সাম্রাজ্যবাদী ও সন্ত্রাসবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আজ তারা গৃহহীন।

ফিলিস্তিন আজ একটি রক্তাক্ত জনপদের নাম।

মানব বিধ্বংসী সব ধরনের অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছে ফিলিস্তিনিরা। একদিকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত ইসরায়েল অন্যদিকে নিরস্ত্র গাজা। বিশ্ববিবেক নিরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। মানবাধিকারের তথাকথিক বিশ্ব মোড়লরা নির্বাক। ইসরায়েল প্রশ্নে তাদের দ্বিমুখি নীতি সারা বিশ্বেই আজ প্রমাণিত।  

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত অস্ত্র আমদানীকারক দেশ ইসরাইল নিরস্ত্র গাজার ওপর অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। উচ্ছেদ করতে চায় ফিলিস্তিনিদের শুধু গাজা থেকে নয়, পুরো ফিলিস্তিন থেকে।

ইসরায়েল কেবল একতরফা আক্রমন ও আগ্রাসন চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বিশ্বসম্প্রদায়কে কোনোরকম তোয়াক্কা না করে একের পর আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে।

তারা কেবল বেসামরিক লোকদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, আক্রমন চালিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি জাতিসংঘ স্কুলেও। ইসরায়েলের ত্রিমুখী আক্রমনে সব সীমান্ত থেকেই গাজাবাসী অবরুদ্ধ। গাজা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ খোলা নেই আজ গাজাবাসীর। নৌ, বিমান ও পদাতিক সব পথেই ইসরায়েল হামলা চালাচ্ছে।  

জাতিসংঘ স্কুলে ওই বিমান হামলায় সাত জন নিহত হয়েছে একদিনেই। আর আহত হয়েছে কয়েক ডজন।

সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ছুই ছুই।

তথাকথিত যুদ্ধ ও অস্ত্র বিরতিও মানছেনা ইসরায়েল। একদিকে যুদ্ধ বিরতি আরেকদিকে নতুন করে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও হামলা। আদতে এখানে কোনো যুদ্ধ বিরতিই  বহাল নেই, বরং চলছে বিরামহীন অস্ত্রবাজী ও রক্তপাত। যদিও কোনো কোনো রাষ্ট্র এখানে যুদ্ধ চলছে বলে প্রচার করছে। কিন্তু এটা কোনো যুদ্ধ নয়। চলছে যুদ্ধাপরাধ। কারণ, একতরফা অস্ত্রবাজী কোনো যুদ্ধের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। আত্মরক্ষা করার জন্য, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আক্রমন আর দখল দারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আক্রমন এক কথা নয়। জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক আইনও এ দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে।

যদি যুদ্ধ হয়েও থাকে, সেই যুদ্ধেরও নিয়ম-নীতি আছে। যুদ্ধে কোনো বেসামরিক লোক ও স্থাপনায় আক্রমন-হামলা করা যায়না। কিন্তু ইসরায়ল কি সে নিয়ম অনুসরণ করেছে? কোনো ধরনের সামরিক বেসামরিক স্থাপনাই তাদের আক্রমনের বাইরে নয়। যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা চলছে গাজায়।

এর বিরুদ্ধে মৃদু স্বরে কেউ কেউ প্রতিবাদ করছে কিন্তু তাতে ইসরায়েলের মতো পরাশিক্ত সারা দেবে কেন? তাদের পক্ষে আছে বিশ্বমোড়লেরা।

এসবের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য তাদের। দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল, তাদের ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ। ইসরায়েলের ভাষায় ‘ঈশ্বরের উপহার’ দেয়া ভূমিতে স্থায়ীভাবে তারা বসবাস করতে চায়। এজন্য সর্বশেষ ফিলিস্তিনিকেও তারা উচ্ছেদ করতে কার্পণ্য করবেনা।  

কিন্তু নিকট অতীত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পারমানবিক অস্ত্র খোজার নাম করে পুরো একটা সভ্যতা ধ্বংস করে দিতেও গণতন্ত্রের ধ্বজাধারিদের কোনো বিলম্ব হয়নি। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো রাসায়নিক অস্ত্রের সন্ধান পায়নি। অথচ নিশ্চিৎ সেই অস্ত্রের মজুদ থাকার পরও ইসরায়েলে কোনো রকম অনুসন্ধান চালানো তো পরের কথা, একটা ধমকও দেয়া হচ্ছে না।

কিন্তু বিশ্ব জানে, অস্ত্র সংগ্রহ ও মজুদ সেখানে নতুন কিছু নয়, প্রথম থেকেই তারা একাজটি সুচারুরূপে করে আসছে। বিশ্ব মোড়লরা জেনেও না জানার ভান করছে।

অন্যদিকে ইরান বা ইরাকের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন চিত্র। খোড়া অজুহাতে সেখানে ন্যাটোসহ মোড়লদের সামরিক বাহিনী  প্রেরণ করা হয়েছে। যদিও সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে নিজ মদদপুষ্ট সরকার বা আধিপত্যবাদই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে তাদের মুখে রা নেই, সামরিক হস্তক্ষেপতো দূরের কথা।

গাজা নামের ক্ষুদ্র একটি জনপদের বিরুদ্ধে যেভাবে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ইসরায়েল অস্ত্রবাজি করছে তা তুলনাহীন। মাত্র ২৫ মাইল দীর্ঘ বা ১৩৯ বর্গমাইল গাজা ইসরায়েলের উপর্যুপরি হামলার কাছে পর্যুদস্ত। বর্ষা নিক্ষেপ করে ইসরায়েলকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গাজাবাসী।

আজ সকালেও ১০জনকে হত্যা করে দিন শুরু করেছে ইসরায়েল।

সোমবার সকাল থেকে যুদ্ধবিরতি ছিল। কিন্তু তার মধ্যেও দশজন নিহত হয়। গাজায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক জেমস রাউলে বলছেন, গাজায় একই সাথে মানবিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ঘটছে। কিন্তু এ বিপর্যয় রোধে পরাশক্তি বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোনো পদক্ষেপ নেই। আর ইসরায়েলতো শান্তি প্রতিষ্ঠা চায়না। কারণ, মিসরে শান্তি বা যুদ্ধ বিরতি আলোচনায় গাজা তার প্রতিনিধি দল পাঠালেও ইসরায়েল সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। কায়রো আলোচনাও হচ্ছে বলে মনে হয় না।

এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ইসরায়েলের এতোসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে পাগলামি বলে অভিহিত করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। বিশ্ব গণমাধ্যমের ভূমকাও এক্ষেত্রে রহস্যজনক। এতোদিন ফিলিস্তিন, ইরান, ইরাকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে তারা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করতো। আর ইসরায়েল তাদের কাছে ছিল আত্মরক্ষা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরত একটি সন্যাসী রাষ্ট্র। কিন্তু আজ প্রমাণ হয়ে গেছে কে সন্ত্রাসী আর কে সন্ন্যাসী।   

বাংলাদেশ সময়: ১৮১৬ ঘণ্টা, আগস্ট ০৪, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa