ঢাকা, শনিবার, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৩ আগস্ট ২০২২, ১৪ মহররম ১৪৪৪

জাতীয়

ফুটওভার ব্রিজ যেন ভাসমান বাজার!

মাছুম কামাল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২৪৫ ঘণ্টা, জুলাই ৬, ২০২২
ফুটওভার ব্রিজ যেন ভাসমান বাজার!

ঢাকা: প্রবাদে আছে ‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার। ’ প্রবাদের সেই অসার যেন সাধারণ জনগণ।

ফুটপাতগুলো দখল হয়ে গেছে বহু আগেই। উচ্ছেদ-ফের দখল-ফের উচ্ছেদ খেলাও চলমান আছে বহুদিন। এবার রাজধানীর ফুটওভার ব্রিজগুলোও পরিণত হয়েছে ভাসমান বাজারে। ফলে, বিরক্তি প্রকাশ করলেও এটি মেনে নিয়েই প্রতিদিন ওভারব্রিজ দিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছেন সাধারণ জনগণ।

বুধবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে রাজধানীর ফার্মগেট, সাইন্সল্যাব, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটওভার ব্রিজ ঘুরে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে। এ সময় চোখে পড়ে, ফুটওভার ব্রিজগুলোর গোড়ায় তো বটেই, উপরেও নানান মনোহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।

নির্বিকারভাবে তারা বিক্রি করছেন, ক্রেতারাও কেউ-কেউ নির্বিকারভাবে কিনছেন। বিক্রি হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় নানা বৈচিত্র্যময় পণ্য সামগ্রী। যেন এটাই হওয়া উচিত, একই সঙ্গে স্বাভাবিক।

তবে, ফুটওভার ব্রিজ দখল করে এমন দোকানের পসরা সাজানো কতটুকু যুক্তিসঙ্গত এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই৷ নিউমার্কেট এলাকায় কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাশেদুলের সঙ্গে। বাংলানিউজকে তিনি বলেন, আপনি দেখেন ওভারব্রিজটার প্রায় পুরোটাই দখলে। মানুষ ভিড় করে সিরিয়াল ধরে কোনোরকম পার হচ্ছে। অথচ, এটি স্থাপন করা হয়েছিল মানুষের পারাপারের জন্য। নিচে ফুটপাতেও দেখেন একই চিত্র। কিছু করার নেই আসলে। ভাগ-বাটোয়ারার অংশ সবাই পায়।

ভাগ-বাটোয়ারার ইতিহাস পাঠক আপনারা নিশ্চয় জানেন। সেটি নতুন নয়। তবে সেটি কতটা বিস্তৃত হলে এভাবে প্রকাশ্যে হাঁটার জায়গায় বা রাস্তা পারাপারের জায়াগায় দোকান বসানো যায়, সেটি বুঝতে রকেট-সাইন্স জানা লাগে না।

সে আলাপ একপাশে রেখে কথা বলি বেসরকারি চাকরিজীবী রিয়াজের সঙ্গে। তিনি ফুটওভার ব্রিজের উপরে একটি দোকান থেকে মানিব্যাগ কিনছিলেন। জানতে চাইলে বলেন, ভাই এখানে দোকান দিয়েছে দেখেই কিনছি। না থাকলে নিশ্চয় কিনতাম না। অসুবিধায় কিন্তু আমরাই পড়ি হাঁটার সময়।

ঘর্মাক্ত কলেবরে কোনোরকমে ব্রিজ পার হওয়া পঞ্চাশোর্ধ শহীদুল হক অভিযোগ করে বাংলানিউজকে বলেন, এসব নিয়ে আর কী বলব ভাই। পুরো ঢাকা শহরই একপ্রকার দখল হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে রাস্তা পার হয়েছি। কিছু বললেও বিপদ। ওভারব্রিজ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত থাকুক এটাই চাওয়া।

এদিকে ফুটওভার ব্রিজে দোকানের কারণে নিচ দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া রোড ডিভাইডার লাফিয়ে পার হতে দেখা যায় শয়ন নামে একজনকে। ফুটওভার ব্রিজ থাকতে কেন নিচ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, নিউমার্কেটে একটি দোকানে চাকরি করেন। ফুটওভার ব্রিজ পার হতে সময় লাগে। অনেক মানুষ একসঙ্গে ওঠে। সে তুলনায় জায়গা কম। ওখানে অনেকগুলো দোকান আছে। তাই নিচ দিয়ে পার হয়েছেন।

কিন্তু, সড়কের ডিভাইডার টপকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের ফলে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যেখানে লোকাল বাস, লেগুনা বা অন্যান্য পরিবহনগুলোর সড়কের ওপরে রেষারেষি নৈমিত্তিক ঘটনা। তারা মনে করছেন, এর ফলে সড়ক আইন অমান্য করার প্রবণতাও বাড়বে।

এদিকে, ওভারব্রিজে পসরা সাজিয়ে বসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বাংলানিউজকে বলেন, ভাই এ জায়গাটাও কিনে নিতে হয়েছে। মাস শেষে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হয়। কার কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের দোকান ভাড়া নেওয়ার সক্ষমতা নেই। ফুটপাতেও জায়গা পাইনি। তাই বাধ্য হয়েই এখানে দোকান দিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, দেখেন এ বিষয়টা আসলে সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ দেখে। তবে, আমরা মেয়র মহোদয়ের নির্দেশে নতুন-নতুন মার্কেট তৈরি করছি। লটারির মাধ্যমে সেখানে দোকানও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারপরও এমন অবস্থা। আসলে ঢাকায় অপর্যাপ্ত ভূমির তুলনায় মানুষ বেশি হওয়ার কারণেই এমন হচ্ছে।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা (উপ-সচিব) মো. রাসেল সাবরিন বাংলানিউজকে বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পাইনি। ফুটওভার ব্রিজ ক্লিন রাখা আমাদের একটা রুটিন ওয়ার্ক। আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি। আবারও চালাব।

কবে নাগাদ চালাবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন তো ঈদ সামনে। ঈদের পর আমরা অভিযান চালাব।

তবে, সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা হাজারো সমস্যার এই নগরীতে অন্তত ফুটপাত এবং রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজগুলো দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবেন তারা।

বাংলাদেশ সময়: ২২৪৫ ঘণ্টা, ৬ জুলাই, ২০২২
এমকে/এমএমজেড

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa