ঢাকা, সোমবার, ১ বৈশাখ ১৪৩১, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৫ শাওয়াল ১৪৪৫

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

ফিরে দেখা- ২০১৪

বছর জুড়ে আলোচনায় চসিক, সমালোচনায়ও

আবদুল্লাহ আল মামুন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৩১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪
বছর জুড়ে আলোচনায় চসিক, সমালোচনায়ও

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যেকোন নাগরিককে জিজ্ঞেস করা হলে নগরীর প্রধান সমস্যা কি? চোখ বন্ধ করে বলে দেবেন জলাবদ্ধতা। এ জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল থেকে অবৈধ উচ্ছেদ, খাল খনন ও নতুন খাল খনন প্রকল্প অনুমোদন নগরবাসির মনে আশার সঞ্চার করেছে।



আবার বছর জুড়ে সিটি করপোরেশনকে নিয়ে সমালোচনারও কমতি ছিল না। ভ্রাম্যমান আদালতে দণ্ডিত কাউন্সিলরকে ছেড়ে দিয়ে নিন্দা শুনতে হয়েছে মেয়র এম মনজুর আলমকে।


তবে বিলবোর্ড উচ্ছেদ, গুণী সংবর্ধনা, মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়া, মহিউদ্দিনের নামে সড়কের নামকরণ, বিপ্লবী বিনোদ বিহারীর আবক্ষ মূর্তি বসানো, মেরিনার্স সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নগরবাসির প্রশংসা কুড়িয়েছে সিটি করপোরেশন।

বছর শেষে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সুধী সমাবেশ করে উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে জবাবদিহিতার নতুন নজিরও সৃষ্টি করেছে চসিক।

জলাবদ্ধতা নিরসন
জলাবদ্ধতা নিরসনে চার বছর ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম চালালেও সুফল পায়নি নগরবাসি। বর্ষায় পুনরায় ডুবেছে নগরী। তবে পানি দ্রুত সরে যাওয়ায় দুর্ভোগ কিছুটা কম পোহাতে হয়েছে নগরবাসিকে। বছরের শুরুতে মহেশখালের দুই পাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। ১৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে  ৭ হাজার ৫৬০ ফুট প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ। মরিয়ম বিবি খাল থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ। মির্জাখাল, ত্রিপুরা ও বামনশাহী ১৫ ডিসেম্বর থেকে মৃত প্রায় এ তিনটি খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ায় নগরবাসির মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

এছাড়া গত ২৪ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির(একনেক) সভায় নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প পাস হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম বলেন,‘নতুন খালটি খননের জন্য এখনো অর্থ বরাদ্দ পাইনি। অর্থ বরাদ্দ পেলে জমি অধিগ্রহণ কাজ শুরু করা হবে। ’ খালটি খনন হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

বিলবোর্ড উচ্ছেদ
বিলবোর্ডে ঢাকা পড়েছিল প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রাম। বছরের শুরু থেকে বিলবোর্ড উচ্ছেদ শুরু করে সিটি করপোরেশন। তবে গত ১৭ নভেম্বর থেকে নগর পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। কিন্তু অবৈধ বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে অভিযান বন্ধ করে দেওয়ায় সমালোচিতও হন সিটি করপোরশেন।

নগর উন্নয়নে ২২২ কোটি টাকার প্রকল্প পাস
চট্টগ্রাম নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ২২২ কোটি টাকা দিচ্ছে জাপানি অর্থ সহায়তা সংস্থা জাইকা। ‘ইনক্লুসিভ সিটি গভর্নেন্স’ প্রকল্পের আওতায় এই অর্থ দেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৩০টি উপপ্রকল্প নেওয়া হয়েছে। করপোরেশনের ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় প্রকল্প বলে জানা গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। গত ১৫ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুষ্ঠিত  সভায় এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। দুই হাজার ৪৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ চারটি সিটি করপোরেশন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত।

মেরিনার্স সড়ক নির্মাণ
যানজট কমাতে নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার থেকে ১২কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় কিলোমিটার মেরিনার্স সড়ক নির্মান করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

গত ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে নগরের অবকাঠামোগত সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ফিরিঙ্গিবাজার ঘাট থেকে বশিরুজ্জামান চত্ত্বর পর্যন্ত এক দশমিক ১৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নেয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

গত ২৩ জুলাই ফিরিঙ্গিবাজার থেকে চামড়াগুদাম পর্যন্ত সড়কটির উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম। যানজট কমে যাওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোকজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে সিটি করপোরেশন।

বসছে বিপ্লবীর আবক্ষ মূর্তি
সাড়ে ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে বাড়ির অদূরে আবক্ষ মূর্তি বসছে প্রয়াত বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর। ১০৫তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত এ সংগ্রামীকে শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এ উদ্যোগ নিয়েছে। করপোরেশনের এ উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।

আয়বর্ধক প্রকল্পে চসিক
২০০৯ সালে এক কোটি ২৭ লাখ টাকায় সাকুরা ড্রিংকিং ওয়াটার লিমিটেডের কাছ থেকে পানির প্লান্টসহ প্রকল্পটি কিনে নেয় সিটি করপোরেশন। ২০০৯ সালের ২৭ জুন তিন কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে করপোরেশনের আয়বর্ধক প্রকল্প হিসেবে পানির প্লান্টটি চালু করেন সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। চালুর পর প্রিমিয়ার ড্রিকিং ওয়াটার নাম দিয়ে ডিলারদের মাধ্যমে পানির জার বাজারজাত করা হয়।

২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় ডিলারদের মাধ্যমে পানি বাজারজাত বন্ধ করে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে সরাসরি পানির জার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ডিলার প্রথা বাতিল করায় লোকসান গুনতে থাকে করপোরেশনের আয়বর্ধক প্রকল্পটি। লোকসানের জন্য এক বছর আগে থেকে পানির প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গত ১ অক্টোবর পুনরায় ডিলারদের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু করে প্রিমিয়ার ড্রিংকিং ওয়াটার।

প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াই চলছে চসিক
গত ৩০ মে অবসরকালীন ছুটিতে যান প্রধান প্রকৌশলী মোখতার আলম। নিয়মানুযায়ী জ্যেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ার কথা।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি কর্পোরেশনের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া তিন সহকারি প্রকৌশলী উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সকল প্রকার পদোন্নতি, স্থায়ীকরণ, চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের উপর স্থগিতাদেশ দেন।

মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াই চলছে চসিক। করপোরেশনের অধিকাংশ উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হয় প্রধান প্রকৌশলীর মাধ্যমে। প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে না পারাটা নজিরবিহীন বললেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই সংস্থার দ্বন্দ্ব
গত ২৭ জানুয়ারী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের(চসিক) লেক সিটি আবাসিক প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(সিডিএ)। পাহাড় কাটার অভিযোগ এনে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় তারা। তবে অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলরদের বর্জনের মুখে সিডিএ’র মতবিনিময় সভা পণ্ড হওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত দেয় সিডিএ।

হুকুম নড়েছে হাকিম নড়েনি
প্রবাদ আছে হাকিম নড়বে তবু হুকুম নড়বে না। কিন্তু এর উল্টোটা ঘটেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে। গত ২৮ মে উচ্ছেদ অভিযানে বাঁধা ও করপোরেশনের নারী কর্মীকে লাঞ্চিত করার অভিযোগে কাউন্সিলর মাহবুবুল আলমকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। কিন্তু পরে সমঝোতার ভিত্তিতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মো.ফখরুদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে,‘দণ্ড দিয়ে ফিরিয়ে নেয়ার নিয়ম নেই। কথায় আছে, হাকিম নড়ে তো, হুকুম নড়ে না। বিচারক একবার যে হুকুম দিয়েছেন, সেই হুকুম থেকে সরে যাওয়া এখতিয়ার বর্হিভূত। এ বিষয়ে একমাত্র সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন আপিল আদালত। ’
 
বিষয়টি নিয়ে স্বয়ং সিটি মেয়র এম মনজুর আলমকে নিন্দার ‍মুখোমুখি হতে হয়েছে। নজিরবিহীন এঘটনায় চসিকের কাছে ব্যাখাও চেয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

ঝুকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ  
২৪ এপ্রিল ২০১৩। রানা প্লাজা ধস। প্রাণহানি ঘটে ১ হাজার ১৩৫জন শ্রমিকের। এরপরই দেশজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও অপসারণের তোড়জোড় শুরু হয়। চট্টগ্রামেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও উচ্ছেদ নামে সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। দু’বছর না যেতেই আবারো স্থবির এ উচ্ছেদ কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(সিডিএ) তালিকা অনুযায়ী নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ৭৩টি। ২০০৬ সালে চিহ্নিত করা হয় ৫৭টি। ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর এ তালিকায় যুক্ত হয় আরো ৬টি। সাভার  ট্রাজেডির আগ পর্যন্ত একটি ভবনও অপসারণ করেনি সিটি কর্পোরেশন। গত দুই বছরে মাত্র তিনটি ভবন অপসারণ করতে পেরেছে তারা। বর্তমানে ঝুকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
 
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।