ঢাকা, সোমবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ মে ২০২৪, ১১ জিলকদ ১৪৪৫

উপকূল থেকে উপকূল

চারদিকে জল থৈ থৈ, তবুও জলের অভাব!

রফিকুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০১০১ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০১৫
চারদিকে জল থৈ থৈ, তবুও জলের অভাব! ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢালচর (মনপুরা, ভোলা) ঘুরে এসে: চারিদিকে জল থৈ থৈ। তবুও এখানে জলের অভাব।

বর্ষাকালে অতিরিক্ত জোয়ারের জল মানুষের জীবনে সংকট নিয়ে আসে, আবার শুকনোয় একফোঁটা খাবার জলের অভাবে ছাড়িয়ে যায় কষ্টের সীমা। এখানে জলের সঙ্গে আছে পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা। পানিবাহিত রোগের আক্রমণও থাকে মৌসুমজুড়ে।

এই হলো দ্বীপ জেলা ভোলার মনুপরার ঢালচরের মানুষের অবস্থা। শুকনোয় তপ্ত রোদে খা খা করে দ্বীপের খোলা মাঠ। বয়ে চলা আঁকাবাঁকা খালগুলো ফেঁটে চৌচির। কোথাও এক ফোঁটা জল নেই। এ কারণে মানুষের সংকট পদে পদে। জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। তিনবেলা খাবার-দাবার থেকে শুরু করে গৃহস্থালির সব কাজে দেখা দিয়েছে সমস্যা। অথচ এই গোটা দ্বীপটি বর্ষায় ডুবে থাকে।    

ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা। উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের একটি অংশ নদীবেষ্টিত দুর্গম ঢালচর। প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসবাস এখানে। এখানকার মানুষের সব সংকটের তালিকায় পানি আর পয়ঃনিস্কাশন অন্যতম। চলতি শুকনো মৌসুমে এই সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পানির জন্য কখনো যন্ত্রণায় ছটফট করা, কখনো ঘরে আটকে থাকা, কখনো হাহাকার, আবার কখনো মৃত্যুর ডাক। এ এক অন্যরকম দুর্গম জনপদ।  

প্রায় ৩ হাজার মানুষের ঢালচরে বিশুদ্ধ পানির উৎস্য হিসেবে রয়েছে মাত্র চারটি নলকূপ। যার মধ্যে একটি আয়রনযুক্ত। খাবার পানির জন্য নেই কোনো সরকারি সংরক্ষিত দীঘি। প্রায় সাড়ে ৩শ’ পরিবারের মধ্যে স্যানেটারি ল্যাট্রিন আছে মাত্র ১৮টি। চরে ১০-১২টি খাল থাকলেও শীত মৌসুমে প্রায় খালই শুকিয়ে যায়।

চরের বাসিন্দারা বলেছেন, বর্ষা মৌসুমে পানিবন্দি হয়ে থাকতে হয় এখানকার মানুষদের। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। নলকূপের বিশুদ্ধ পানির জন্য পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয় ৪-৫ কিলোমিটার পথ। কয়েক কলসি পানির জন্য দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতে হয়। বিশুদ্ধ পানির অভাবে পান করতে হয় ডোবা ও খালের দূষিত লোনা পানি। আবার কখনো বিশুদ্ধ কিংবা দূষিত কোনো প্রকার পানি না পাওয়ার কারণে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় করতে হয় ছটফট।

চরের বাসিন্দা সাইফ উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, নদী ভাঙনে সব হারিয়ে মনপুরা থেকে ঢালচরে এসেছেন ২০ বছর। ঢালচরের পশ্চিম টেকে তার বসবাস। বাড়ির আশেপাশে কোনো জলাশয় নেই। খাওয়া ও গৃহস্থালি কাজের জন্য বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরের নলকূপ থেকে ১০-১২ কলস পানি আনতে হয়। বর্ষার সময় পানি কিছু কম লাগলেও জোয়ার এলে খাওয়ার পানিও সংগ্রহ করা যায় না।

আবদুল লতিফ মাঝি জানান, দৈনিক ৮-৯ কলস পানির প্রয়োজন হলেও কষ্টের কারণে টিউবওয়েল থেকে ৩-৪ কলস পানি আনি। বাকিটা ডোবা ও খালের পানি দিয়েই গৃহস্থালির কাজ চালাই। অনেক সময় ডোবার পানি ব্যবহারের কারণে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হই।

চরের মসজিদের সামনে জড়ো হওয়া কয়েকজন নারী-পুরুষের সঙ্গে আলাপ। মোশাররফ হোসেন, সুফিয়া বেগম, সফরজান, জরিনা বেগম। খাবার পানি সংগ্রহে প্রত্যেকেরই ব্যয় হয় দিনের ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। বর্ষা ও জোয়ারের সময় বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ যেন রীতিমত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পরাজিত অনেকে দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হন। ফলে অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হন।

চরের বাসিন্দা মজিরুল্লাহ মাঝির বয়স ৯৭। দীর্ঘদিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, জীবনে অনেক কিছু দেখলাম। বৃটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সব দেখলাম। কিন্তু চরের পরিবর্তন দেখলাম না। দেশে এতো কিছু হয়; কিন্তু এই চরে কিছুই হয় না।

পানির সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি চরের বেড়িবাঁধ, রাস্তা ও খাল পারাপারে জন্য পুল নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

ঢালচর জামে মসজিদের ঈমাম মৌলভী ফয়েজউল্লাহ জানান, মসজিদ সংলগ্ন একটি ডোবা থাকলেও তা শীতকালে শুকিয়ে যায়। মুসল্লিরা বাড়ি থেকে কষ্ট করে অজু করে মসজিদে আসেন। কোনো কারণে কারও অজু ভেঙে গেলে সমস্যায় পড়েন।

মুসুল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের সামনে একটি টিউবওয়েল ও একটি টয়লেট স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

চরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন, সুফিয়া বেগম, ফেন্সি বেগমসহ আরও অনেক জানালেন, চরে বর্ষা মৌসুম বা দুর্যোগের সময় পানির সংকট আরও বাড়ে। পানি কষ্ট তো থাকেই, তার ওপর জোয়ারের পানিতে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চরের অধিকাংশ এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জোয়ারের পানিতে নষ্ট হয়ে যায় রান্নার চুলা। এসময় পানির সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয় খাবারের কষ্ট। কারণ এসময় রান্নার কোনো সুযোগ থাকে না।

পানির অভাবে সেচ সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে ঢালচরে। উর্বর জমিতে ফলানো সম্ভব অনেক ফসল। কিন্তু সে সুযোগ কম। বর্ষায় পানি পাওয়ার সুবাদে ফলে শুধুই আমন। অন্য সময় চরের সব জমি ফাঁকা পড়ে ধাকে। দীঘি ও পুকুরে পানি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় শীত মৌসুমে এখানে বিশেষ কোনো আবাদ চোখে পড়ে না। শুকনোয় ডোবাগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কারনে চরের গবাদি পশুগুলো পানির অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ঢালচরের মানুষের দাবি, এখানকার পানি সমস্যা দূর করতে চরে অন্তত ১৫টি টিউবওয়েল এবং দু’টি বড় দীঘি প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রতিটি বাড়িতে পাকা টয়লেট প্রয়োজন। আর জোয়ারের পানি থেকে চরবাসীদের বাঁচাতে বেড়িবাঁধ, রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে।

[পশ্চিমে সাতক্ষীরা, পূর্বে টেকনাফ, উপকূলের এই ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা বেষ্টিত অঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে পিছিয়ে থাকা জনপদের খবরাখবর তুলে আনছে বাংলানিউজ। প্রকাশিত হচ্ছে ‘উপকূল থেকে উপকূল’ নামের বিশেষ বিভাগে। আপনি উপকূলের কোন খবর বাংলানিউজে দেখতে চাইলে মেইল করুন এই ঠিকানায়: [email protected] ]

বাংলাদেশ সময়: ০১০৩ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।