ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ পৌষ ১৪৩১, ০৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০২ রজব ১৪৪৬

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৪৫) || অনুবাদ: আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস/শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯১০ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৪, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (৪৫) || অনুবাদ: আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল হক

___________________________________

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।
_________________________________

৪৪তম কিস্তির লিংক


মারিয়ার মৃত্যুর সময়কার দিনগুলো ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ। আমি যার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তার ঠিকঠাক বর্ণনা হয়তো দিতে পারবো না, সেই সময়কার অনুভূতি, চিন্তা, আমার কর্মকাণ্ড, তারপরও অনেক কিছুই আমি অবিশ্বাস্য রকম অনুপুঙ্খ মনে করতে পারি, কতগুলো ঘণ্টা, এমনকি কিছু পুরো দিনও, ওসব আমি মনে করতে পারি মেঘ আর খণ্ডিত স্বপ্নের মতো। আমার এমন মনে হয়েছে মদের প্রভাবে কিছু দিনের হিসেব আমি হারিয়ে ফেলেছি, হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছি আমার বিছানায় কিংবা পোর্তো নুয়েবোর বেঞ্চে। আমি খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারছি কালে কনস্টিটিওসিয়ন স্টেশনে পৌঁছে, আমি একটা বারে ঢুকছি তারপর একের পর এক হুইস্কির অর্ডার দিচ্ছি। তারপর অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে আমি বার ছেড়ে বেরিয়ে এসে একটা ট্যাক্সি ধরছি, ওটা আমাকে কালে ২৫ দে মায়ো কিংবা কালে লেনার্দো আলেমে নিয়ে এলো। এরপর অনেক হৈচৈ, গানবাজনা, চিৎকার-চেঁচামেচি, স্নায়ুর মধ্যে পীড়া তৈরি করা খরখরে গলার কারো হাসি, ভাঙা বোতল, তীব্র আলো। তারপর মনে পড়ছে তীব্র এক মাথা ধরা নিয়ে আধো-জাগরণে নিজেকে আবিষ্কার করলাম জেলখানার সেলে, এক কারারক্ষী দরজা খুলে দিলো, এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে কিছু বলছে, এবং তারপর আমাকে আমি দেখলাম উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় হাঁটছি, প্রচণ্ডরকম ঘষটে ঘষটে। আমার ধারণা আমি আবারও কোনো বারে ঢুকি। কয়েক ঘণ্টা (কিংবা কয়েকদিন) পরে কেউ একজন আমাকে আমার স্টুডিওতে নিয়ে আসে। তারপর ওই সব দুঃস্বপ্নের শুরু যেখানে আমি এক গির্জার ছাদে হাঁটাহাঁটি করছি। তারপর আমার এটাও মনে পড়ছে ঘরের মধ্যে অন্ধকারে হেঁটে বেড়াচ্ছি আমি আর আমার এ রকম একটা ভয়ঙ্কর অনুভূতি হচ্ছে যে দেয়ালগুলো যেন এক অসীম অনন্ততার মধ্যে সরে যাচ্ছে, আমি যতো জোরেই দৌড়াই না কেন কিছুতেই তার নাগাল পাবো না। আমার মনে পড়ে না এরপর জানালা দিয়ে আসা দিনের প্রথম আলোর দেখা পাওয়ার মাঝখানে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে। এরপর আমি নিজেকে টেনে নিয়ে গেলাম বাথরুমে তারপর পুরো পোষাক পরেই বাথটাবে নেমে পড়লাম। ঠাণ্ডা পানির স্পর্শ আমার হুঁশ ফিরিয়ে আনতে শুরু করলো, একের পর এক অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা মনে পড়তে শুরু করলো আমার, খণ্ডিত আর পারম্পর্যহীন, যেমন প্রথম দেখলাম অপসৃয়মান বানের জল থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে: পাহাড়ী ঢালের মারিয়া, মিমি সিগারেট হোল্ডার ঘোরাচ্ছে; আয়েন্দে স্টেশন; লা কনফিয়ানসা, কিংবা লা এসতানসিয়া নামের ট্রেন স্টেশনের উল্টোদিকের একটা বার; মারিয়া আমাকে স্কেচের কথা জিজ্ঞেস করছে, আর আমি চিৎকার করে বলছি ‘কিসের স্কেচ!’; ভ্রু কুচকে কঠিন মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হান্তের; আমি চিন্তিত মুখে খালাত ভাইবোনের আলাপ শোনার চেষ্টা করছি; এক নাবিক বোতল ছুড়ে মারছে; দুর্বোধ্য চোখে আমার দিকে এগিয়ে আসছে মারিয়া; পুতিগন্ধঅলা এক মেয়ে চুমু খাচ্ছে আমাকে আর আমি, ওর মুখের ওপর ঘুষি বসিয়ে দিচ্ছি; পিপড়ার ফুলে ওঠা কতগুলো কামড়; হান্তের গোয়েন্দা উপন্যাসের ওপর বক্তৃতা দিচ্ছে, এসতানসায়ার গাড়িচালক। মাথায় খণ্ড খণ্ড কিছু স্বপ্ন: আবার গির্জা, এক কালো রাত; আদিঅন্তহীন ঘর।
আমার মাথা পরিষ্কার হয়ে আসতেই, কিছু কিছু খণ্ডাংশ আমার সচেতনতা থেকে উত্থিত অংশের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করলো, আস্তে আস্তে দৃশ্যটা একটা আকার নিতে শুরু করলো, কিন্তু তারপরও দৃশ্যমান থেকে গেলো বন্যার পর একাকীত্ব আর ধ্বংসের দৃশ্যাবলী।

আমি বাথটাব থেকে উঠে এসে পরনের কাপড় খুলে, শুকনো কাপড় পরে তারপর চিঠি লিখতে বসলাম মারিয়াকে। প্রথমেই এসতানসায়া থেকে আমার পালিয়ে আসার কারণ ব্যাখা করলাম (আমি ‘পালিয়ে আসা’ কেটে দিয়ে লিখলাম ‘চলে আসা’)। আমি এর সঙ্গে যোগ করলাম আমার প্রতি যথেষ্ট মনযোগ প্রদর্শনের জন্য তার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি (‘আমার প্রতি’ কেটে দিয়ে লিখলাম ‘ব্যক্তি আমাকে’)। আমার কাছে ও সহৃদয় আর নিখাদ অনুভূতির একটা মেয়ে, কিন্তু তা সত্বেও, ও আমাকে নিজের সম্পর্কে যতটুকু ধারণা দিয়েছে, তাতে ওর মতে সময় সময়ে ‘স্বার্থপর অনুরাগ’-এরও জয় হয়। আমি এখনও বুঝতে অক্ষম যে ওর মতো একজন মেয়ে কি করে বলতে পারে ও তার স্বামীকে ভালোবাসে, এবং আমাকেও, একইসঙ্গে সে হান্তেরের সঙ্গে বিছানায় যাচ্ছে (আমি ‘হান্তের’ কেটে লিখলাম ‘সিনর হান্তের’; আমার মনে হল একই সঙ্গে ‘বিছানায় যাওয়া’ আর অপ্রত্যাশিত আনুষ্ঠানিক সম্বোধন খুবই কার্যকর হবে)। আর অবশ্যই এর সঙ্গে ওর বাড়তি বিরক্তি উৎপাদন করবে, আমার এই সংযুক্তি, স্বামীর সঙ্গে বিছানায় যাচ্ছে এবং আমার সঙ্গেও। আমি এ কথা বলে চিঠি শেষ করলাম যে, সে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবে, এরকম আচরণ অসম্ভব মুখরোচক আলোচনার রসদ জোগাবে, যা চলতেই থাকবে।

আমি চিঠিটা আরেকবার পড়লাম, আমার কাছে মনে হলো—লক্ষণীয় পরিবর্তনসমেত—চিঠিটা যথেষ্ট ক্ষুরধার হয়েছে। খামের মুখ বন্ধ করলাম, তারপর প্রধান পোষ্ট অফিসে গিয়ে সোজা রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠিয়ে দিলাম।

(চলবে)

বাংলাদেশ সময়: ১৯১০ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৪, ২০‌১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।