ঢাকা, বুধবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ০৬ জুলাই ২০২২, ০৬ জিলহজ ১৪৪৩

উপকূল থেকে উপকূল

বিশ্ব পানি দিবস

পানির দেশেই পানির হাহাকার!

শফিকুল ইসলাম খোকন, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৩৫ ঘণ্টা, মার্চ ২২, ২০২২
পানির দেশেই পানির হাহাকার!

উপকূল ঘূরে এসে: পানির অপর নাম জীবন। পানির কারণেই পৃথিবীতে প্রাণ আছে।

আর সেই প্রাণ যখন পানিই ধ্বংস বয়ে আনে। পানি যখন সুপেয় না হয়, তখন তা হয়ে উঠে নানা অসুখ, নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যাসহ মরণেরও কারণ। উপকূলের চারদিকে পানি, তবুও সংকট রয়েছে সুপেয় পানির। লোনা পানিতে উপকূলের মানুষের জীবনটাই যেন লোনা হয়ে গেছে। নিত্য ব্যবহার্য কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ছড়িয়ে পড়ছে রোগব্যাধি। পেটের পীড়া, অ্যালার্জিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নারী, শিশু থেকে বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষ। কখনো কখনো লবণ পানি স্যালাইনের কাজ করলেও অতি মাত্রায় পানিতে লবণ থাকায় শরীরের জন্য ঝূঁকিও। আবার প্রতি বছর চৈত্রের খড়ায় খাল, পুকুর ও দিঘি শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়।  

পাথরঘাটার দক্ষিণ পদ্মা থেকে উত্তরে পিপুলিয়া গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র পানি সংকটের চিত্র চোখে পড়ে। এ যেন ‘পানির দেশেই পানির হাহাকার’, উপকূলে এমন কথা হাস্যকর হলেও এটিই এখানকার বর্তমান বাস্তবতা।

এখানে শুধু বিশুদ্ধ পানির অভাব এমনটাই নয়, লবণাক্ত পানিতে নানা চর্মরোগসহ দূর থেকে পানি আনায় শারীরিক বিভিন্ন ঝুঁকিও আছে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে।

আবুল হোসেন। বয়স ৭৫ এর কোটায়। এ বয়সে বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও কোমড়ে গামছা বেঁধে প্যাডেলচালিত ভ্যান চালিয়ে তিন কিলোমিটার দূর থেকে টেনে আনছেন সুপেয় পানি।



এক কলসি পানি সংগ্রহের জন্যে নারী-পুরুষ আর শিশুদের ছুটতে হয় সেই সকাল থেকে। এক সময় শুধু দক্ষিণ উপকূলের পানি সংকটের খবর পাওয়া গেলেও এ সংকট ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলজুড়ে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিঠা পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুকনো পুরো মৌসুমে পানির সংকট থাকে। বিশেষ করে পাথরঘাটায় গভীর নলকূপ না বসায় এখনকার মানুষের দুঃখের শেষ নেই।

বিশ্বঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মধ্যবর্তী পাথরঘাটা উপজেলা। এ উপজেলার চারদিকে পানি থাকা সত্ত্বেও লবণ পানিতে উপকূলের মানুষের জীবনটাই লবণাক্ত হয়ে গেছে। তাদের মতে লবণ পানি ব্যবহারের কারণে শরীর কালো, খসখসে, চর্ম রোগসহ পানিবাহিত নানা রোগ সৃষ্টি হয়, এছাড়াও পেটের নানাবিধ পিড়া হয়ে থাকে। ভারী বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেলে শৌচাগারের ময়লার কারণে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। আবার প্রতি বছর চৈত্র মাস এলেই পাথরঘাটার সব পুকুর ও খাল শুকিয়ে যায়। যে কারণে মাঠ, খাল-বিল, ঝিল, নদী পেড়িয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম ঘুরে সংগ্রহ করে আনতে হয় সুপেয় খাবার পানি। আর যত কষ্টই হোক না কেন, বেশিরভাগ সময় এই দায়িত্ব পালন করতে হয় নারীকে। কোনো কারণে পানি সংগ্রহ করতে না পারলে ঠিক চাল-ডালের মতো এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে পানি ধার নিতে হয়। সেই কাজটিও করতে হয় নারীকে।



সূত্র বলছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় এ উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা প্রলয়ের পর এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পানির উৎস্যগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। সবশেষ এর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ২০২১ সালের মে মাসের ঘুর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। পুরো বরগুনা জেলায় লবণ পানিতে পুকুর, ঘেরের মাছ, কলা বাগানসহ কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।  

এসব ব্যাপারে উপজেলার বাদুরতলা গ্রামের খালেদা বেগম বাংলানিউজকে বলেন, প্রতিদিন বিকেলে চার কিলোমিটার দূরে একটি খাস পুকুর থেকে পানি আনতে হয়। কখনো কলসিতে করে আবার কখনো কন্টিনারে। বৃষ্টির মৌসুমে বৃষ্টির পানিই ভরসা আর শুকনো মৌসুমে প্রতিনিয়তই এ রকমের কষ্ট করতে হয়।  
চরলাঠিমারা গ্রামের আবুল ফরাজির বলেন, চারিদিকে থই থই পানি থাকলেও লবণ পানির কারণে দুর্বিসহ অবস্থা। প্যাডেল ভ্যান, রিকশা আর বাইসাইকেলে করে মিঠা পানি আনতে হয় দূর থেকে। আবার চৈত্রের খড়ায় পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় এ অবস্থা আরও দুর্বিসহ অবস্থায় পরিণত হয়।  

একই গ্রামের আলেয়া খাতুন বলেন, গ্রামে ভালো পানির পুকুরের সংখ্যা কম। তাই পানি সংগ্রহের জন্য লড়াই শুরু হয় ভোর থেকেই।  

জানা গেছে, পাথরঘাটা পৌরবাসীর জন্য একটি মাত্র সাপ্লাই পানি সরবরাহ করা হয়। তাও আবার ১২ কিলোমিটার দূর থেকে আনা হয়। কখনো কখনো ওই পানিও ঘোলা, অপরিষ্কার, পোকা-মাকড় থাকায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পরে। পৌরসভায় ১৭টি ফিল্টারের মধ্যে ১২টি সচল থাকলেও পাঁচটি অকেজো।  

সম্প্রতি একটি গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, পাথরঘাটা উপজেলার ৪৬টি গ্রামে খাবার পানির চরম সংকট।  গ্রামগুলোর বিশুদ্ধ পানির উৎসের বেশির ভাগই অকেজো। ফলে কয়েক বছর ধরেই তারা শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির সংকটে পড়ছেন। এর মধ্যে সুপেয় পানির বেশি সংকট ২৫টি গ্রামে। এর বাইরে উপজেলার আরও ২১টি গ্রামের বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির মাঝারি মাত্রার সংকট রয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের গবেষণার তথ্যে উপজেলার ৪৬ গ্রামে সুপেয় পানির উৎসগুলোর ৬০ শতাংশই এখন অকেজো। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে কয়েক হাজার পরিবার।



এদিকে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, গত অর্থ বছরে উপজেলায় ৪২টি মিঠা পানির পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। উপজেলায় সুপেয় পানির জন্য পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) রয়েছে ১৭০টি সবকটিই সচল। এর মধ্যে ৩০টি ফিল্টার সোলারের মাধ্যমে চলে। এছাড়াও পাথরঘাটায় রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্রকল্পের আওতায় ওয়াটার টিটমেন্ট প্লান্ট রয়েছে সাতটি অত্যাধুনিক।  

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দোলা মলিক বলেন, এ উপজেলায় গভীর নলকূপ না বসায় পানির সংকট থাকে। বিশেষ করে চৈত্রের খড়ায় আরও তীব্র হয়। মিঠা পানির পুকুরগুলো পুনঃখনন এবং সোলারের মাধ্যমে ফিল্টার গুলো সচলের কারণে অনেকাংশে পূরণ হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে সুপেয় পানির সংকট থাকবে না।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রাশেদ মোহাম্মদ খান বাংলানিউজকে বলেন, লবণাক্ততা এবং পানিবাহিত চর্মরোগসহ নানা রোগ হতে পারে। অনেকদিন ধরে এ অভ্যাসের কারণে শরীরের চামড়া শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যায়। যার ফলে ত্বক মোটা হয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ত্বকের রোগ অ্যাকজিমা সৃষ্টি হয়। উপকূলের অবস্থা তো আরও করুন। এজন্য উপকূলে নতুন নতুন পদ্ধতি নিতে হবে এবং অত্যাধুনিক ফিল্টার বসানো জরুরি।

বাংলাদেশ সময়: ২১৩৫ ঘণ্টা, মার্চ ২২, ২০২২
এসআরএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa