ঢাকা, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১, ২৩ জুন ২০২৪, ১৫ জিলহজ ১৪৪৫

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

লোনা পানিতে ভেসে গেছে মিঠা পানির পুকুর, বিঘ্ন ঘটবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে  

শেখ তানজির আহমেদ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯০৩ ঘণ্টা, মে ২৮, ২০২৪
লোনা পানিতে ভেসে গেছে মিঠা পানির পুকুর, বিঘ্ন ঘটবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে  

সাতক্ষীরা: বন্যপ্রাণীদের জন্য মিঠা পানির আধার হিসেবে খনন করা পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের আওতাধীন ৩৯টি পুকুর ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে লোনা পানিতে ভেসে গেছে। এতে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

একই ভাবে এসব পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল বনজীবী ও বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংকটও প্রকট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।    

বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের আওতায় সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জ অবস্থিত। এর মধ্যে খুলনা রেঞ্জে ২৩টি ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১৬টি ক্যাম্প রয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পেই মিঠা পানির আধার হিসেবে রয়েছে একটি করে পুকুর।

মূলত সুন্দরবনের প্রাণীকূল ও জেলে-বাওয়ালিদের কথা চিন্তা করে এসব পুকুর খনন করা হয়। পুকুরগুলোতে বছরজুড়ে সংরক্ষণ করা হয় বৃষ্টির পানি।

সুন্দরবনের প্রাণীকূল থেকে শুরু করে জেলে-বাওয়ালি ও বনবিভাগের কর্মীরা সুপেয় পানি হিসেবে এসব পুকুরের পানিই ব্যবহার করে থাকেন।  
 
দ্রুত লবণ পানি নিষ্কাশন করে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে সুপেয় পানির সংকটে পড়বে প্রাণীকূল ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগণ।

শ্যামনগর উপকূলের জেলে শফিকুল ইসলাম জানান, বনজীবীরা সুন্দরবনে গিয়ে বনবিভাগের পুকুর থেকেই পানি নিয়ে পান করেন। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বাঘ থেকে শুরু করে সব প্রাণী এসব পুকুরের পানি পান করে।

ঘূর্ণিঝড় রিমালের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝড়ে তো সব পুকুর লোনা পানির নিচে ডুবে গেছে। এতেই প্রাণীকূলের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে।  

প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ ঘূর্ণিঝড় রিমালে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বলেন, বনের ভেতরের মিষ্টি পানির পুকুরগুলো তলিয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনে পানীয় জলের সংকট বাড়বে। বহু বন্যপ্রাণী খাদ্য সংকটে পড়বে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খল বিনষ্ট হবে। বন্যপ্রাণীদের বিচরণ এলাকার সমস্যা হবে।

ঘূর্ণিঝড় এবং জ্বলোচ্ছ্বাস বা বিপদের সময় বন্যপ্রাণীরাও একটা মানসিক ট্রমার ভেতর থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কাটিয়ে খাপ খাওয়াতে সময় লাগে। যত দ্রুত পারা যায়, বনের ভেতরের সব মিষ্টি পানির পুকুরের পানি সেচে বৃষ্টির পানি দিয়ে ভরতে হবে। আরও পানির আধার তৈরি করতে হবে। বন্যপ্রাণীরা যাতে নিজেদের মতো করে এতে মানিয়ে নিতে পারে, সেজন্য কিছুদিন সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা দরকার।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে গাছ, বন্যপ্রাণী, অণুজীবসহ সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ পাবলিকলি প্রকাশ করতে হবে। এ ক্ষয়ক্ষতিকে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি প্রতিবেদনে’ যুক্ত করতে হবে। সর্বশেষ দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠিত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এ তহবিলের অর্থায়ন সরকারকে নিশ্চিত করতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে কেবল বন্যপ্রাণী নয়, বনজীবী মৌয়াল, জেলে, বাওয়ালিদের জীবনযাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতিকে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করেই পরিকল্পনা করতে হবে।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক কে এম ইকবল হোসাইন চৌধুরী বলেন, সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১৫টি ক্যাম্পে সুপেয় পানির পুকুরসহ প্রায় এক কোটি ছয় লাখ টাকার মালামালের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

গাছগাছালি বা বন্যপ্রাণীদের কি কি ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ভেসে আসা তিনটি হরিণ উদ্ধার করে পুনরায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। সুন্দরবনের সুপেয় পানির পুকুরগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা দ্রুত সেচের মাধ্যমে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৯০০ ঘণ্টা, মে ২৮, ২০২৪
এসআই

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।