ঢাকা, সোমবার, ১ বৈশাখ ১৪৩১, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৫ শাওয়াল ১৪৪৫

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

ফিরে দেখা-২০১৪

চট্টগ্রাম ওয়াসায় নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাত

ইফতেখার ফয়সাল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯১২ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪
চট্টগ্রাম ওয়াসায় নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাত

চট্টগ্রাম: পানি সংকটের কথা বাদ দিলে ২০১৪ সালে অনেকটাই ভালো ভাবেই চলছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা।   হাজার সংকটের ভেতরও সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় কালিমা লেপন হয় চলতি বছরের ডিসেম্বরে।



শেষ মাসে এসে উদঘাটন হয় ব্যাংক স্লিপ, সিল ও সই জাল করে নয় মাস ধরে ভাউচারের মাধ্যমে পানি বিক্রির প্রায় ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের নজিরবিহীন ঘটনা।   সংঘবদ্ধ একটি চক্র  প্রায় নয় মাস ধরে ১৫টি ভাউচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জরুরি পানি বিক্রির এই টাকা ওয়াসার অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছিল।


নজিরবিহীন এই দুর্নীতির প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে ১১ জনের নাম।   এরা হলেন ওয়াসার ওয়াটার ওয়ার্ক্স এর সহকারী প্রকৌশলী আশিক মাহমুদ চৌধুরী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম, ওভারশিয়ার আবদুর রহিম, ভাউচারের চালক আলতাব আলী, মো. আবদুর রব, মো. শাহ জামাল, আমানত খাঁন এবং সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. ইউছুফ ও মো. শাহাদাৎ।

প্রাথমিক তদন্তে নাম উঠে আসায় এদেরকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।   যদিও এ নিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

এ বহিষ্কারাদেশের প্রতিবাদে ১৪ ডিসেম্বর প্রায় চার ঘণ্টা ওয়াসা ভবন ঘেরাও করে রাখে চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন।   কর্মসূচি চলাকালে ওয়াসার পানিবাহী গাড়িগুলো চলাচল করতে দেয়নি সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

পরে এ ঘটনায় অধিকতর তদন্তের জন্য শ্রমিকদের প্রতিনিধিসহ একটি কমিটি গঠন করা হয়।   কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শ্রমিক নেতাদের পাশাপাশি ওয়াসার একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন সিনিয়র অডিট অফিসার এবং একজন ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে নতুন তদন্ত কমিটিতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ।

তিনি বলেন, স্বাক্ষর ও সিল নকল করে ওয়াসার টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ঘটিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তের ওপর ভিত্তি করে ১১ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াত চক্রের সকল সদস্যকে চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“কোন দুর্নীতিবাজ পার পাবে না। কারো প্রতি আক্রোশ থেকে এ বহিষ্কারাদেশ হয়নি। অধিকতর তদন্তে কেউ নিরাপরাধ হলে তাকে যেমন ছাড় দেওয়া হবে, এর বাইরে কেউ থাকলে তাকেও শাস্তি পেতে হবে। ”

প্রায় নয় মাস ধরে চলা জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও এর আগের রেকর্ডও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ওয়াসা কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহকদের বেশীরভাগই এ প্রক্রিয়ায় ওয়াসা কর্মকর্তা, চালক ও সহকারীদের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। এই সুযোগে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে জালিয়াতি করে টাকা আত্মসাত করে আসছে।

জালিয়াতির ক্ষেত্রে চক্রটি সই ও স্ট্যাম্প জাল করে ভূয়া ব্যাংক স্লিপ গ্রাহকদের ইস্যু করে পানি সরবরাহ করতো। গ্রাহকদের টাকা ওয়াসার হিসাবের বদলে যেত নিজেদের পকেটে।

তবে ওয়াসার বিতরণ রশিদটি জাল না হওয়ায় সেখানে বিতরণকৃত পানির রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। যার মাধ্যমে দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে।

চাঞ্চল্যকর এ দুর্নীতির ঘটনা উদঘাটন হওয়ার পর টনক নড়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের।

পানি বিক্রি ছাড়াও সংযোগের স্থাপনের টাকা, গভীর নলকূপের নিবন্ধন ফি এবং নবায়ন ফিসহ বিভিন্ন খাতের টাকা নিয়েও এ ধরণের নয়-ছয়ের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ‍আশঙ্কা করছেন ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা।   এ বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে দাবি করছেন তারা।

উপসচিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
ঢাকা সেনানীবাস সদর দপ্তরের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের এক অনুসন্ধানে নিয়োগ, পদোন্নতি, আন্তঃবদলি ও অন্যন্য উৎস থেকে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে চট্টগ্রাম ওয়াসার উপসচিব মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ জমা পড়লে চলতি বছরের মে মাসে এ ঘটনায় অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় সাত মাস অনুসন্ধান শেষে ডিসেম্বরে দুদক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।   প্রতিবেদনে তার দুর্নীতির অভিযোগ নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তির অর্থাৎ দায়মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুসন্ধান চলাকালে জাহাঙ্গীর আলম ছাড়াও ওয়াসার আরও চার কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরা হলেন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ফারহানা জেবিন, অ্যাকাউন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট আফসানা নূর, রাজস্ব কর্মকর্তা মীর হোসেন ও লিয়াকত আলী।

পানির দাবিতে ক্ষোভ
চলতি বছরের বিভিন্ন সময় তীব্র হয়ে পানি সংকট।   ফলে রেশনিং করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি ওয়াসা। যার কারণে পানির দাবিতে তীব্র হয়ে উঠে জনতার ক্ষোভ।   গত ২৬ মে হালিশহর এলাকার অধিবাসীরা ওয়াসা ভবন ঘেরাও ও কলসি ভেঙ্গে পানির দাবিতে বিক্ষোভ করে।

চট্টগ্রামে দৈনিক পানির চাহিদা ৫০ থেকে ৫৫ কোটি লিটার হলেও ওয়াসার সরবরাহ ২০ লিটারেরও কম।   পানি সংকট সমাধানে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প দেখিয়ে সময় পার করছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৯১৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।