ঢাকা, বুধবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৯ মে ২০২৪, ২০ জিলকদ ১৪৪৫

জলবায়ু ও পরিবেশ

বিবর্ণ এক জনপদ ‘প্রতাপনগর’

শেখ তানজির আহমেদ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭৫০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০২০
বিবর্ণ এক জনপদ ‘প্রতাপনগর’ প্রতিদিন জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামগুলো, ছবি: বাংলানিউজ

প্রতাপনগর (আশাশু‌নি, সাতক্ষীরা): বিবর্ণ এক জনপদে পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ‘প্রতাপনগর’। গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় ২১টি গ্রাম নিয়ে গঠিত প্রতাপনগর ইউনিয়ন।

সেই থেকে প্রতিদিন দুইবার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামগুলো।  

এরই মধ্যে প্রবল স্রো‌তের তোড়ে গড়িমহাল খালের কালভার্টসহ রাস্তার প্রায় ৩০০ ফুট ভেসে গিয়ে রূপ নিয়েছে বিশালাকৃতির নদীতে। এতে বিচ্ছিন্ন হয়েছে আশাশুনি উপজেলা সদর থেকে প্রতাপনগরের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঠিক একইভাবে জোয়ার-ভাটার প্রবল স্রোতে ইউনিয়নের হরিষখালী পয়েন্টে রাস্তাসহ হাওলাদার বাড়ির আট-১০টি ঘর জামলার খালে ভেসে গেছে।  

বিপর্যস্ত হয়েছে চলাচলের রাস্তা, মসজিদ, মন্দির ও বাড়ি-ঘরসহ আর্থ সামাজিক অবস্থা। জোয়ার-ভাটার লবণ পানিতে মরতে শুরু করেছে গাছপালা।  

চলাচলের সুবিধার্থে ও জোয়ারের পানি ঠেকাতে স্থানীয়ভাবেই পাকা রাস্তার ওপর প্রায় চার ফুট উঁচু রিং বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও রক্ষা হচ্ছে না রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর।  

প্রতিদিন লবণাক্ত পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় পাকা দালান-কোটাগুলো যেমন গা ছেড়ে দিয়েছে, তেমনি কাঁচা বাড়িঘরগুলো যেন মৃত্যু যন্ত্রণায় ধুকছে। কোনো মতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে বাঁশ-খুঁটির ঠেকনা দিয়ে।  

এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির তীব্র সংকট। সেই সঙ্গে মাছের ঘেরগুলো ভেসে যাওয়ায় ও এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। রাস্তাগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় ভ্যান চালিয়েও জীবিকা অর্জনের সুযোগ নেই প্রতাপনগরে।  

এছাড়া বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়া পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ওপর চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।  

সাত মাস পেরিয়ে গেলেও ভাঙনকবলিত বেড়িবাঁধগুলো সংস্কার করা সম্ভব না হওয়ায় এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এখন সৃষ্টিকর্তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা।  

প্রতাপনগর ইউনিয়নের হরিষখালীর হাওলাবাড়ির তমিজউদ্দীন জানান, জামলার খালের পাশেই তাদের পাকা বাড়ি ছিল। সব ভেসে গেছে। একটি ইটের চিহ্নও নেই।

শুধু তমিজউদ্দিন নন, তার মতো গৃহহীন হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। যাদের বসতঘর জোয়ার-ভাটায় বিধ্বস্ত হয়েছে।  

প্রতাপনগর এপিএস কলেজের প্রভাষক শাহজাহান হোসেন বলেন, সাত মাস টানা জোয়ার-ভাটায় এক বিধ্বস্ত জনপদে পরিণত হয়েছে প্রতাপনগর। ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তা-ঘাট, গাছপালা, ঘের-বেড়ি, ফসলের ক্ষেত সব কিছুই শেষ। অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে এ দুর্দশা কোনোদিনই কাটবে না।  

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে চাকলা, কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালী ও হিজলা-কোলার অন্তত ১০টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ইউনিয়নের সমগ্র এলাকা প্লাবিত হয়। দীর্ঘদিনেও এসব বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউনিয়নের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হিজলা-কোলায় বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়েছে। চাকলা পয়েন্টে এখন কাজ চলছে। তারপরও হাজরাখালীর পানি আসায় ইউনিয়নের ২১টি গ্রামে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। বেড়িবাঁধের কাজ খুব ধীর গতিতে এগুচ্ছে। এক মাসের মধ্যে বেড়িবাঁধগুলো সংস্কার করতে না পারলে আর কখনই তা সংস্কার করা সম্ভব হবে না। এছাড়া বেড়িবাঁধ না হওয়ায় রাস্তা-ঘাট বা পুনর্বাসনের কাজও শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই।  

বাংলাদেশ সময়: ০৭৪০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০২০
এসআই


 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।