ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ ভাদ্র ১৪২৯, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১৭ মহররম ১৪৪৪

আইন ও আদালত

জলবায়ূ তহবিল ও আমাদের জলবায়ূ ভবিষ্যৎ

মানবাধিকার ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১০, ২০১৪
জলবায়ূ তহবিল ও আমাদের জলবায়ূ ভবিষ্যৎ ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ূ পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে জলবায়ূ বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই আলোচনা করে যাচ্ছেন। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রধানতম জলবায়ূ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।

এ ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকলে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে আমাদের জলবায়ূ ভবিষ্যৎ।

বলা বাহুল্য, গণমাধ্যম, এনজিও ও বিভিন্ন মহলে জলবায়ূ নিয়ে যতো আলোচনা হয়, তার সিকি ভাগও কাজ হয়না আমাদের দেশে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও একই চিত্র।

জলবায়ূ নিয়ে জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বীত নীতির বাস্তবায়ন আমরা দেখি না। মূলত আন্তর্জাতিক কিছু আইন ও সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলোই এক্ষেত্রে নীতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরেও সমন্বীত নীতি ও আইন বাস্তবায়নে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর যথেষ্ট অনীহা লক্ষণীয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাঝে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিভাজন লক্ষণীয়।

উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো জলবায়ূ পরিবর্তনের হুমকির জন্য উন্নত দেশগুলোর দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো সে দায় স্বীকারও করে নিয়েছে। কিন্তু ঘাপলাটি হলো সেজন্য কার দায়-দায়িত্ব কতটুকু ও সে অনুযায়ী দরিদ্র বা ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা প্রদানের বিষয়টিতে। দর-কষাকষির মূল বিষয়টি সেখানেই। এ দর-কষাকষির আরো একটি বিষয় হলো, ভবিষ্যত তাপমাত্রার রাশ টেনে ধরা। এ বিতর্কেও রাষ্ট্রগুলো দুইভাগে বিভক্ত।

এসব বিষয়ে রাষ্ট্রগুলো এখনো কোনো সার্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু তারপরও ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে রাষ্ট্রগুলো। জলবায়ূ তহবিলের মাধ্যমে সাধারণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে রাষ্ট্রগুলো। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলো আর্ন্তজাতিক নীতির আলোকেই সহায়তা করে যাচ্ছে।

কিন্তু এ তহবিল বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্য্যায়ে একটি সমন্বীত নীতি থাকা অপরির্হায্য। ইএনএফসিসি’র আওতায় সেরকম নীতি রয়েছে, কিন্তু তা জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর না। তাই আমাদের সেরকম কার্যকর কোনো সমন্বীত কর্মসূচী নেই। যা আছে তাও চোখে পড়ার মতো নয়। যদিও আমাদের একটি আইনও আছে। জলবায়ূ ট্রাস্ট গঠন করাই যার উদ্দেশ্য। কিন্তু জলবায়ূ তহবিলের সুফল থেকে বঞ্জিত জলবায়ূ হুমকিগ্রস্ত এ জনপদের অধিবাসীরা।   

জলবায়ূ পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় দেশে দেশে গঠিত হয়েছে জলবায়ূ তহবিল। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএফসিসি (ফ্রেমওর্য়াক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ)এর আওতায় গঠিত হয়েছে এরকম তহবিল।

তবে আন্তর্জাতিক নীতির অধীনে এরকম তহবিল গঠিত হলেও তার তদারকির দায়িত্ব বর্তেছে রাষ্ট্রগুলোর ওপরই। যে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে এরকম তহবিল তাদেরই এ বিষয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। এরকম সন্দেহ কেবল জলবায়ূ বিশেষজ্ঞদেরই নয়, খোদ ইউএনএফসিসি’র নির্বাহী সচিব ক্রিষ্টিনা ফিগারেসেরও।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির রাশ টেনে ধরতে সরকারগুলো বিশেষ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সেটি আশার কথা। তবে উন্নতবিশ্ব বিশেষকরে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো এব্যাপারে নিমরাজি মনোভাব পোষণ করছে।

সরকারগুলো এখন তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির বেশী বাড়তে না দেয়ার বিষয়ে মোটামুটিভাবে সহমত। কিন্তু প্রধান দূষণকারী রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে তেমন আগ বাড়াচ্ছে না। যদিও আজকের জলবায়ূ দূষণের প্রধান দায় তাদেরই।

তাপমাত্রার সীমা নির্ধারনের জন্য বিশ্ববাসীর হাতে খুব বেশি সময় নেই। কারণ, এ বিষয়ে একটি ঐক্যে পৌছানোর এখনি সময়।

জলবায়ূ তহবিল নিয়ে ঘাপলা আছে এমন একটি কথা চাউর হয়েছিল বহুদিন থেকেই। কিন্তু এতে কেউ রা করেনি। মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়িটিকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করা হয়েছে। এমনকি দাতারা যে জলবায়ূ তহবিলে অহেতুক নজরদারি করছেন তার  এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে। সরকার থেকে দাবী করা হয়েছে যে তহবিলের অর্থ বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট স্বচ্ছ।

জলবায়ূ ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের প্রকৃত খতিয়ান আমাদের জানা নেই। তবে উন্নত দেশগুলো থেকে এ পর্যন্ত এখাতে সংগৃহীত অর্থের পরিমান প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ২০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এক্ষেত্রে যথেষ্ট সন্তোষজন। কিন্তু ব্যয়ের বিষয়টি প্রকৃত প্রস্তাবে জলবায়ূ খাতেই হচ্ছে কিনা সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ।
 
সম্প্রতি জলবায়ু তহবিল লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নামছে দুদক এমন একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নামে বেনামে বিভিন্ন উছিলায় এখাত থেকে লুটপাট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিভিন্ন এনজিওএর নামে এসব তহবিল বন্টন করা হয়েছে। এসব এনজিওর মধ্যে অনেকের কোনো অস্তিত্বই নেই। কাজেই সর্ষের ভিতরেই ভূত আছে বলে মনে হয়। দুদকের অনুসন্ধিৎসা সে কথাই জানান দিচ্ছে।

জলবায়ূ তহবিলের পশ্চাতে যে কারণগুলো আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো জলবায়ূর ক্ষতি মোকাবেলায় খাপ খাওয়ানো (Adaptation)। Adaptation পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হলো পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন। আন্তর্জাতিক আইনের এ নীতি আদৌ বাস্তবায়ন হচ্ছেনা তহবিল প্রদানের ক্ষেত্রে।  

আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় উন্নত রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে ওয়াদাবদ্ধ। উভয়রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্যই হলো ইউএনএফসিসি’র উদ্দেশ্য সাধন। আন্তর্জাতিক আইনেই আছে, উন্নয়শীল রাষ্ট্রগুলো সম্পদের সুষম ব্যবহার যাতে করতে পারে সেজন্যই এ তহবিলের আয়োজন।

কেবল জলবায়ূ তহবিল প্রদানই যথেষ্ট নয়, বরং সে তহবিল ব্যবহারের সক্ষমতা আছে কিনা সেটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে সেই তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও বলা আছে আন্তর্জাতিক দলিলে। তহবিল প্রদান ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর পর্যালোচনা, প্রতিবেদন ও নিয়মিত যাচাইমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা আছে। কিন্তু এসব নীতিমালা কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

তহবিল প্রদান ও ব্যবহারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।  

তহবিলের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইউএনএফসিসি’র আওতায়ই একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। সে কমিটির কাজ হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সফলতা বা যাচাই-বাছাই করা ইত্যাদি। এ কমিটি ২০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে ১০ জন করে সদস্য নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।  

কিন্তু জাতীয় পরিসরে আন্তর্জাতিক আইন ও অঙ্গীকারের পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। শুধু তাই নয়, জাতীয় আইনে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিফলন হচ্ছে কিনা সেটি নিশ্চিৎ করা একান্ত প্রয়োজন। তাই আইনের প্রয়োগ যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ‘জলবায়ূ’ বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করা। সেটি হলেই কেবল জলবায়ূ তহবিল নয় জলবায়ূ সংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয়গুলোরও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিৎ হবে।
 
বাংলাদেশ সময়: ১৩২৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১০, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa