ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

স্বাস্থ্য

কোলন ক্যান্সার: প্রয়োজন সচেতনতা

ডাঃ মালিহা শিফা | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩৪৪ ঘণ্টা, জুলাই ৩০, ২০১২
কোলন ক্যান্সার: প্রয়োজন সচেতনতা

ঢাকা: মলাশয়ের ক্যান্সার হচ্ছে এক ধরনের ক্যান্সার যা দেহের মলাশয়, মলনালী  (বৃহদান্ত্রের অংশ) বা অ্যাপেন্ডিক্সে অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হয়। এটি কোলন ক্যান্সার (colon cancer), বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার বা অন্ত্রের ক্যান্সার (bowel cancer) নামেও পরিচিত।

বিশ্বজুড়ে যত রোগী ক্যান্সার আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে আক্রান্তের হিসেবে তৃতীয় বৃহত্তম হলো কোলোরেক্টাল ক্যান্সার।

লক্ষণ:
মলাশয় এবং মলনালীর ক্যান্সার হলে প্রথম পর্যায়ে এর কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে এই রোগের প্রথম সতর্কতাসূচক লক্ষণগুলো হতে পারে:

১. মল ত্যাগের সময় কোনো পরিবর্তন (যেমন মলনালী দিয়ে রক্ত পড়া, একনাগাড়ে বেশকিছু দিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা কিংবা ডায়রিয়া কিংবা মলাশয় পুরোপুরি খালি হয়নি বলে অনুভূত হওয়া) লক্ষ্য করা, যে পরিবর্তন দশ দিনেরও বেশি সময় যাবৎ থেকে যায়।
২. মলের ভেতরে বা উপরে রক্তের কালো দাগ কিংবা লম্বা ও সরু আকৃতির মল বা পেন্সিল স্টুল|
৩. কালো, আঠালো মল, যেটা মলনালীতে রক্তক্ষরণের কারণে হতে পারে।
৪. পেটে গ্যাস হবার ব্যথা, বা প্রায়ই পেট ফুলে থাকা, পাকস্থলিতে অস্বস্তি বোধ করা কিংবা তলপেটের বা উদরের পেশির সংকোচন।
৫. অকারণেই হঠাৎ করে অবসাদগ্রস্ততা, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া কিংবা আহারের প্রতি অনীহা।

বৃহদান্ত্রেও কোনো অংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে আর তা কতদূর বিস্তার লাভ করেছে তার ওপর রোগের লক্ষণগুলো নির্ভর করে।

গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো হলো:

পায়ুপথে রক্তক্ষরণ:
•    কখনও রক্তক্ষরণ পরিমাণে বেশি হতে পারে আবার কখনও সামান্য হতে পারে। এটি গাঢ় লাল তাজা রক্ত হতে পারে আবার পুঁজমিশ্রিত কালচে লাল রক্তও হতে পারে। কখনও পায়খানা কালো হতে পারে।
•    পেটে চাকা অনুভূত হয়। এ ক্ষেত্রে রোগী হঠাৎ করেই পেটে চাকা বুঝতে পারেন।
•    পেটে বা পায়ুপথে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
•    কোলনের মল সঞ্চালন বন্ধ হয়ে (কখনও ক্যান্সার অনেক বড় হয়ে এমনটি হতে পারে) পায়খানা আটকে যায়। ফলে পেট ফুলে যায়, পেটে ব্যথা হয় ও বমি হতে পারে।
•    রোগীর অন্য কোনো অসুবিধা থাকে না শুধু রক্তশূন্যতা হয়। সাধারণত ডানদিকের কোলন অর্থাৎ সিকাম বা এসেন্ডিং কোলনের ক্যান্সারে রোগী শুধু রক্তশূন্যতা ও দুর্বলতা নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে।
•    বামদিকের বড় টিউমার হলে অনেক সময় তা বাম দিকের মূত্রনালিকে চেপে রাখে ফলে বামদিকের কিডনি ফুলে যায়। যা হাইপোনেফ্রসিস নামে পরিচিত।
•    রোগীর ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, রুচি কমে যায়।

করণীয়:

মনে রাখতে হবে, লক্ষণ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে রোগীর চিকিৎসা ফলপ্রসূ হয় ও ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক কমে যায়। রোগ যদি একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় থাকে অর্থাৎ টিএনএম স্টেজ এক ও দুই থাকে সেক্ষেত্রে ক্যান্সার শুধু বৃহদান্ত্রের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তখন চিকিৎসা করলে ৯০ শতাংশ রোগী পাঁচ বছরের বেশি বেঁচে থাকে। কিন্তু যদি টিএনএম স্টেজ তিন অর্থাৎ বৃহদান্ত্রের বাইরের চারপাশে ও লিম্ফনোডে ছড়ায় সে ক্ষেত্রে সব ধরনের চিকিৎসা করা হলেও (এমনকি উন্নত বিশ্বেও) মাত্র ৪০ শতাংশ রোগী পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচে। আর কোলন ক্যান্সার যদি স্টেজ চার-এ অর্থাৎ কোলন থেকে দূরবর্তী স্থানেও ছড়ায় সে ক্ষেত্রে সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা সত্ত্বেও মাত্র ৫-৭ শতাংশ রোগী সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কাজেই সংকোচ, দ্বিধা ইত্যাদি বশবর্তী হয়ে কখনোই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করবেন না।

কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কাদের বেশি:
কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত কারা হবেন তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

১। বয়স:
যদিও অল্প বয়সেও কোলন ক্যান্সার হওয়া সম্ভব তার পরও বেশি বয়সে যেমন ৫০ বছরের পর কোলন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। প্রতিবছর কোলন ক্যান্সারে যে পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হয় এর মধ্যে শতকরা ৯০ জনের বয়সই ৫০-এর বেশি। তাই এ বয়সে যদি হঠাৎ মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন হয়, পায়ুপথে রক্ত যায় অথবা অকারণেই রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রক্তের অকাল ব্লাড টেস্ট ও কোলনস্কোপি করা উচিত।

২। লিঙ্গ:
যদিও কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমভাবে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তবে আমেরিকান সোসাইটি ফর ক্যান্সার রিসার্সের তথ্য অনুসারে নারীরা কোলন ক্যান্সার ও পুরুষরা রেক্টাল ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হয়।

৩। বংশগত:
নিকট আত্মীয়, যেমন মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে এই ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। একের অধিক নিকটাত্মীয় এ ধরনের সমস্যার শিকার হলে কোলন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা আরও অনেক বেশি থাকে।

৪। খাদ্যাভ্যাস:
যারা মাংস, বিশেষ করে গরু ও খাসির মাংস বেশি খান ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার কম খান তাদের মধ্যে কোলন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তৈলাক্ত খাবার, টিনজাত খাবার ও ফাস্টফুডও ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই উন্নত বিশ্বে কোলন ক্যান্সার হওয়ার হার বেশি।

৫। ডায়াবেটিস:
ডায়াবেটিক রোগীদের কোলন ক্যান্সারে ভোগার আশঙ্কা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি।

৬। বৃহদান্ত্রের অন্য সমস্যা:
কারও যদি কোলনে এডেনোমা বা পলিপ থাকে তা বর্তমানে ক্যান্সার নয়, সেখান থেকেও ক্যান্সার হতে পারে। তাই প্রথম অবস্থায়ই সতর্ক হন। কারো যদি ইনফ্ল্যামেটরি বাউল ডিজিজ যেমন আলসারেটিভ কোলাইটিস থাকে, সেখান থেকেও ক্যান্সার হতে পারে। তাই যাদের দীর্ঘদিন ধরে প্রায়ই রক্তমিশ্রিত পায়খানা হয়, পেটে ব্যথা হয়, ডায়রিয়া হয় তারা পরীক্ষা করিয়ে নিন।

৭। ধূমপান:
ধূমপান কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। সিগারেটের ক্ষতিকারক পদার্থ মুখের লালার মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে পেটে যায় ও ক্যান্সার তৈরি করতে পারে।

৮। মদ্যপান:
যারা বেশি মদ্যপান করেন তাঁদের কোলন ক্যান্সার বেশি হয়। অতিরিক্ত মদ্যপান শরীরের ফলিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয় যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৯। মেদ বা অতিরিক্ত ওজন:
কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও শরীরচর্চায় অনাগ্রহ, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদিও কোলন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

চলবে.....

লেখক: সার্ভিল্যান্স মেডিকেল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বাংলাদেশ সময়: ১৩০৪ ঘণ্টা, জুলাই ৩০, ২০১২
সম্পাদনা: তানিয়া আফরিন

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa