ঢাকা, বুধবার, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ জুন ২০২২, ২৯ জিলকদ ১৪৪৩

জলবায়ু ও পরিবেশ

মানুষই মেছোপেঁচার প্রতিপক্ষ!

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন, এনভায়রনমেন্ট স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০১১১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১২, ২০১৫
মানুষই মেছোপেঁচার প্রতিপক্ষ! ছবি: সংগৃহীত

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার): সময়টা ১৯৮৫ সাল। তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি।

বাবার চাকরির সুবাদে থাকতাম মদনমোহনপুর চা বাগানের বড় বাংলোতে। এটি কমলগঞ্জ উপজেলার ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) একটি চা বাগান। ওই বাংলোয় বেশ বড় বড় গাছ ছিল। এসবের মধ্যে একটি বড় অশ্বত্থ গাছও ছিল।

বিশালাকৃতির গাছটার দিকে তাকাতেই আমার ভয় লাগতো। তারপরও দিনে অন্তত তিন-চার বার যেতাম গাছটা নিচে। কারণ ওখানে একটি দোলনা ছিল। এর চারদিকটা পরিপাটি করে সাজানো ছিল। মা একদিন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, গাছটার উঁচু ডালে বসে থাকা পেঁচাদের সঙ্গে। মায়ের মতো সবাই বলতো ওগুলো হুতোমপেঁচা। হুতোমপেঁচা শব্দটি মায়ের মুখ থেকেই শোনা।

সেই গাছে তাকাতেই আশ্চর্য হলাম, এ কী! এত্তো বড়! সংখ্যায় চার/পাঁচটার কম হবে না। ওরা একটি পরিবারের মতো বসবাস করছে। সবচেয়ে অবাক হলাম ওদের খাড়া খাড়া কানের ঝুঁটি দেখে। প্রায়ই ওরা কানের ঝুঁটিকে খাড়া করে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। ভালো করে দেখতো আমাদের। এভাবে তাকিয়ে থাকার রহস্য আমি বুঝতে পারতাম না। সেটাই ছিল আমার প্রথম হুতোমপেঁচা দর্শন।

সন্ধ্যা হলেই সেই পেঁচারা অশ্বত্থ গাছ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে হুউম...হুউম...হুউম করে ডাকতো। একটার ডাক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যটার ডাক শুরু! এমন ভয়ার্ত ডাক শুনে প্রথম প্রথম খুব ভয় পেতাম। এমন অবাকলাগা ডাক সতর্ক করে তুলতো আমাদের।   

পরে জানলাম ওগুলো আসলে মেছোপেঁচা। এদের ইংরেজি নাম Brown Fish Owl এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ketupa zeylonensis। তবে অনেক অঞ্চলে এদের হুতোমপেঁচা নামে ডাকা হয়ে থাকে। এরা নিশাচর শিকারি পাখি। বড় গাছের আড়ালে বা ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকে। বিল-জলাশয়ের বড় গাছে বাসা বাঁধে। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় ১.১ কেজি।   

এরপর অনেক বছর গড়িয়েছে। অক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয়, সেই যে শৈশবে দেখা মেছোপেঁচাদের এরপর আর দেখলাম না আজ পর্যন্ত না। বড় আকৃতির পেঁচাগুলো আমার শৈশব স্মৃতির উজ্জ্বলতম একটি অভিজ্ঞতাপর্ব। আজও অবাক হয়ে খুঁজে বেড়াই শৈশবের মেছোপেঁচাদের। কিন্তু কোথাও পাই না! তবে কি এরা আর টিকে নেই আমাদের দেশে?

আমার চাপা উৎকণ্ঠাটুকু শেয়ার করতেই বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি এবং পাখিবিষয়ক লেখক ও গবেষক ইনাম আল হক বললেন, মেছোপেঁচা একটি বড় পাখি। মানে ওর বেশি খাবার চাই। তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও প্রজননের জন্য দৈনিক অন্তত ২০০ গ্রাম মাছ প্রয়োজন। তবে ১০০ গ্রাম মাছেও হয়তো হবে। কিন্তু তখন তার পুষ্টি হবে, প্রজনন হবে না। দৈনিক প্রয়োজনীয় ২০০ গ্রাম খাবার ওরা এখন আর পাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে বিপন্ন অবস্থায় আছে ওরা। তবে এসব পেঁচা এখনো বিলুপ্তির তালিকায় ওঠেনি। কিন্তু কিছু দিনেই মধ্যেই বিলুপ্তির তালিকায় ঠাঁই হবে এদের। কারণ- মাছের অভাব। ওরা মাছ ধরে খায়, দেশের হাওর-বিল-জলাশয়ে এতো মাছ এখন আর নেই।

তিনি আরও বলেন, আগে এতো মাছ ছিল যে, বিল-জলাশয়ের ধারে বসলেই একটা/দুটো মাছ পেত এ পেঁচারা। এখন তাও আর পায় না। ওরা তো মানুষের মতো জাল ফেলে মাছ ধরতে পারে না। আমরা মাছ ধরতে ধরতে সব মাছ শেষ করে ফেলেছি। আমরাই এখন আমাদের প্রয়োজনীয় মাছ পাই না। পেঁচাদের তো মাছ পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।   মনে করেন, একটি পুকুরে দু’টি মাছ থাকলে পেঁচারা মানুষের মতো ওই দু’টি মাছই ধরতে পারবে না। কিন্তু ওই পুকুরে যদি দুই হাজার মাছ থাকে তাহলে সে হয়তো দুয়েকটি মাছ অনায়াসে পেতে পারতো।  

সমস্যার গভীরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইনাম আল হক বলেন, সমস্যাটা হচ্ছে, আমাদের আর মেছোপেঁচার খাবার একই। অর্থাৎ মাছ। অন্য পেঁচাদের এই সমস্যা নেই। যেমন ধরেন শিকড়ে প্যাঁচার (Brown Hawk Owl) কথা। সে ঝিঁঝিঁ পোকা খায়। মানুষ ঝিঁঝিঁ পোকা খায় না। ফলে ওরা বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। লক্ষ্মীপেঁচা (Barn Owl) ইঁদুর খায়। আমরা ইঁদুর খাই না। ফলে লক্ষ্মীপেঁচারাও ভালোই আছে। কিন্তু মেছোপেঁচা ও আমাদের খাবার একই হওয়ায় তাদের দুর্দিন। কারণ আমরাই তো ওদের সব খাবার খেয়ে ফেলছি।  

এসব পেঁচার আবাস বিষয়ে তিনি বলেন, খয়রা মেছোপেঁচা দুর্লভ আবাসিক পাখি। সব জায়গায় তাদের দেখা যায় না। আপনি আপনার শৈশবে হয়তো চার/পাঁচটা একসঙ্গে দেখেছেন। কিন্তু এখন সারা বাংলাদেশ ঘুরলেও চার/পাঁচটাকে পাবেন না। আমরা মানুষরাই মেছো পেঁচাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি।

বাংলাদেশ সময়: ০১০৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১২, ২০১৫
বিবিবি/আরএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa