ঢাকা, বুধবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৭ শাবান ১৪৪৫

মালয়েশিয়া

অভিযোগ নয়, অনুরোধ

মাহমুদ খায়রুল, কুয়ালালামপুর করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫২২ ঘণ্টা, আগস্ট ২৭, ২০১৪
অভিযোগ নয়, অনুরোধ ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে ৬ থেকে ৭ লাখ শ্রমিক বৈধভাবে বসবাস করেন। এছাড়াও অনেকে আছেন যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন।



প্রতিদিন বৈধ অবৈধ পথে ভাগ্য বদলাতে এদেশে আসছেন বহুসংখ্যক বাংলাদেশি। কেউ হচ্ছেন স্বনির্ভর, কেউ খালি হাতে ফিরছেন নিজ দেশে। এসব নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ কম নেই প্রবাসীদের।

তবে যারা ভাগ্য বদলাতে সফল হয়েছেন তাদের অভিযোগ কম। যারা এখনও পারেননি, অভিযোগ তাদের একটু বেশি। ভালোবাসা, রাগ, হিংসা, অভিমানে ঘেরা তাদের প্রবাস জীবনে।

কেন এই রাগ, কেন এই হতাশা, কী অভিযোগ তাদের?

মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশির শতকরা ৮০ শতাংশ শ্রমিক। যার সিংহভাগ সরাসরি গ্রাম থেকে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় এসেছেন। শহর এবং শহরের মানুষ কেমন তাদের তা জানা নেই। পরিবার ছেড়ে ভাগ্য বদলানোর দৌড়ে নেমে পরেছেন। যাদের ভাগ্য ভাল তাদের যাত্রা হয় স্বাভাবিক। আর যারা বেছে নেয় অবৈধ পথ তাদের পরিণাম হয় করুণ।

মালয়েশিয়ায় আসার পর যখন কাজে যোগদান করে তাদের পাসপোর্ট জমা রাখা হয় মালিকের কাছে। কাজের চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটি জমা থাকে তাদের কাছে।

সোমবার থেকে শনিবার। ৬ দিন কাজ। কেউ কেউ কাজ করেন রবিবারেও। কিছু সময় পেলে শহরে আসেন বেড়াতে। এই অবসর সময়েও তাদের শান্তি নেই।
এখানেও আসে পুলিশের হয়রানি। মালয়েশিয়া পুলিশের কাছে বাংলাদেশি মানে সোনার হরিণ। বিভিন্ন অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল চলে তাদের। বাংলাদেশিরা তাদের কোনো সমস্যা হলেও তা পুলিশের কাছে প্রকাশ করতে ভয় পায়। বৈধ বা অবৈধ দু’পক্ষই।

এখন আসি, মালয়েশিয়ার স্থানীয়দের কথায়। স্থানীয়দের কাছে বাংলাদেশিদের চিত্র আরও খারাপ। বাংলাদেশিদের অনেক ‘নিচুতলার’ মানুষ হিসেবে দেখা হয় এখনে। কেউ ভালোভাবে কথা বলে না, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অভিযোগ আছে, বাসে, ট্যাক্সিতে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়।

বেশ কিছু মালয়েশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাছে এত বেশি বাংলাদেশি নিজ দেশে দেখাটা স্বাভাবিক নয়। মালয়েশিয়ান নারীরা বললেন, আমরা যখন বাসে-ট্রেনে যাতায়াত করি, বাংলাদেশিরা অস্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। খুবই অপছন্দের ব্যবহার এটি। আচরণগত দিক থেকে তারা আমাদের কাছে পছন্দনীয় নয়।

এখানে বাংলাদেশিদের নিজেদের মাঝে সম্পর্কটা কেমন? দুই ধরনের বাংলাদেশি পাবেন এখানে। একদল যারা নিজেদের বেশ সবজান্তা মনে করেন এবং নিজেদের বাংলাদেশি বলতে লজ্জা পান। আর একদল যারা নিজ দেশের মানুষের কাছেই থাকতে বেশি পছন্দ করেন, যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অভিযোগ আছে বাংলাদেশি দূতাবাসের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের যে পরিমাণ সেবা দেয় তা অন্যান্য দূতাবাসের তুলনায় অনেক বেশি। । সেবার দিক থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছাকাছি আছে মায়ানমার এবং ইন্দোনেশিয় দূতাবাস। এ দুটি দূতাবাসও তাদের দেশের নাগরিকদের প্রচুর সেবা দিয়ে থাকে।    সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা এত বেশি যে, দূতাবাস কর্মকর্তাদের তা সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয়। এছাড়াও নানা উটকো আর অদ্ভূতুরে সমস্যা নিয়ে দূতাবাসে জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন শত শত বাংলাদেশি। তারা তাদের সাধ্যমতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক, দূতাবাস সম্পর্কে প্রবাসীদের অভিযোগের সবকিছুই যে ভিত্তিহীন, তা কিন্তু বলা যাবে না।

এখানের বেশিরভাগ বাংলাদেশি, যারা সচ্ছল এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন তারা তুলনামূলকভাবে খারাপ অবস্থানে থাকা স্বজাতি লোকদের এড়িয়ে চলেন। যাদেরকে দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা সম্ভব তারা উদাসীন। হয় তারা নিজের সাফল্য ধরে রাখতে ব্যস্ত অথবা ছোটখাট কাজে তারা নাক গলিয়ে ঝামেলায় জড়াতে চান না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাদের দোষ দিবেন? কাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবেন? দোষ কি আমাদের নিজেরও নয়? নাকি শুধু অন্যের? নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অবৈধভাবে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসছেন এ দেশে। সঠিক তথ্য না নিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী আসছেন বিভিন্ন নকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। নিজের দেশের লোকের সঙ্গে প্রতারণা করছি আমরা। অপরের ভালো দেখতে আমাদের কষ্ট হয়। দু’মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে পারি না আমরা। নিজের দেশের ভাইকেও এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি।

তাই মালয়েশিয়া প্রবাসী সকল বাংলাদেশির প্রতি অনুরোধ, একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার। সমসময় নিজের লাভের কথা চিন্তা না করে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই।

আর সুশীল সমাজ একটি উন্নয়ন কমিটি করতে পারে যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কথা সাড়া মালয়েশিয়া জানতে পারবে। যেন কেউ আমাদেরকে আর ছোট করে না দেখে। যেন বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পুলিশি হয়রানি থেকে বিরত থাকে।

একজন বিদেশি কর্মচারীর সমমর্যাদা পাবেন সবাই। কোনো অন্যায় কাজের বিচার চাইতে পারবে। দূতাবাসের কাছেও অনুরোধ, একজন বাংলাদেশি হিসেবে যেন তারা একটু ভাল ব্যবহার পান। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে প্রবাসীরা দূতাবাসে যান। আর দূতাবাসই তাদের শেষ ভরসা।

ভাল-খারাপ এর লড়াই চললে হয়তো মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের ঐক্যের পরিবর্তন কখনই আসবে না। তবে গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে পারলে এ দেশে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বলভাবে দেখবে মানুষ। তাই অভিযোগ নয়, অনুরোধের আশায় চেয়ে আছে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশিরা।

বাংলাদেশ সময়: ১৫২৩ ঘণ্টা, আগস্ট ২৭, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মালয়েশিয়া এর সর্বশেষ