ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫ রজব ১৪৪৪

ইসলাম

নবী করিম সা.-এর সংস্কারে পৃথিবী পরিণত হয় সোনালী সমাজে

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪৩১ ঘণ্টা, নভেম্বর ৩০, ২০১৭
নবী করিম সা.-এর সংস্কারে পৃথিবী পরিণত হয় সোনালী সমাজে নবী করিম সা.-এর সংস্কারে পৃথিবী পরিণত হয় সোনালী সমাজে

শান্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও ওফাতের স্মৃতি বিজড়িত রবিউল আউয়াল মাস। এ মাসের ১২ তারিখ তিনি জন্মগ্রহণ করেন, আবার তার মোবারক জীবনের অবসানও হয় ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে। তিনি আল্লাহতায়ালার প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল।

প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া নবুওয়তের সিলসিলা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে, পূর্ণতা পেয়েছে দ্বীন ইসলামও। পরিপূর্ণ হয়েছে আল্লাহতায়ালার হুকুম-আহকাম মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার দাওয়াতি মিশন।

এখন সে মিশনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মানুষের সামনে রয়েছে দু’টি উপকরণ। একটি আল্লাহর কিতাব কোরআন অন্যটি রাসূল (সা.)-এর হাদিস তথা সুন্নাহ। মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নাজাতের মাধ্যম হলো- কোরআন ও সুন্নাহ।  

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও তার শিক্ষার বদৌলতে বদলে যায় তৎকালীন পৃথিবীর নানাবিধ অনাচার ও কুপ্রথা। মানুষ সন্ধান পায় এক আল্লাহর। ফলে আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘুমন্ত হৃদয়গুলো জেগে উঠে ঈমানের উষ্ণতায়। তৎপর ও উদ্যমী মানবকূল দলে দলে বেরিয়ে পরে সিরাতুল মুস্তাকিমের অন্বেষণে।  

তার বিরান ও অনাবাদ হৃদয়গুলোকে আবাদ করলেন আল্লাহতায়ালার প্রেমের মশাল জ্বেলে। বইয়ে দিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফতের হাজারও সালসাবিল। নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনি ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদদীপ্ত এক প্রচণ্ড বিদ্রোহ ও আন্দোলন। নির্যাতিত, অবমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব এবং উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানবগোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে, যে বুকে স্থান হয় কেবল প্রেম-মায়া-মমতা-ভালোবাসা-ত্যাগ-সৌহার্দ্য ও কল্যাণের। তারা মানবতার কল্যাণে নিবেদিত।

মানবতার সেবায় নিবেদিত দল থেকে পৃথিবী কখনও বঞ্চিত হয়নি। এমন মানুষ অতীতে ছিল, বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের সংখ্যা নিরূপণ করা অসম্ভব। তাদের আলোচনা করতে হবে গুণ দিয়ে, সংখ্যা দিয়ে নয়।  

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যাবে, তাদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা ও নির্মল স্বভাব-চরিত্রের আলোকিত শত উদাহরণ। যা বদলে দিয়েছে পৃথিবীর অন্ধকারকে রাঙা প্রভাতের ঠিকানায়।

তারা সর্বদা আর্ত-মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাদের অন্তরাত্মা বিগলিত হত সমবেদনায় ও সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে যে কোনো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে কুন্ঠিত হতেন না। আর তাদের নেতৃবৃন্দ ও শাসকরা ছিলেন পূর্ণ দায়িত্বসচেতন ও আমানতদার। একদিকে রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতি রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক-শাসিতের মধ্যে কোথাও কোনো অমিল, বিরোধ বা দূরত্ব ছিল না। তাদের প্রার্থনা, দোয়া, ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্য, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, নম্রতা, ত্যাগ, সততা, সাধুতা, দয়া ও করুণা অনুকরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছিল। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলেই আস্থা-শ্রদ্ধা-বিশ্বাসের সঙ্গে তাদের উজ্জ্বল উপমাকে তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন।

মনে হতে পারে, তাদের ব্যক্তিগত সাফল্য ও চারিত্রিক উৎকর্ষতা বুঝি কবি-সাহিত্যিকের কল্পনামাত্র। সত্যি কথা বলতে কি, ইতিহাসের সে সব অবিচ্ছিন্ন সূত্র, স্বাক্ষ্য ও সনদ সংরক্ষিত না থাকলে এবং নির্ভরশীল-বিশ্বস্ত বিবরণ না পেলে অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী, মিথ ও উপকথা বলে চালিয়ে দেওয়া হত।  

সত্যি, এ মহান বৈপ্লবিক পরিবর্তন সমাজে ও মানুষের মননে সম্ভবপর করেছিলেন শান্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি সূচনা করেছিলেন এক গৌরবদীপ্ত মানবিক নতুন যুগের। আল্লাহতায়ালার অসীম রহমতে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নতুন যুগের আহ্বান স্থান-কাল-পাত্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডিকে অতিক্রম করে বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছিল।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন, ‘আমি তো তোমাকে জগতসমূহের জন্য কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। ’-সূরা আম্বিয়া: ১০৭

বস্তুত আল্লাহতায়ালার অপার রহমতের নিদর্শন নিয়ে আগমন ঘটে শান্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। তিনি সর্বযুগের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী এবং রাসূল। তিনি অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী। তিনি শুধু একজন ধর্ম প্রবর্তকই নন, মানব সমাজের জরাজীর্ণ ও ঘুণেধরা কাঠামোর সফল সংস্কার ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনকারী। গোটা বিশ্বে বর্তমানে বিরাজমান অশান্তি, নৈরাজ্য, হানাহানি, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার অবসানে শান্তির দূত নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রবর্তিত আদর্শ ও শিক্ষা প্রকৃতভাবে পালন ও গ্রহণই একমাত্র উপায়। মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি, কল্যাণ আর নাজাতও নিহিত রয়েছে নবী করিম (সা.)-এর সীরাত ও সুরতের মধ্যে, তার সুন্নাহর মাঝে।  

প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময় ও আগামী যুগ সম্পূর্ণরূপে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব, তার ব্যাপকভিত্তিক, সার্বজনীন ও চিরন্তন দাওয়াত, তার মানবতাবাদী কল্যাণকামী চেষ্টা-সাধনা-ত্যাগ-তিতিক্ষার কাছে ভীষণভাবে ঋণী। তিনি নাঙা তলোয়ারের নিচ থেকে বিপন্ন মানবতাকে উদ্ধার করেছেন। অতঃপর মানবতার হাতে তুলে দিয়েছেন এক নতুন উপহার। যা মানবতাকে দান করেছে এক নতুন জীবন, নতুন জীবনবোধ, নতুন উদ্যম, নতুন শক্তি, নতুন প্রতীতী, নতুন সম্মান এবং নতুন করে পথচলার পাথেয়। আর সেই উপহারের বদৌলতে মানবতা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতা-কৃষ্টি-জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-প্রযুক্তি সর্বোপরি ন্যায়নিষ্ঠা, আধ্যাত্মিকতা এবং চরিত্র ও সমাজ দর্শনের মাপকাঠিতে নতুন করে মানুষ গড়ার; সমাজ গড়ার কত হাজার মনজিল অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।  

শান্তির দূত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দিক-নির্দেশনা, সংশোধন ও সংস্কার প্রচেষ্টা, প্রণোদনা এবং প্রচেষ্টার সফল পরিসমাপ্তিতে পৃথিবী ভরে উঠেছিল সোনালী মানুষে। পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল স্বর্ণযুগ। আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে তার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করে বলেন, ‘আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে; যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ ও কিয়ামত দিবসের আশা রাখে এবং যারা আল্লাহকে অনেক স্মরণ করে। ’

আল্লাহতায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)কে রিসালতের সম্পদ দ্বারা ধন্য করেছেন। তাকে আপন মাহবুব বানিয়েছেন এবং উত্তম আদর্শ ও মনোনয়নে মনোনীত করেছেন। তিনি বিলাসী ও আরাম-আয়েশের জীবন কেবল নিজের জন্যই অপছন্দ করতেন না, বরং তার পরিবারের জন্যও এর পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মদের পরিবারবর্গের যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুকু রিজিক দিও। ’

হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আবু হুরায়রার জীবন। আল্লাহর নবী ও তার পরিবারবর্গ কখনও উপর্যুপরি তিন দিন গমের রুটি পেট ভরে খেতে পারেননি আর এ অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। ’

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কা বিজয় করেন এবং শেষ হজ আদায় করেন, তখন তার সামনে ছিল মুসলমানদের জনসমুদ্র, সমগ্র আরব ভূখণ্ড ছিল তার পদানত, অথচ তার নিজের অবস্থা ছিল একজন দরিদ্রের ন্যায়; তার গায়ে ছিল একটি মাত্র চাদর; যার মূল্য মাত্র চার দিরহামের বেশি ছিল না।  

উজ্জ্বলতম অনুসরণীয় আদর্শের মাধ্যমে শান্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্ব মানবতার মুক্তির জন্য এক অনন্য আলোকবর্তিকা। সকল ধরনের শোষণ-নিপীড়ন, জুলুম-অত্যাচার, অজ্ঞানতা-অন্ধকার বিরুদ্ধে জ্ঞান-শান্তি-আলোর অনিঃশেষ ঝর্ণাধারা তিনি। তিনি মানবতার মুক্তির মহান দূত, মহান শিক্ষক; বিশ্ব জাহানের জন্য রহমতস্বরূপ। তার মিশন, তার কথা, তার কর্ম- যা কোরআন- হাদিসের মাধ্যমে আমরা আজও অনুপ্রেরণার উৎসরূপে বুকে জড়িয়ে ধরে পেতে পারি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও মুক্তি। সমগ্র বিশ্বকে করতে পারি সকল অনাচার-হানাহানি থেকে মুক্ত এক শান্তির বাগান। তার প্রতি আমাদের অগণন দরুদ ও সালাম।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ইসলাম বিভাগে লেখা পাঠাতে মেইল করুন: [email protected]

বাংলাদেশ সময়: ২০৩০ ঘণ্টা, নভেম্বর ৩০, ২০১৭
এমপি/এমএইউ/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa