ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২৩ শাবান ১৪৪৫

অর্থনীতি-ব্যবসা

সবাইকে কিছু না কিছু কর দিতে হবে: সালমান এফ রহমান

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪১৪ ঘণ্টা, মার্চ ২২, ২০২৩
সবাইকে কিছু না কিছু কর দিতে হবে: সালমান এফ রহমান

ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। সবাইকে কিছু না কিছু কর দিতে হবে।

যারা করজালে ঢুকে পড়েছেন, শুধুমাত্র তারাই কর দিচ্ছেন, এটা ঠিক না। অনেক ছোট ছোট ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদেরও কর দেওয়া উচিত।

বুধবার (২২ মার্চ) বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাক বাজেট আলোচনা ২০২৩-২৪ বেসরকারি খাতে প্রত্যাশা শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

সালমান এফ রহমান বলেন, আমরা করনেট বৃদ্ধির কথা বলছি, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কর দিতে চায় না। সবাই করের আওতায় না এলে করনেট কীভাবে বাড়বে? ব্যবসায় লাভ হচ্ছে, তাহলে কর দিতে সমস্যা কোথায়? সব জায়গায় কর অব্যাহতি দিলে কর কোথা থেকে আসবে?

তিনি বলেন, মুদ্রাস্ফীতি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। রিজার্ভের সমস্যা সমাধানে আমরা আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছি। জুনে রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে, আইএমএফ ঋণ দেবে না ইত্যাদি আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়া গেছে। প্রথম দফায় ঋণ ছাড়ও হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক সুদের হার সীমা তুলে দেওয়া হচ্ছে। ম্যাক্রো ইকোনমিতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা সঠিক পথেই আছি।

তিনি আরও বলেন, সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশে আমাদের ফুড সিকিউরিজিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ক্রাইসেস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কোথাও এক ইঞ্চি জমি খালি রাখা যাবে না। তাই আলহামদুল্লিল্লা আমি মনে করি ফুড সিকিউরিটি আমাদের ভালো অবস্থানে রয়েছে। এবারের যে সরিষা হয়েছে এখান থেকে ৫০ শতাংশ ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটবে এজন্য আমি আমাদের কৃষকদের ধন্যবাদ জানাই।  

এফ রহমান বলেন, আমাদের দেশে পুঁজিবাজারের বড় সমস্যা। এখানে ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজারে ৮৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। আমরা কথায় কথায় বলি ছোট ছোট বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তাদের রক্ষা করা তো সরকারের দ্বায়িত্ব না। বিদেশে কোনো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে চাইলে তিনি ব্রোকারের কাছে যান। ব্রোকারের পরামর্শ অনুযায়ী বিনিয়োগ করেন। আর এখানে আমি ব্রোকারের কাছে গেলেও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছি। যখন লস করছি তখন সরকারের দ্বায়িত্ব তা পূরণ করতে হবে- এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে না পারলে পুঁজিবাজার গ্রো করা অনেক কঠিন। তবে পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে যা কিছু ট্যাক্স ইনসেটিভ দেওয়া দরকার, আমরা চেষ্টা করব।

তিনি বলেন, আমরা অনেক দেশ, এমনকি অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভালো আছি। বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় আমরা অনেক ভালো অবস্থায় আছি। কৃষি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাতের কারণে আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছি।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, আগামী বাজাটে মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় রাখা, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ এবং সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস প্রভৃতি বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায়িএবার আমাদের উচ্চাভীলাষী বাজেট তৈরির সুযোগ নেই। তবে জনগণের খাদ্য নিরপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে।    

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) এমপি বলেন, দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বেসরকারিখাতের সমন্বয় আরও বাড়ানো জরুরি। জিপিডিতে করের অবদান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই, তবে এলক্ষ্যে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও মনোযোগী হতে হবে।   অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে দ্রুততম সময়ে সব সেবা চালু করতে হবে। যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে তরান্বিত করবে।      

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাজেট তৈরিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, এলডিসি উত্তোরণ, স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ প্রভৃতি বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের বেসরকারিখাতের সক্ষমতা প্রতিনিয়ত কমছে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে উদ্যোক্তারা সক্ষমতা হারালে সার্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে।

পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকে শিল্পের উন্নয়নে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।    

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি আমাদের বেসরকারি খাতকে বেশ প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করেছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য কমলে স্থানীয়ভাবে তা সমন্বয় করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমাদের মজুতকৃত গ্যাস দিয়ে আগামী ৫ বছর স্থানীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব, তাই শিল্পখাতে জ্বালানি সক্ষমতা নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই।

সেই সঙ্গে ব্যাংকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়ন এবং ম্যান-মেইড ফাইবারের ব্যবহার বাড়ানোরও প্রস্তাব করেন এ কে আজাদ। এছাড়াও শিল্পখাতে সোলারের ব্যবহার বাড়াতে বিদ্যমান শুল্ক হ্রাসের ওপর জোর দেন।      

আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আর্থিক খাত, শিল্প ও বাণিজ্য এবং অবকাঠামো-এ চারটি সেশনের নির্ধারিত আলোচনায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাভেদ আখতার, আইসিএবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, এফএিস, এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. আলমগীর হোসেন, ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান, দি সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন, সানেমর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্টের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস্ অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়্যরমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী, বিজিএমইএর পরিচালক আসিফ আশরাফ, আব্দুল মোনেম গ্রুপ অব কোম্পানিজের এমডি মইনউদ্দিন মোনেম, কনফিডেন্স গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান করিম এবং নোকিয়ার কান্ট্রি হেড মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম প্রমুখ অংশ নেন।

আলোচকরা দেশের কর ও শুল্ক ব্যবস্থার অটোমেশন, আধুনিকায়ন ও সংষ্কার, করজাল বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, টেকসই পুঁজিবাজার নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানো, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্পোরেট কর হার কমানো, রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাতে বন্ড সুবিধা দেওয়া ও পণ্যের বহুমুখীকরণ, দ্রুততম সময়ে অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যক্রম সম্পন্নকরণ, পিটিএ ও এফটিএ স্বাক্ষর প্রভৃতি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।         

সমকাল সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেনের সভাপত্বিতে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সামীর সাত্তার।

বাংলাদেশ সময়: ১৪১৩ ঘণ্টা, মার্চ ২২, ২০২৩
এসএমএকে/এমএইচএস/এমএমজেড

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।