ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩১, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ২৭ শাবান ১৪৪৬

রাজনীতি

হাতাহাতি-মারামারির মধ্যেই নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ

ইউনিভার্সিটি করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২০৭ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৫
হাতাহাতি-মারামারির মধ্যেই নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘিরে মারামারি । ছবি: ফাহিম হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়কদের নেতৃত্বে নতুন ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ আত্মপ্রকাশ করেছে। সংগঠনের কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিক্ষোভ, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার সময় সমন্বয়ক রিফাত রশীদকে কমিটিতে শীর্ষ নেতৃত্বে না রাখা নিয়ে সংগঠনের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়ান বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা। কমিটি ঘোষণার পর দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের একাধিক নেতা বলছেন, হামলার পেছনে রিফাত রশীদ সরাসরি জড়িত। তিনি মহানগর ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয়ের কাজ করছিলেন। দলে মনমতো পদ না পাওয়ায় তিনি উত্তরা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়েছেন।  

হাতাহাতি-মারামারির সন্ধ্যায় বারডেম হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক পরিচয়ে ফারাবী নামে একজন বলেন, সংগঠনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেন নেই, তা জানতে মধুর ক্যান্টিনে গিয়েছিলাম। ঢাবির সিন্ডিকেটের এই কেন্দ্রীয় কমিটিকে আমরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। যতক্ষণ তারা ভুল স্বীকার করে কমিটি পুনর্গঠন করবে না, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে আমরা নেই।

জাহিদ হাসান জেমস নামে আরেকজন দাবি করেন, আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেকের (অংশ) জন্য এসেছিলাম। তারপরও আমাদের ওপর হামলা হলো।  

তবে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের কমিটিতে মহানগর ও সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন। তবে আমরা কমিটি ঘোষণার আগেই একটি পক্ষ এসে ঝামেলা করে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতারা জানান, মারধরের শিকার হয়েছেন— মাস্টার দা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দিন, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আরমানুল, আরিফ, আহনাফ, সরদার নাদিম শুভ, ইতিহাস বিভাগের হাবিব, মিথুন, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী শাহীন প্রমুখ। মারধরের শিকার হলেও তারা কেউ গুরুতর আহত হননি।

তবে মারধরের ঘটনায় আহত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিশু আলি এবং প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগের আকিব আল হাসান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।  

এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের চারজন আহত হয়েছেন।

সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘিরে কী হয়েছিল

নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে আজ (বুধবার) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশের সময় জানানো হয়। তবে সংগঠনের মূল উদ্যোক্তারা মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত হতে দেরি করেন। এ সময় সংগঠন সংশ্লিষ্ট কিছু শিক্ষার্থী মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলনের স্থানে ছিলেন।

পরে বিকেল ৪টা নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের একদল শিক্ষার্থী মধুর ক্যান্টিন এলাকায় আসেন। তারা শুরুতে নিজেদের উত্তরা এলাকার শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দেন। এ সময় তারা ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, উত্তরায় বৈষম্য, মানি না, মানব না’, স্লোগান দেন।  

তখন স্লোগানের কারণ জানতে চাইলে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে একজন বলেন, এখনো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিমের কমিটি দেওয়া হয়নি। তারা এখন নতুন দল ঘোষণা করছে। এটা বৈষম্য।

স্লোগান দিতে দিতে ওই শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সংবাদ সম্মেলনস্থলের কাছে যান। একপর্যায়ে রিফাত রশীদের নামে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তারা স্লোগান দেন ‘রিফাত রশিদের ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’।

এ সময় তাদের অনেকে অভিযোগ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাই সব ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব দেখায়। আমরা এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেব। তারা স্লোগান দেন, ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও’, ‘প্রহসনের কমিটি চলবে না’।  

পরে নতুন সংগঠনের সঙ্গে জড়িতরাও স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। তারা মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে, বাইরে সংবাদ সম্মেলনের স্থলে এবং ডাকসু ভবনের সামনে স্লোগান দেন। এ সময় তারা ‘বাকের ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘জাহিদ ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, স্লোগান দেন।  

পাল্টাপাল্টি এসব স্লোগানে সংবাদ সম্মেলন নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে যায়। পরে বিকেল ৫টা নাগাদ আবু বাকের মজুমদার, জাহিদ আহসান, তাহমীদ আল মোদ্দাসসীর চৌধুরীসহ নেতারা মধুর ক্যান্টিনে আসেন।  

মধুর ক্যান্টিনে সামনে সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও বাইরের ওই শিক্ষার্থীদের বাগড়ায় তা করতে পারেননি উদ্যোক্তারা। পরে মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নেন তারা।  
সেখানেও ঢুকে পড়েন বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা। এ সময় দুই পক্ষ কিছুক্ষণ পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে বাইরের ওই শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের সরিয়ে সামনে যেতে চাইলে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। মারধরের শিকারও হন কেউ কেউ।  

এই হাতাহাতি-মারামারির মধ্যেই সংগঠনের নাম, কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি ঘোষণা করেন নতুন আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার ও সদস্যসচিব জাহিদ আহসান। কমিটিতে আসার কথা না থাকলেও রিফাত রশীদকে কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব করা হয়।  

কমিটি ঘোষণা করে নেতারা মধুর ক্যান্টিন থেকে মলচত্বরের দিকে বেরিয়ে যান। এ সময় শুরুতে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-আইবিএর সামনে এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে দুইদফা মারামারির ঘটনা ঘটে।  

আহত সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ বলেন, মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে তারা আবু বাকের মজুমদারকে মারতে আসে। আমরা চেষ্টা করি তাদের থামাতে। এরমধ্যেই তারা ইচ্ছেমতো কিল-ঘুষি মারে। আইবিএর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমি বাকের ভাইয়ের পেছনের সারিতে ছিলাম। সেখানে তারা ‘ঢাবি ভুয়া’, ‘ঢাবি সিন্ডিকেট ভুয়া’, বলে স্লোগান দেয়। এরপর তারা হামলা করতে আসে। আমাকে ইচ্ছেমতো কিলঘুষি মেরেছে। এরপর মলচত্বরে পুনরায় হয়েছে।

তিনি বলেন, এখানে সবাই রিফাত রশীদকে পদায়নের জন্য এমন কাজ করেছে। এখানে ঢাকা মহানগর, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং কিছু টোকাই এসেছিল। কিছু শিক্ষার্থী আছেন যারা মহানগরের কিছু স্কুল-কলেজে পড়ে। রিফাত রশীদ সুপরিকল্পিতভাবে এই কাজ করেছেন। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে উসকে দিয়েছেন। দেখা গেছে, যারা পদ পাওয়ার যোগ্যও নন, তারা এখানে আসার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।

মারামারির বিষয়ে মিথুন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি বাধা দিতে গিয়ে একাধিকবার মারধরের শিকার হয়েছি। মধুর ক্যান্টিন ও মলচত্বরে থামাতে গিয়ে মার খেয়েছি। সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি থামাতে গিয়েছি।

মারামারির ঘটনা নিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগরের প্রতিনিধিত্ব রেখে আমাদের আহ্বায়ক কমিটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এখানে আমাদের ঘোষণার আগেই একটি পক্ষ সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা কারা, আমরা চিনি না।  

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করব। পাশাপাশি যারা হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।  

রিফাত রশীদের জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। কেউ যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকে, আমরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।  

আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক, জাহিদ আহসান সদস্যসচিব, রিফাত রশীদ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব, তাহমীদ আল মোদ্দাসসীর চৌধুরী মুখ্য সংগঠক ও আশরেফা খাতুন মুখপাত্রের দায়িত্ব পেয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে আব্দুল কাদের আহ্বায়ক, লিমন মাহমুদ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, মাহির আলম সদস্যসচিব, আল-আমিন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব, হাসিব আল ইসলাম মুখ্য সংগঠক ও রাফিয়া রেহনুমা হৃদি মুখপাত্র হিসেবে রয়েছেন।

বাংলাদেশ সময়: ২১৫৫ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৫
এফএইচ/আরএইচ
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।