জামালপুরের মাদারগঞ্জে কিছু তরুণ উদ্যোক্তার প্রচেষ্টায় শুরু হওয়া সমবায় সমিতিগুলো সংকটে পড়েছে। সমিতিপ্রধানদের চোখে এই সংকটের কারণ দুর্ভিক্ষ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্য।
২০২৩ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে- সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যেই শুরু হয় বিপর্যয়। এর পর অনেক সমবায় সমিতি টানাপোড়েনে পড়ে। বিশেষ করে, আমানতকারীরা হঠাৎ করেই গচ্ছিত অর্থ উত্তোলনের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন—যা সমিতিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।
সমবায় সমিতিগুলোর মূল কাঠামো অনুযায়ী, তারা গ্রাহকদের আমানত বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর লাভ সহকারে অর্থ ফেরত দেয়। কিন্তু যখন গ্রাহকেরা একযোগে টাকা তুলতে শুরু করেন, তখন প্রকল্পভিত্তিক আয় না আসা পর্যন্ত নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয়। ফলে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ২৩টি সমবায় সমিতি এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, তারা সময় পেলে আমানত পরিশোধে সক্ষম, কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় উত্তেজনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক উজ্জ্বল তালুকদারের নাম উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে গ্রাহকদের উত্তেজিত করে তুলেছেন।
মাদারগঞ্জের বালিজুড়ী বাজারের বাসিন্দা শাহিদা আক্তার বলেন, সমিতি ৩৫ বছর ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে চলছে। আমার দাদা ছিলেন সদস্য, এরপর আমার বাবা। আমাদের পরিবারের পড়াশোনার খরচ, অন্যান্য প্রয়োজন এই সমিতির লাভ থেকেই মেটানো হতো। এমনকি আমাদের গ্রামের অনেকেই এর সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন এমন হলো?
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি— ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাপের মুখে একসঙ্গে টাকা ফেরত দিতে পারে না। কিন্তু সমিতির অফিসগুলো কেন বন্ধ হয়ে গেল?
ক্ষতিগ্রস্ত সমিতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাদারগঞ্জ আল আকাবা বহুমুখী সমবায় সমিতি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের মোট আমানত ছিল ৪৯১ কোটি ৭৬ লাখ ৭৬ হাজার ৪৭ টাকা। কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৬ টাকায়। সমিতিটিকে একশ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সমিতি ৮০০ কোটি টাকা মুনাফা দিয়েছে।
একইভাবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্বদেশ বহুমুখী সমবায় সমিতিতে আমানত ছিল ৫৬ কোটি ৮৯ লাখ ৮৯ হাজার ২৫১ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা গ্রাহকদের ২৪ কোটি দুই লাখ ১০ হাজার ২৪০ টাকা ফেরত দিয়েছে। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ছিল দুই হাজার ২৩১ জন, দুই বছরের ব্যবধানে নেমে এসেছে মাত্র এক হাজার ৬৯ জনে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৯ কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা মুনাফা দিয়েছে।
একইভাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে নবদ্বীপ বহুমুখী সমবায় সমিতির আমানত ছিল ৫৮ কোটি টাকা। এরইমধ্যে প্রায় ৪০ কোটি টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিয়েছে।
স্বদেশ বহুমুখী সমবায়ের সভাপতি আনিসুর রহমান বলেন, আমরা পালিয়ে যাইনি। নিয়মিতভাবে টাকা পরিশোধ করছি। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে এবং মামলা-হামলার চাপ কমলে আমরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারব।
নবদ্বীপ সমবায়ের সভাপতি ইব্রাহিম খলিল বলেন, আমরা মাদারগঞ্জের অর্থনীতির গতি বাড়াতে কাজ করেছি। শেখ হাসিনার এক মন্তব্যের পর হঠাৎ করে যে চাপ আসে, তা সামাল দিতে আমাদের সমস্যা হয়। তবে সময় পেলে আমরা সব টাকাই ফেরত দিতে পারব।
বাংলাদেশ সময়: ২১৩৬ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০২৫
আরএইচ