ঢাকা, সোমবার, ১০ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তারার ফুল

নাচের পঞ্চকন্যার সঙ্গে এক বিকেল

বিনোদন ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫২৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৬, ২০১৬
নাচের পঞ্চকন্যার সঙ্গে এক বিকেল (বাঁ থেকে) সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা তাথৈ, লামিয়া সাইয়ারা মেলা, শাম্মী আক্তার, পারভীন সুলতানা কলি ও স্নাতা শাহরিন-ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলের সামনে সবুজ শাড়ি পরা এক তরুণী ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছেন। তার হাতে আয়না।

কাছে যেতেই চোখে পড়লো পাশেরজন তা দেখছেন। সাজছেন সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা তাথৈ, পাশে পারভীন সুলতানা কলি।

এ দু’জনের সাজগোজ দেখতে দেখতে এসে হাজির আরও তিনজন। তারা হলেন লামিয়া সাইয়ারা মেলা, শাম্মী আক্তার ও স্নাতা শাহরিন। সমবেত হতেই শুরু হলো তাদের হাসি-ঠাট্টা। সেলফি তোলায়ও মেতে উঠলেন সবাই। বাংলানিউজের আমন্ত্রণে আড্ডা দিতে একত্র হন এই পাঁচ নৃত্যশিল্পী।

গ্যেটে ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ‘ইয়াং কোরিওগ্রাফারস প্ল্যাটফর্ম ২০১৬’ শীর্ষক প্রকল্পের অংশ হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তিনটি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন সাত তরুণ নৃত্যশিল্পী। এই পাঁচজনও আছেন তাদের মধ্যে। অন্য দু’জন হলেন মো. ফরহাদ আহমেদ ও তাহনুন আহমেদী। তিন ভাগে পাঁচজনই তিন মাস কর্মশালা করেছেন। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও চলতি মাসে হয়েছে এগুলো। জার্মান কোরিওগ্রাফার টমাস বুনেগরের নিবিড় পরিচর্যায় নিজেদের নৃত্য পরিচালনায় নিজ নিজ সমসাময়িক নৃত্যকথা উপস্থাপন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তারা। এর সূত্র ধরেই এই আড্ডা।

পাঁচজনের মধ্যে স্নাতা অন্য চারজনের মুরব্বি! অন্য চারজনকে চেনেন তাদের ছোটবেলা থেকে। পাশ থেকে মেলা জানালেন, তিনি সবার কনিষ্ঠ। রসিকতা মিলিয়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘স্নাতা মিস আমাদের গুরুমা!’ একথা শুনে সবার সঙ্গে হাসলেন স্নাতাও। তিনি যোগ করলেন, ‘আমি ওদের প্রায় প্রত্যেককে নাচ শিখিয়েছি। তবে পাঁচজন একসঙ্গে ওভাবে অনুষ্ঠান করা হয়নি। ’

এবার মূল কথায় আসা যাক। শাম্মী জানালেন, গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকে সবাই দুই বছরের কোর্স করেছেন। কোর্স চলাকালীন জার্মান কোরিওগ্রাফার টমাস বুনেগর তাদের কাজ খুব পছন্দ করতেন। তরুণদের ভাবনা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন তিনি। গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকে অনুমোদনও মেলে। কিন্তু তিনজনকে নিয়ে কাজটা করতে বলা হয়। প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিলেন ২০ জন। তাদের মধ্য থেকে তিনজনকেই বেছে নেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আটজনের আইডিয়াই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তাই তাদের নিয়ে করা হয় ‘ইয়াং কোরিওগ্রাফারস প্ল্যাটফর্ম ২০১৬’। অবশ্য একজন ব্যক্তিগত কারণে অংশ নিতে না পারায় সাতজন কাজটা করেছেন। স্নাতা বললেন, ‘টমাস বুনেগর যদি না থাকতেন এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কাজ করাটা সত্যিই কষ্ট হয়ে যেতো আমাদের জন্য। তিনি সবসময় আমাদের সহযোগিতা করেছেন। ’

একই সুরে তাথৈ বললেন, ‘প্রস্তাবনার বেলায় আমাদের ভাবনাগুলো শুধু কাগজে লিখে জমা দিয়েছি। কিন্তু নাচের ক্ষেত্রে এসে ব্যাপারটাকে মনে হয়েছে একটু কষ্টই। টমাস বুনেগর আমাদেরকে আমাদের জায়গায় এসে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেজন্যই প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা ভাবনা মঞ্চে উঠে করতে পেরেছি। শরীরী ভাষার মাধ্যমেই আমরা দর্শককে বোঝাতে চেয়েছি কী ধরনের চরিত্র উপস্থাপন করছি। ’

নারীর জয়গান
অনুষ্ঠানে মেলার নাচের বিষয়বস্তু ছিলো ‘ইটস পারসোনাল’। আর একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে ও চোখে দেখতে পারা একটি মেয়ে একই সমস্যার সমস্যার সম্মুখীন হয়। একজন না দেখে যেমন কিছু বলতে পারে না, অন্যজন দেখেও তা বলতে পারে না। এটা ছিলো কলির নাচের বিষয়বস্তু। অন্যদিকে শাম্মীর নাচ ছিলো এরকম- একটা মেয়ে প্রথম থেকে তো আর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকে না। কিন্তু চারপাশের সবার প্রতিযোগিতা দেখে সে-ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাতে নেমে পড়ে।

শাম্মীর নাচে কোনো গান ছিলো না। তাই তার প্রশংসা করে নিজের থিমের কথাও বললেন স্নাতা। কর্মক্ষেত্রসহ ব্যক্তিজীবনে নারীদের যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তা-ই ছিলো তার থিম। এ ছাড়া একটি মেয়ের ছোট থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত সময়কে তুলে ধরেছেন তাথৈ।  

বোঝা যাচ্ছে, পাঁচ তরুণীর নৃত্যে ফুটিয়ে তোলা গল্পগুলোর সবই নারীকেন্দ্রিক। এ প্রসঙ্গে পারভীন সুলতানা কলি বলেন, ‘নারীরা চলতি পথে সমস্যায় পড়বে, আমরা নারীরাও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলতে পারেন। নারীরা তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে সচরাচর মুখ খোলে না। এভাবে প্রতিদিনের জীবনে না বলা কথা নিজের মধ্যে লুকিয়ে চলেন মেয়েরা। আমার নাচে সেই বার্তাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ’

স্নাতা বললেন, ‘আমাদের দেশে প্রায়ই নারী নির্যাতনের খবর শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় লক্ষ্য করি। তাই আমার নাচে নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হওয়ার ব্যাপারটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। ’

নৃত্যকথায় সাতজনই ছিলেন সাতজনের অনুপ্রেরণা। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের মনে হয়েছে বিষয়বস্তু আলাদা হলেও এর সাফল্যের ব্যাপারে সবাই আশাবাদী। এ প্রসঙ্গ টেনে কলি বললেন, ‘কারিগরি প্রদর্শনী দেখেই আমাদের প্রত্যেকের মনে হচ্ছিলো, বাংলাদেশে এমন অনুষ্ঠান আর কখনও হয়নি। সাত ধরনের মানুষ সাত ধরনের চিন্তাধারা। ’ তার কথার রেশ ধরে শাম্মী বলেন, ‘এখানকার রক্ষণশীল প্রেক্ষাপটে নৃত্যশিল্পীদের বেশভূষায় অতোটা মুক্তমনা হওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও আমরা কিন্তু এ অনুষ্ঠানে এদিক দিয়ে অনেক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছি। ’

প্রদর্শনীর পর সবাই অনেক বাহবা পেয়েছেন। এই আয়োজনে আবার কবে উপভোগ করা যাবে তা নিয়ে কৌতূহল দেখা গেছে অনেকের মধ্যে। স্নাতা বললেন, ‘আমার নাচ দেখে একজন জানিয়েছেন তার মনে হয়েছে, কোনো বাংলাদেশির নয়, তিনি নাকি বিদেশিনীর নাচ দেখেছেন! এ ছাড়া অনেকের চোখে জল দেখেছি। ’

প্রদর্শনী শেষে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসার পর তাথৈকে এক দর্শক তার নাচের অঙ্গভঙ্গির প্রশংসা করেন। ‘তিনি বললেন, ট্র্যাডিশনাল নাচের অঙ্গভঙ্গি ঠিক রেখেই কনটেম্পোরারির মজাটাও দিতে পেরেছি আমি। আমার উপস্থাপনাও ছিলো নিখুঁত। ’ শাম্মী বলেন, ‘আমাকে সবাই বলেছেন, সংগীত ছাড়াও যে নাচকে এতোটা ফুটিয়ে তোলা যায় তা অন্যরকম লেগেছে তাদের কাছে। ’

নিজেই নিজের কোরিওগ্রাফার
পাঁচ তরুণীর প্রত্যেকে নিজেরাই নিজেদের কোরিওগ্রাফার ছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। মেলা বললেন, ‘আমি তো ছোট, আমি এখনও নাচ শিখছি!’ বলেই অট্টহাসি দিয়ে মনোযোগ দিলেন সেলফি তোলায়। শাম্মী বললেন, ‘এবারই প্রথম নিজের জন্য একা একটি প্লাটফর্ম পেয়েছি। তবে নিজেকে এখনও কোরিওগ্রাফার মনে হয় না। কারণ এখনও শেখার অনেক বাকি। আমি এখনও শিখছি। এই প্রকল্পটি নাচ নিয়ে নিরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে আমাকে। আমি একধাপ এগিয়েছি। ভয়কে জয় করেছি। ’

শাম্মীর কথার সঙ্গে মিল রেখে তাথৈ বলেন, ‘অনেকেই বলছেন, আমরা কোরিওগ্রাফার হয়ে গেছি! কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা কোরিওগ্রাফার না হয়ে বরং সবাই কোরিওগ্রাফিটা শেখার চেষ্টা করছি। এ আয়োজনে যুক্ত হয়ে নাচের এডিটিং থেকে শুরু করে প্রোডাকশন এবং উপস্থাপনার বিষয়টিও আমরা শিখেছি টমাস বুনেগরের কাছ থেকে। ’

তাথৈর সঙ্গে একমত স্নাতা। তার কথায়, ‘আমরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে নাচগুলো করেছি। একটা আউটপুটও পেয়েছি। তার মানে এই নয় যে, আমরা কোরিওগ্রাফার হয়ে গেছি! বরং আমরা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছি, কোরিওগ্রাফি কীভাবে করতে হয়। এই ড্যান্স স্পিচের (নৃত্যকথা) মাধ্যমে আমরা সেই ধারণাটিই পেলাম। ’

নাচের জগতে
স্নাতা এখন যেমন নাচানাচি করেন, ছোটবেলা থেকেও নিজে নিজেই নাচানাচি করতেন। তাই বাবা ঠিক করলেন মেয়েকে নাচ শেখাবের। সেই থেকে নাচের সঙ্গেই আছেন স্নাতা। কলির নাচে আসার গল্পটা মজার। তার প্রিয় ঠান্ডা পানি ও আইসক্রিম। মা গান শেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন বাফায়। শিক্ষক পরামর্শ দিলেন ঠান্ডা পানি আর আইসক্রিম কখনও খাওয়া যাবে না। কিন্তু কলি তো এসব ছাড়তে পারবেন না! তাই তিনি বায়না ধরেন নাচ শিখবেন। মেয়ের বায়না মেটাতে বাবা-মা নাচের ক্লাসেই পাঠালেন।  

মেলা জানান, মা তাকে নাচ শেখাতে মুনমুন আহমেদের কাছে নিয়ে যান। পরবর্তীতে নৃত্যাঞ্চলে স্নাতা শাহরিনের কাছে নাচ শিখেছেন তিনি। তার শুরুটা হয়েছিলো কত্থক নৃত্য দিয়ে। পাশাপাশি ভরতনাট্যম এবং অন্যান্য সব নাচ শিখেছেন। তাথৈর নাচে আসাটা যেন অবধারিত ছিলো! মা শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। আর শাম্মীর নৃত্যচর্চায় আসা মায়ের ইচ্ছায়।

আগামীর কথা
নাচের পঞ্চকন্যা আবার একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। তাথৈ বলেন, ‘সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা তো আছেই। গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকেও বলেছে আমাদেরকে দিয়ে নতুন কোনো কাজ করানো হবে। এই প্রকল্পের সব কৃতিত্ব তাদের। আমাদের পক্ষ থেকে আহ্বান রইলো, ইনস্টিটিউটটি যেন দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের এই নাচের প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কারণ দেশের আনাচেকানাচে অনেক নৃত্যশিল্পী আছেন, নাচগুলো দেখলে তাদেরও কাজে আসতে পারে নতুন কিছু করার বেলায়। ’

বাংলাদেশ সময় : ১৫১৬ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৬, ২০১৬
টিএস/জেএম/জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa