ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯, ১৯ আগস্ট ২০২২, ২০ মহররম ১৪৪৪

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেট

দুই ঘণ্টার আগুনে নিঃস্ব শতাধিক ব্যবসায়ী

ইফতেখার ফয়সাল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৩১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৪
দুই ঘণ্টার আগুনে নিঃস্ব শতাধিক ব্যবসায়ী ছবি : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চট্টগ্রাম: মাত্র দুই ঘন্টার আগুনে পথে বসেছে নগরীর হালিশহর এলাকার সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেটের শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।   ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডে ৮০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হলেও ব্যবসায়ীদের দাবি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এ অবস্থায় ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দাবি করেছে তারা।

বুধবার ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সূত্রপাত হওয়া আগুনের নিয়ন্ত্রণ আসে রাত সাড়ে আটটার দিকে। আগুনে মার্কেটটি ছাড়াও পুড়ে যায় পার্শ্ববর্তী বস্তির অর্ধশতাধিক ঘর।

সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তাজুল ইসলাম বাবু বাংলানিউজকে জানান, আগুনে মার্কেটের ১৮০টি দোকান পুরোপুরি পুড়ে গেছে। এছাড়াও, ১০ থেকে ১৫টি দোকান আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।

মার্কেটের ফাহিম গার্মেন্টসের ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ বাংলানিউজকে জানান, সন্ধ্যায় পাশের বস্তি থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। কিছু বুঝে উঠার আগেই দোকানে আগুন লেগে যায়।

“মালামাল বের করার কোন চিন্তাই আমরা করতে পারিনি, কিভাবে জান বাঁচাবো সেই চিন্তাই ছিলাম। ”

অগ্নিকাণ্ডে নিজের দোকানের অন্তত আট লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

মো. ফোরকান নামে অপর এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি সমবায় সমিতির সদস্য হিসেবে নিজের একটি দোকান ছাড়াও তিনটি দোকান ভাড়া নিয়েছিলেন। আগুনে তার চারটি দোকানই পুড়ে গেছে।

“একটা দোকানের ‍কিছু মালামাল বের করতে পেরেছি।   বাকিগুলোর সব মালামাল পুড়ে গেছে।   অবস্থা এমনই যে কাউকে মুখ দেখানোর অবস্থা নেই। ”

দোকানগুলোতে অন্তত ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল বলে দাবি তার।

শাহীন ক্লথ স্টোর নামে একটি দোকানের মালিক শহীদুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার পর সে তার অধিকাংশ মালামাল বের করে ফেলে। পরে আগুন তার দোকানে না লাগলেও দোকানের অন্তত এক লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়ে গেছে।

“মালামাল বের করার সময় অনেকে সহযোগিতার নামে এসে মাল চুরি করে নিয়ে গেছে। আবার কেউ রাস্তার উপর রাখা মালামালে হাত দিয়েছে, এই হলো অবস্থা। শুধু আমার নয় প্রতি দোকানেরই একই দশা। ”

তাজুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর রাতেই সমিতির সদস্যদের নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। সেখানে ক্ষতিগ্রস্তরা ছাড়াও সকল সদস্যের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। যাতে আমরা নিজেদের উদ্যোগে ক্ষতির শিকার হওয়া অবকাঠামো মেরামত করতে পারি।

“আমরা নিজেদের উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মাণ করবো। কিন্তু পুনরায় ব্যবসা শুরু করার মতো মুলধন আমাদের নেই। আমরা চাই সরকার আমাদের সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী কোন ঋণের ব্যবস্থা করুক। যাতে আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারি। ”

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একইভাবে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহায়তার আহ্বান জানান সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল আজিজ।

তিনি বলেন, “আমরা সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধিত সংগঠন। সরকার চাইলে সমবায় উন্নয়ন ফান্ড থেকে অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেন। ”

১৯৯০ সালের দিকে আগ্রাবাদ এলাকার কিছু হকার দৈনিক ২০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে আগ্রাবাদ বহুমুখি সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন।

এ সমবায় সমিতির ৩১৪ জন সদস্যের সঞ্চয় করা অর্থেই ২০০২ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেট।   প্রায় ৩৮ শতক জায়গার উপর গড়ে উঠা এই ‍মার্কেটটিতে প্রতি সদস্যকে একটি করে ছোট আকারের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়।

খোলা আকাশের নিচেই বসবাসের আয়োজন

বুধবার রাতে সংঘটিত এই অগ্নিকান্ডে সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেটের পাশাপাশি পুড়ে যায় পার্শ্ববর্তী বস্তির প্রায় ৪০টি ঘর।   সেখানে প্রায় দেড়শ পরিবারের বসবাস।

আগুনে ঘর পোড়ার পর মাথা গোঁজার ঠাই না পেয়ে খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটছে এসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে বসবাসের আয়োজন করতে ব্যস্ত বস্তির অধিবাসীরা।

কয়লার স্তুপ সরানোর কাজ করার সময় হানিফা আক্তার নামে একজন জানান, তার বাড়ি নোয়াখালির মাইজদী এলাকায়।   বস্তিতে তার পরিবারের ৪ জন সদস্য থাকেন।   শহরে কোন আত্মীয় স্বজন না থাকায় রাতে পুড়ে যাওয়া এই ঘরেই থাকার আয়োজন করছেন তিনি।

“পোলা পাইন নিয়া এখন কই যামু। হিয়ানেই থাইকতে হইবো। ”

তাসলিমা আক্তার নামে অপর এক বাসিন্দা জানান, সে আর তার স্বামী ‍আবদুল হক মিলে বস্তির একটি ঘরে অপর একটি পরিবারের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন। যাওয়ার মতো আর কোন জায়গা নেই।

তিনি বলেন, বস্তির কমবেশী সকলেই এখানে থাকবে।   আর কোন উপায় নেই।

বস্তির অধিবাসীরা জানান, বস্তির ঘরগুলো আব্দুল মাবুদ, সেকান্দার কলোনী, নুরজাহান বেগম, মো. এসহাক ও রহমানের মালিকানাধীন। এগুলো ভাড়া ৮শ থেকে ১৪শ টাকা।

জানা যায়নি অগ্নিকাণ্ডের কারণ

বুধবারের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে কিছুই নিশ্চিত করতে পারছে না ফায়ার সার্ভিস। ফলে, কারণ অনুসন্ধানের জন্য গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত টিম।

বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দীন বাংলানিউজকে জানান, শনিবার থেকে তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কমিটিকে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ী ও বস্তিবাসীদের কাছেও সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ী ও বস্তির বেশীরভাগ অধিবাসীর দাবি, বস্তির একটি রান্না ঘরের চুলা থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে।

সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ বলেন, বস্তিতে আগুন লাগার পরই মার্কেটে আগুন লাগে।   হয়তো রান্নার চুলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

তবে, বস্তির ‘জমিদার’ দাবিদার কয়েকজনের দাবি, পরিকল্পিতভাবে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

মো. পারভেজ নামে একজন নিজেকে বস্তির কিছু ঘরের মালিক আব্দুল মাবুদের পুত্র দাবি করে বাংলানিউজকে জানান, আগুন দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই পুরে বস্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে।   কোন দাহ্য পদার্থ ব্যবহার না করলে এত তাড়াতাড়ি আগুন ছড়িয়ে পড়ার কথা না।

তিনি বলেন, বস্তির জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি চক্র দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।   অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাদের হাত থাকতে পারে।

“আমরা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের এই মৌরসী জায়গায় ঘর ভাড়া দিয়ে আসছি। বছর পাঁচেক ধরে সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেটের এক সাবেক সভাপতিসহ কয়েকজন আমাদের জায়গাটা কেনার চেষ্টা করে আসছিল। আমরা রাজি না হওয়ায় তারা মিথ্যা কয়েকজন দাবিদার তৈরি করে মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করে আসছে। ”

বস্তির জায়গা নিয়ে সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেট সমিতির কোন দ্বন্ধ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে সভাপতি তাজুল ইসলাম বাবু বাংলানিউজকে বলেন, ওই জায়গাটা সরোজ শীল নামে এক ব্যক্তির ছিল। পরে সেটি খাস হয়ে যায়। ওই খাস জমি দখল করে এলাকার কয়েকজন ভাড়া দেন। এসব অবশ্য তাদের ব্যাপার, আমাদের সঙ্গে তাদের কোন দ্বন্ধ থাকার প্রশ্নই উঠে ‍না।

চলছে ত্রাণ বিতরণ:

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সকালে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তি এলাকা পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়র এম মনজুর আলম। এসময় মোস্তফা হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে ১৭০ জন ক্ষতিগ্রস্তকে একটি করে কম্বল, একটি শাড়ি ও খিচুড়ি বিতরণ করা হয়।

রেঞ্জ রিজার্ভ পুলিশের পরিদর্শক সরওয়ার উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, তাদের পক্ষ প্রত্যেকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পরিধানের কাপড় সরবরাহ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি এলাকাবাসীও ক্ষতিগ্রস্তদের খাবারসহ ত্রাণের ব্যবস্থা করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর মো. সেকান্দার।

বাংলাদেশ সময়: ২০৩০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa