ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪৩১, ১৭ জুন ২০২৪, ০৯ জিলহজ ১৪৪৫

অর্থনীতি-ব্যবসা

রমজানে নিত্যপণ্য: এক বছরে দাম বেড়েছে ১১ থেকে ১৪০ শতাংশ

গৌতম ঘোষ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৫৫ ঘণ্টা, মার্চ ২৫, ২০২৩
রমজানে নিত্যপণ্য: এক বছরে দাম বেড়েছে ১১ থেকে ১৪০ শতাংশ

ঢাকা: রমজান মাস এলেই দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। রমজান মাস আসায় দাম বাড়তিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নিত্যপণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, চাল, ডাল, আটা, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, মসলা ও বিভিন্ন সবজি। এসব পণ্যের দাম এক বছরের ব্যবধানে ১১ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে সরকারকে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পণ্যে দাম আছে কিনা সেটা নিশ্চিত করতে হবে৷ এজন্য সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছেন সে সিস্টেমকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে। নজরদারি আরো শক্তিশালী করতে পারলে বাজার দর কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
এদিকে পণ্যের লাগামহীন দাম বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। রোজগার না বাড়ায় পরিবার নিয়ে শহরে টিকে থাকাটাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। দাম বাড়ার বিষয়ে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কথা বললেও ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘সিন্ডিকেট বা জোট’ করে দাম বাড়াচ্ছেন। সরকার তাদের শক্ত হাতে দমন করছে না। সাধারণ মানুষ অসহায়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকট ও এলসি করতে না পারায় পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া পণ্যের দাম বাড়ায় কেনাবেচাও কমে গেছে। কারণ, স্বল্প আয়ের মানুষ কষ্টে আছেন।

১৯ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সভায় উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়, এবার রোজায় মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় গত রমজানের তুলনায় সব অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চাহিদা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম থাকবে।

শনিবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৬-৫০ টাকা, খোলা আটা ৫৫ থেকে ৫৮ ট্কা, প্যাকেট আটা ৬৫ টাকা, ময়দা ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা, তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা, চিনি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা, ডাল ৯৫ থেকে ১৩০ টাকা, ছোলা ৮০ থেকে ৯০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা, পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, হলুদ ২০০ থেকে ২৪০ টাকা, লবণ ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, ডিম ( হালি) ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, খেজুর ( নিন্স ও মাঝারি মানের) ১৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, রুইমাছ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, গরুরু মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাশির মাংস ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।  

এর এক বছর আগে অর্থাৎ গত বছর (২০২২) রোজার সময় প্রতি কেজি মোটা চাল ছিলো ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, খোলা আটার দাম ছিল ৩৬ থেকে ৩৬ টাকা, ময়দা ৪৬ থেকে ৫০ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৫৮ থেকে ১৬৫ টাকা, চিনি প্রতি কেজি ৭৮ থেকে ৮০ টাকা, ডাল ৯৫ থেকে ১২০ টাকা, ছোলা ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, আলু ২০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, রসুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শুকনা মরিচ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা,  হলুদ ২০০ থেকে, ২৩০ ৫ কাটা, লবণ ২০ থেকে ৩৫ টাকা, ডিম ( হালি) ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, রুইমাছ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগী ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা, গরুরু মাংস ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, খাসির মাংশ ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা।  

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আটার দাম বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৭১ শতাংশ, চালের দাম বেড়েছে ১১ শতাংশ, ময়দা দাম বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ডালের দাম ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, তেলের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক শূন্য ৪৪ শতাংশ, ছোলার দাম বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, আলুর দাম ২৫ শতাংশ, এক হালি ডিমের দাম ৫০ শতাংশ, নিম্ন ও মাঝারি মানের খেজুরের দাম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।  

মসলার মধ্যে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, রসুনের দাম ১৪০ শতাংশ, শুকনা মরিচের দাম ১৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, হলুদের দাম ২০ শতাংশ, লবণের দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে।  

এছাড়া রুই মাছের দাম কেজিতে ৮০ শতাংশ, খাসির মাংসের দাম ২৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ, গুরুর মাংশের দাম ২৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ৭৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন ইমন সারোয়ার। রাজধানীর শ্যামবাজারে বাজার করতে এসেছেন৷ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ব্যবসায়ীদের হাতে আমরা জিম্মি। তারা যখন তখন ইচ্ছেমতো দাম বাড়ান। এখানে জনগণের করার কিছু নেই। আমরা হয়তো আন্দোলন করতে পারি। কিন্তু তাহলে সরকারের কাজটা কী? সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও মনোযোগ দিতে হবে।  

পুরান ঢাকার কয়েকজন দিনমজুর ও রিকশাচালকের সঙ্গে কথা হলে তারা বাংলানিউজকে বলেন, ঈদ ছাড়া গরু বা খাসির মাংস খেতে পারি না। গত কোরবানির ঈদে গরুর মাংস খেয়েছি। আবার সামনে ঈদ আসছে। তখন ফের খাবো। দাম কম থাকায় বউ-বাচ্চাদের অন্তত ব্রয়লার মুরগি খাওয়াতে পারতাম। এখন তো সেটাও পারছি না। যে ডিম ১০০ টাকা ডজন কিনতাম, সেই ডিম এখন ১৫০ টাকা ডজন কিনতে হচ্ছে। দিনে যা রোজগার করি বাসা ভাড়া দেওয়ার পর এখর আর বাজার খরচ খোগাতে পারছি না। আগের তুলনায় ২ ঘণ্টা বেশি পরিশ্রম করি। তারপরও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেল, চিনি, গম, মসুর ডাল ও ছোলার সরবরাহ আমদানি নির্ভর। এসব পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। আবার মার্কিন ডলারের দাম বাড়ায় আমদানির খরচ বেড়েছে। গত বছর রোজার আগে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা, যা এখন ১০৫ টাকার বেশি। ডলারের দামের কারণে গবাদিপশু, মুরগি ও মাছের খাবারের দাম অনেকটাই বেড়েছে। এতে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

এছাড়া মূল্যবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় বারবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিন দফায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ৮২ শতাংশ বাড়ানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও বাড়তি দামের কারণ। যেমন গত ২৬ ফেব্রুয়ারি চিনির আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ কমানো হয়। কিন্তু বাজারে দাম কমেনি। টিসিবি বলছে, এক মাসে দাম উল্টো ৫ টাকা বেড়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদনে ১৯ মার্চ জানায়, দেশে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ খামারের আকারভেদে প্রতি কেজিতে ১৩৫ থেকে ১৬০ টাকা। এটা সর্বোচ্চ ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হওয়া উচিত। কিন্তু বাজারে দাম অনেক বেশি, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়৷

এদিকে পণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে সাধারণ মানুষদের একটু কষ্ট কমানোর জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির আওতায় চাল ও আটা বিক্রি করছে। সেটা কিনতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। অনেকে না কিনতে পেরে ফিরেও যান। এছাড়া সরকার এক কোটি পরিবারকে পরিবার বা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ভর্তুকি মূল্যে দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনি ও দুই লিটার সয়াবিন তেল দেয়। রোজায় এক কেজি খেজুর (শুধু ঢাকায়) ও এক কেজি ছোলাও দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের এ উদ্যোগ ভালো। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। আরও বেশি পরিবারের এ সহায়তা দরকার। কারণ, করোনাকালের আগের হিসাবেই দেশে এক কোটির মতো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। আরও এক কোটির মতো পরিবার দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বাস করে। যেকোনো সংকটে তারা বিপাকে পড়ে যায়। আর পরিবার কার্ড বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান বাংলানিউজকে বলেন, দেড় দশকে দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন), মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে। তবু চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। নিম্নমধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় খুব একটা বাড়েনি। অধিকাংশ আয়ই বেড়েছে উচ্চবিত্তের। ফলে দেশে দিন দিন আয়বৈষম্য বাড়ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য কাল হয়ে আসে।

তিনি বলেন, চাহিদা যদি বেশি হয়, তখন বাজারে সরবরাহ যদি না বাড়ে তাহলে দাম বাড়ে। এটা চিরাচরিত নিয়ম। রোজার সময় এক শ্রেণির ক্রেতা রোজার শুরুতে প্রয়োজনেরও খুব বেশি পণ্য ক্রয় করে। এর ফলে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয় এবং দাম বাড়ে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের লাভ করার প্রবনতা বেশি। আর ব্যবসায়ীদের অতি মুণাফা পাওয়ার প্রবণতাও এর জন্য দায়ী। এদিকে সঙ্গে ডলারের মূল্য বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে সেটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার করার প্রবণতা বাড়ছে৷

সরকার নিন্ম আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সেটার জন্য সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সুবিধাভোগীদের বাইরে যারা আছে যাদের আয়-রোজগার বাড়েনি তারা অনেক সংকটে আছে। তবে সরকারকে এ শ্রণিটাকে নিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু সরকারের সামর্থ্য সীমিত থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারকে এখাতে আরও মনোযোগী হতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, সরকার সভা করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে অনুযায়ী বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমবে সেটা প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। বাজারে পণ্যের দাম উঠার কারণ যেমন, মধ্যস্বত্বভোগী, সরবরাহ ক্ষেত্রে যে সমস্য হচ্ছে সে সব জায়গাগুলোতে হাত না দিয়ে শুধু চূড়ান্ত জায়গায় হাত দেই তাহলে সেটা বাস্তবসম্মত না। যদি চিনি, আটা, ছোলা, তেল যেটাই বলেন এসব পণ্য বিভিন্ন হাত ঘুরে বাজারে আসে। সেসব জায়গায় ম্যানুপোলেট হচ্ছে কিনা সেটা মনিটর করার জন্য আগে থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করে দাম কমানো সম্ভব না। সরকার যেটা করছে সেটাকে মধ্যমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের আমদানি কতো, মজুদ, ওএমএস এ এতটুকু ছাড়তে পারবো, আমাতনি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌছাতে কোন কারসাজি আছে কিনা,  উৎপাদন স্তর থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কারসাজি, চাঁদাবাজি আছে কিনা। এসব বিষয়গুলো সমাধান করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আইনের প্রয়োগ করে একটা সিস্টেমের মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছেন সে সিস্টেমকে আরো যুগোপযোগী করতে হবে। নজরদারি আরো শক্তিশালী করতে পারি তাহলে বাজার দর কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে। সুতরাং সেস্টেমিক বিষয়গুলোতে নজরদিতে হবে নইলে সব কিছু সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডলার সংকটের কারণে আমদানি পণ্যের দাম একটু বেশি পড়ছে। তবে দাম বৃদ্ধির প্রবণতায় এটাকে আংশিক কারণ হিসেবে ধরা যায়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় আমদানি স্তর থেকে পাইকারি স্তর, সেখান থেকে হাত ঘুরে রিটেল স্তর বা উৎপাদন স্তর থেকে খুচরা পর্যায়ে যে প্রক্রিয়া সেখানে নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ নিত্যপণ্যে অনেক পণ্যই আমাদের দেশে উৎপাদন হয়৷ যখন কোভিড বা ইউক্রেণ রাশিয়ার যুদ্ধ বা ডলারের সংকট ছিলোনা তখনও আমরা দেখেছি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আবার বাজারে চাহিদা অনুযায়ী দাম স্থির থাকবে সেটাও কিন্তু না। মুল বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পণ্যে দাম আছে কিনা৷ 

তিনি বলেন, মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখতে গেলে সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। এই যে বাজার ব্যবস্থাপনায় একটা দুষ্টুচক্র, সিন্ডিকেশন এর বিরুদ্ধে কৃষি আইন, ভোক্তা অধিকারকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে একটা সিস্টেমের মাধ্যমে। সে জায়গাগুলোতে আমাদের হাত দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।  

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দেশে নিত্যপণ্যের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে। তাই দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। তারপরও ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়ছে। গত রোববার (১৯ মার্চ) সবিচালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলাসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ আছে। কোনো পণ্যের ঘাটতি বা মূল্য বাড়ার আশঙ্কা নেই।

এদিকে সংবাদ সম্মেলন করে দেশে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ায় ঘোষণা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। মহাপরিচালক (ডিজি) এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেছেন, পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। চিনি, ছোলা, তেলসহ সব নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। সংকটের যে কথা বলা হচ্ছে তা কৃত্রিম ও এটা বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা এই কাজটা করছে। আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে, রমজান এলেই দাম বাড়ে। আর এ বিষয়টার সুযোগ নেয় অসাধুরা। এই বিষয়টা বাজারে দাম বাড়ানোকে উসকে দেয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা ঠেকাতে বরাবরের মতো এবারও নানা আয়োজন করেছে সরকার। ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, এবার রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে কঠোর বাজার মনিটরিং করবে সরকারের ১৩ সংস্থা। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন দাম বৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য রমজান মাসজুড়ে বাজার তদারকি করবে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৮টি মনিটরিং টিম বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে চারটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাজার নজরদারিতে ঢাকা সিটি করপোরেশন, আনসার, নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের একাধিক টিম বাজার মনিটরিংয়ে কাজ করবে। বাজার মনিটরিংয়ে থাকবে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের বিশেষ টিম।

প্রসঙ্গত, দেশে বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণ তেল ও চিনি মজুদ আছে। ছয় শিল্প গ্রুপের কাছে ৩ লাখ ২ হাজার ১৬৩ টন ভোজ্যতেল মজুদ আছে। আর পাঁচটি শিল্পগ্রুপের কাছে চিনি মজুদ রয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৫৬৩ টন। এছাড়া ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪৫ টন ভোজ্যতেল এবং ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৫০ টন চিনি পাইপলাইনে রয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ২১৫৫ ঘণ্টা, মার্চ ২৫, ২০২৩
জিসিজি/জেএইচ 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।