ঢাকা, শনিবার, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, ০২ মার্চ ২০২৪, ২০ শাবান ১৪৪৫

মুক্তমত

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে সমস্যায় মধ্যবিত্ত

হীরেন পণ্ডিত, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১২২ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৬, ২০২৩
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে সমস্যায় মধ্যবিত্ত

জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সংকটে আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে আয় না বাড়ায় জীবনযাপনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ।

চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে নিত্যদিনের খাদ্যতালিকা থেকে কাটছাঁট হচ্ছে অনেক কিছু। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরও এই চাপ থাকতে পারে। ২০২২ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ১০.০৮ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির এর আগের বছরের (২০২১) হিসাব অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৬.৯২ শতাংশ। এ হিসাবে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার হার ৩.১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবরে মানুষের আয় বেড়েছিল ৫.৯৭ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবরে আয় বেড়েছে ৬.৯১ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে আয় বেশি বেড়েছে ০.৯৪ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার ৫.৭০ থেকে বেড়ে ৮.৯১ শতাংশ হয়েছে। তবে বিবিএসের মূল্যস্ফীতি ও আয় বাড়ার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে একাধিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা।

‘জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। ব্যয় বাড়ার অসংখ্য কারণ আছে, যা আমরা অনেকেই জানি। ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফা করছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেল, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এসব নানা কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এতে মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে। মানুষের আয়-রোজগার যখন বাড়ে তখন নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়লেও তা সহনীয় হয়। কিন্তু অনেক মানুষের আয়-রোজগার বাড়েনি। কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা বেশি সংকটাপন্ন। গত বছর খারাপ গেছে, এই বছর ভালো যাবে, তারও কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। ভোক্তারা সংগঠিত নয়। আবার তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের হাতে তারাই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ঢাকায় বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের প্রথম মাসের তুলনায় ১০.০৮ শতাংশ বেশি ছিল। যদিও গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি আর খাদ্যবহির্ভূত অংশের তুলনায় কম ছিল যথাক্রমে ১০.০৩ ও ১২.৩২ শতাংশ, উভয়ই দুই অঙ্ক স্পর্শ করেছে। তবে সাধারণ পরিবারের তুলনায় নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর গড় মূল্যস্ফীতির চাপ ৯.১৩ শতাংশ কম ছিল।

বার্ষিক খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ১০.৪১ ও ৭.৭৬ শতাংশ কম ছিল, যদিও উভয় শ্রেণির পণ্য ও সেবা মৌলিক প্রকৃতির ছিল। ক্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৮৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৬.৫০ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি গত আগস্টে সর্বোচ্চ ৯.৫২ শতাংশ উঠেছিল। এর পর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই হার কমে ৮.৮৫ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু আলোচ্য এ সময়ে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। গ্যাসের দাম এবং তার আগে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পানির দামও বাড়ানোর কথাবার্তা চলছে। নতুন করে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সব খাতেই উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর প্রভাবে আরো বাড়ছে পণ্যের দাম, পরিবহনভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের খরচ। চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া ওয়াসার পানি, নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের গড় বাড়িভাড়া এবং ফ্ল্যাট বাসার ভাড়া বেড়েছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালের পর গত বছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শহর ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা বাংলাদেশের লাখ লাখ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের দুর্দশা বাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য টাকা ছাপানো কমাতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মুদ্রানীতিকে ব্যবহার করতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট কাটানোর জন্য আমাদের এক্সচেঞ্জ রেটকে সাপোর্টও দিতে হবে এবং এক্সচেঞ্জ রেট কমাতেও হবে। আমরা সেটা করতে পারছি না। যদি এক্সচেঞ্জ রেট আরো বেশি পতন হয় তাহলে ঋণসংকট আরো বড় হয়ে যাবে। ’

ঢাকা মেগাসিটির ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তারা খাদ্যবহির্ভূত ঝুড়িতে আপেক্ষিকভাবে খানিকটা বেশি ব্যয় করেন, যার মধ্যে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য এবং বিভিন্ন পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে উচ্চ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টিকারী এই জিনিসগুলোর এক ধরনের টেকসই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী খুব মৌলিক, কম দামের এবং সীমিত খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করে, যার মধ্যে কিছু দামের ক্ষেত্রে মৌসুমি প্রভাব এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মূল্যের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। কারণ এগুলোর সরবরাহ শক্তিশালী যেমন মোটা চাল ও সস্তা মাছ। বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো উচিত। সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ক্যাব ও গণমাধ্যমকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। উচ্চমূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ আগামী বছরজুড়েও থাকবে। পণ্য সরবরাহ যত দূর সম্ভব স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে যত দূর সম্ভব আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে।

মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকা ও টাকার মান কমে গিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে ক্রমাগত। অন্যদিকে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় মান কমে যাচ্ছে। ব্যয়ভারে সংকুচিত হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন। একই সঙ্গে সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি হয়েছে। জুন পর্যন্ত গ্যাসের দাম বেড়েছে, জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। আগস্টে সারের দাম বাড়ানো হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সব খাতে। শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এর প্রভাবে বেড়েছে পণ্যের দাম। যা মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। একইসঙ্গে গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহন ভাড়া বেড়েছে লাগামহীনভাবে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাড়বে। ব্যাটারিচালিত গণপরিবহনের ভাড়াও বৃদ্ধি পাবে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল চালিকা শক্তি ক্যাপটিভ পাওয়ার। সেই ক্যাপটিভ পাওয়ারের দাম একলাফে ৮৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকার জায়গায় এখন দিতে হবে ৩০ টাকা। এতে পণ্য উৎপাদন খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে। যদিও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সব মিলে পণ্য ও মানুষের চলাচলের খরচ বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়ানোর কারণে কৃষি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে চলছে।

জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতকে বলা হয় অর্থনীতির লাইফ লাইন, যা অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো। সব ধরনের পণ্য ও সেবা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এগুলোর প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ এসব পণ্য ও সেবা ছাড়া বৈশ্বিক বা মানুষের জীবনযাত্রা কল্পনাই করা যায় না। যে কারণে এসব পণ্যের দাম দেশে বা বিদেশে বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে দেশীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও পড়ে। আকস্মিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে রপ্তানি ও শিল্প খাতে। চড়া দামে গ্যাস কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তার খরচও বাড়বে। গ্যাস নির্ভর শিল্পের বয়লার পরিচালন খরচও বাড়বে। বিশেষ করে বস্ত্র, সিরামিক, প্লাস্টিক, লৌহ, প্রকৌশল, জাহাজ ভাঙা, ইস্পাত শিল্পে খরচ বেশি বাড়বে। এগুলোর দাম বাড়লে নির্মাণ, আবাসন, উন্নয়ন খরচসহ অনেক খাতেই খরচ বাড়বে। ভোক্তা পর্যায়ে নতুন করে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর ফলে সব খাতেই উৎপাদন খরচ বাড়বে। এবার গৃহস্থালি থেকে শুরু করে কৃষির সেচ, শিল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রশিল্প, নির্মাণশিল্প, ধর্মীয়, শিক্ষা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান, পানির পাম্প, ইলেকট্রিক যানের ব্যাটারি চার্জ, মাঝারি, বড়, ভারী শিল্প খাতে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এর প্রভাবে কৃষি উৎপাদনে সেচের খরচ বাড়বে। এসব খাতে শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বাড়বে পণ্যের দাম। বিদ্যুৎচালিত ব্যাটারি চার্জেও খরচ বাড়ায় এর ভাড়াও বাড়তে পারে। পানির পাম্পের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে এর দামও বাড়বে। ডলারের দাম, জ্বালানি তেল, বিদ্যুতের দাম, গ্যাসের দাম বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প পণ্যের উৎপাদন খরচ ইতোমধ্যেই ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে কৃষিপণ্যের দাম। শিল্প পণ্যের দামও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

এদিকে ভোক্তার আয় কমায় সার্বিকভাবে বিক্রি কমে গেছে। সব মিলে ভোক্তার কাঁধে চাপ বাড়ছে। মন্দায় আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে ভোক্তাকে জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে হবে। এটি করলে খাবারে পুষ্টির মান কমবে। বিনোদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ এসব খাতে ব্যয় কমাতে হবে। ফলে ওইসব খাতে আরও মন্দা ভর করবে। ইতোমধ্যেই পণ্যের বাড়তি দামে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠেছে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেকে সঞ্চয়ে হাত দিয়েছেন। নতুন সঞ্চয়ও করতে পারছেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকে। সার ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় কৃষিতে সংকট আরও বেশি। একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সেচের খরচ বাড়বে। বাড়তি দামেও গ্রামে বিদ্যুৎ মিলছে না। ফলে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সেচের বড় মৌসুম চলছে এখন। মার্চ পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে গ্রামে লোডশেডিংও বেড়েছে। এছাড়া সারের তীব্র সংকট তো আছেই।

আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় দেশেও এর দাম বেড়েছে। এদিকে ডলার সংকটের কারণে এসব পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে দাম আরও বাড়ছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি আলোচনা এখন আর শুধু অ্যাকাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখন সাধারণ মানুষও জানতে চাইছেন এবং জানতে পারছেন কী হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে, ডলারের রিজার্ভ কত, খেলাপি ঋণ কত, কে বা কারা ঋণ নিচ্ছেন বিপুল পরিমাণে আর তার প্রভাব কী বেশি দামে ডলার কেনা, রেমিট্যান্স কেনা, রপ্তানি বিল নগদায়নে গ্রাহকদের বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। আবার ব্যবসা মন্দার কথা বলে ব্যবসায়ীরাও ঋণ পরিশোধ করতে গড়িমসি করছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে সব মিলিয়ে ১ হাজার ২৬১ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিষয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ করে থাকে বিশ্বব্যাংক। ডলার- সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ হলো, ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১৮ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রাার রিজার্ভ কমেছে ৮০০ কোটি ডলার। এ কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুদকে সহায়তা করতে এবং বিদেশি মুদ্রার চাহিদার চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চেয়েছে, যা পাওয়া যাবে সাত কিস্তিতে এবং সুদের হার হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৮৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে ৯.১ শতাংশ হলেও এই দুই মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালের আগস্টে গত ১১ বছর ৩ মাসের (১৩৫ মাস) মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০.২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে পর্যাপ্তভাবে কাভার করার জন্য যথাযথ পরিবীক্ষণের সঙ্গে ওএমএস কার্যক্রম শক্তিশালী করা উচিত। দেশে এক কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করা উচিত। দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতাও বাড়াতে হবে। এ ছাড়া অস্থায়ীভাবে আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে খাদ্য, খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক পণ্য এবং দুঃস্থ জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ টাকা হস্তান্তর কর্মসূচি বাড়ানো উচিত। যেহেতু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় শহুরে জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির কারণে বেশি চাপ এবং অসহায়ত্বের সম্মুখীন হয়, তাই সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার মাধ্যমে শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ ছাড়া শহুরে নিম্ন মধ্যম ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা স্কিম তৈরি করা উচিত, যাতে তারা সফলভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।