ঢাকা, সোমবার, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২২ শাবান ১৪৪৫

কৃষি

সোনাগাজী ও মিরসরাইয়ে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তরমুজের সমারোহ 

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭১৭ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০২৩
সোনাগাজী ও মিরসরাইয়ে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তরমুজের সমারোহ 

ফেনী: ফেনীর সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এখন সম্ভবনার ফসল তরমুজ। পাশাপাশি দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে নানা জাতের বিভিন্ন স্বাদের রসালো তরমুজ।

এই দুই উপজেলার হেক্টরের পর হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে তরমুজের। ফলনও এসেছে বাম্পার।  

ইতোমধ্যেই সেসব ফসল মাঠ থেকে তরমুজ আহরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিস্থিতি ঠিক থাকলে বিনিয়োগের দ্বিগুণের বেশি লাভের আশা করছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। তবে আশঙ্কার বিষয় শিলা বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে শিলা পরলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়েছেন তরমুজচাষিরা।  

সোনাগাজীতে চতুর্থ বারের মত আবাদ হয়েছে তরমুজের, এখানকার তরমুজ বেশ সুস্বাদু হওয়ায় এবং গত তিন বছর বাম্পার ফলন  হওয়ায় চাষাবাদে আগ্রহ বেড়েছে  কৃষকদের মাঝে। বাজারেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাহিদা।  

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবছর সোনাগাজীর উপকূলীয় ৫টি ইউনিয়ন চর ছান্দিয়া, চর দরবেশ, নবাবপুর, আমিরাবাদ ও সোনাগাজীতে ব্লাকবেরি, গ্লোরি, বাংলালিংক, ওশান সুপার ও ভিক্টর সুপার জাতের তরমুজ আবাদ হয়েছে তরমুজের। লক্ষ্যমাত্রা ৩৪৫ হেক্টর জমি ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ৫৭৫ হেক্টর জমিতে।

কৃষকরা জানান, হেক্টর প্রতি আনুমানিক খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা। হেক্টর প্রতি তরমুজ বিক্রি হবে প্রায় ১০ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৭ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হতে পারে এবার।  

সোনাপুর এলাকার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আইয়ুব নবী ফরহাদ, ইফতেখার ও আনোয়ার জানায়, তাদের ১৫ জনের একটি দল গত বছর তরমুজের আবাদ করে প্রায় কোটি টাকা লাভবান হয়েছেন। এ বছর তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে প্রায় ২১৬ একর জমিতে দেড় কোটি টাকা খরচ করে তরমুজের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো আসছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এবারও কোটি টাকার বেশি লাভবান হবেন বলে আশাবাদী তারা।

জসিম উদ্দিন নামের এক কৃষক জানান, গত বছর তার পাশের জমিগুলোতে তরমুজের ভালো ফলন দেখে এ বছর তিনিও ২ একর জমিতে ২ লাখ টাকা ব্যয়ে আবাদ করেছেন। ফলন দেখে তিনি খুশি। আশা করছেন ৭/৮ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন।

এ অঞ্চলের মানুষ জমির মালিক হলেও এখানে তরমুজ চাষাবাদের জন্য দক্ষ নোয়াখালীর সুবর্ণ চরের মানুষ। সেখান থেকে কৃষকরা এসে এখানকার জমিগুলোতো আবাদ করেন। এতে তারাও বেশ লাভবান হচ্ছেন।  

মো: ইমরান নামের এক তরমুজচাষি জানান, তিনি সুবর্ণ চর থেকে ফেনীতে এসে তরমুজ আবাদ করছেন। প্রতিমাসে তিনি বেতন হিসেবে পাচ্ছেন ১৮ হাজার টাকা। এভাবে আরও শত শত শ্রমিক সুবর্ণ চর থেকে এসে তরমুজের আবাদ করছে।  

সোনাগাজী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন মজুমদার জানান, কৃষকদের তরমুজ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কৃষি অফিস কাজ করছে। এখানকার জমিগুলো তরমুজ উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। তরমুজের আকার বড় হয় ও স্বাদ অতুলনীয় যে কারণে বাজারে ব্যাপক চাহিদা আছে। আশাকরি এ বছর কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন।

অপরদিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নে সাগরের কোল ঘেঁষে জেগে উঠা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়েছে তরমুজের। এক সময় এসব জমি গরু-মহিষের চারণক্ষেত্রে ছিল। পাশাপাশি ধান চাষ করতেন কৃষকরা। এখন এসব জায়গায় তরমুজের চাষ হচ্ছে।  

জানা গেছে, উপজেলার ইছাখালী, মিঠানালা, কাটাছরা ও শাহেরখালী ইউনিয়নে চরের অধিকাংশ জমি খালি পড়ে থাকতো। এবার নোয়াখালীর সুবর্ণ চর উপজেলার ১১ জন উদ্যোক্তা মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। এখানকার মাটি তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে তারা স্থানীয় কৃষকদের থেকে ৩ মাসের জন্য প্রতি একর জমি ১৫ হাজার টাকা খাজনায় বর্গা নেন। সেই জমিতে তারা তরমুজের বীজ বপন করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৭৫ একরেরও বেশি বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ লতার সমারোহ। বর্তমানে অধিকাংশ গাছে ফুল ফোটার পাশাপাশি তরমুজের মুকুল এসেছে।

তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে যদি সহযোগিতা পাওয়া যায় তাহলে আমরাও তরমুজ চাষ করতে আগ্রহী। কারণ নিজেদের জমিতে অন্য এলাকা থেকে আসা কৃষকরা বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। আমরা নিজেরা যদি চাষ করি তাহলে আমাদের এলাকা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে।

তরমুজচাষি মো. মোশাররফ বলেন, গত বছর আমাদের নোয়াখালী উপজেলার সুবর্ণচর এলাকার কৃষকরা এখানে তরমুজ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। ডিসেম্বরে শেষের দিকে ১১ জন মিলে ৭০ একর জমিতে তরমুজের চারাগাছ রোপণ করেছি। এখন গাছের চারায় ফুল এবং মুকুল আসতে শুরু করেছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে।

আরেক চাষি মো. আব্দুল হান্নান বলেন, আমরা নিজ উপজেলা সুবর্ণচরে তরমুজ চাষ করে সফল হয়েছি। এই প্রথম মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী, মিঠানালা ও কাটাছরা ইউনিয়নের চরে স্থানীয় কৃষকদের থেকে জমি বর্গা নিয়ে চীন, আমেরিকা ও বাংলাদেশীসহ ৮ প্রজাতির তরমুজ চাষ করছি।

ইছাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল মোস্তফা জানান, নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চাষিরা এবারও মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষ করেছেন। তবে এবার গত বছরের চেয়ে বেশি চাষ হয়েছে। তবে বৃষ্টি না হওয়াতে ফলন তেমন একটা ভালো হয় নাই।

তিনি আরও বলেন, এবার তাদের দেখাদেখি এখানকার স্থানীয়রাও তরমুজ চাষ করেছেন। তবে তরমুজ চাষে খরচ বেশি হওয়ায় এখানাকার কৃষকরা আগ্রহ প্রকাশ করে না এবং তরমুজ চাষের উপর তাদের অভিজ্ঞতাও নেই।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষ হয়েছে বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে আমি এখনো দেখতে যেতে পারিনি। আগামী সপ্তাহে তরমুজের জমিগুলো পরিদর্শন করব। আবহাওয়া উপযোগী থাকলে ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তরমুজ চাষে পরিশ্রম অন্যান্য রবিশষ্য থেকে বেশি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের কৃষি অফিস থেকে স্থানীয় যারা তরমুজ চাষ করতে আগ্রহী তাদেরকে নিয়ে ১২ মাসি তরমুজ চাষের একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। সেখানে তাদেরকে তরমুজ চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণ সর্ম্পকে তুলে ধরা হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৫ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০২৩
এসএইচডি /এসএএইচ
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।