ঢাকা, শনিবার, ১৩ মাঘ ১৪২৯, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫ রজব ১৪৪৪

ইচ্ছেঘুড়ি

অদ্ভুত আধাআধি পুকুর ভাগ | শাহজাহান মোহাম্মদ

গল্প/ইচ্ছেঘুড়ি | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৪৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৮, ২০১৪
অদ্ভুত আধাআধি পুকুর ভাগ | শাহজাহান মোহাম্মদ

অনেক অনেক দিন আগের কথা। উত্তরবঙ্গে বাস করতেন এক রাজা।

তিনি এক কথার মানুষ ছিলেন। ধর্ম-বর্ণ ভুলে রাজ্য শাসন করাই ছিল তার একমাত্র কাজ। তবে রাজার কোনো ছেলে-মেয়ে ছিল না। তিনি প্রজাদের নিজের ছেলে-মেয়ের মতো দেখতেন। ওই রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে ধান আবাদ হতো।

রাজা মাঝে মধ্যে নিজের পরিচায় গোপন রেখে রাজ্যের এলাকায় এলাকায় ঘুরে গরিব কৃষকদের খোঁজ-খবর নিতেন। কারো কোনো সমস্যা হলে তিনি নিজেই তার সমাধান করতেন। এমনকি তার কোষাগার থেকে টাকা-পয়সা খাবার-দাবারও সরবরাহ করতেন। যেমন রাজা তেমন তার রানী। তিনিও রাজ্যের মানুষের অনেক উপকার করতেন। গরিব কারো কন্যার বিয়ে দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা- এসব বিষয়ে তিনি খোঁজ-খবর নিতেন।

প্রতি বছর নতুন ফসল তোলার পর ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব হতো। কবি গান, পুঁথি পাঠের আসর বসতো রাজ দরবারে। চলত প্রায় সাতদিন ধরে। এমনিভাবে চলতে থাকে রাজার রাজ্য শাসন। দিন যায়, মাস যায়, বছরও যায়। তবে রাজ্যে প্রায় সময় পানির সমস্যা দেখা দিতো। প্রকৃতির এ সমস্যার কারণে পানির সংকট তৈরি হতো। চাষাবাদের বড় সমস্যা হতো।

এমনি এক বছর কোনো পানি না হওয়ায় রাজ্যে নানান সংকট দেখা দিল। চাষিরা ফসল বুনতে পারছে না। মাটি ফেঁটে চৌঁচির হয়ে গেছে। গাছপালা সব কিছু যেন পানি পানি করে বুক ফাঁটিয়ে কাঁদছে। এমন সময় যদি ফসল না হয় তাহলে রাজ্যের মানুষ কেমন করে চলবে। কি খাবে?

এদিকে ফসল না হওয়ার কারণে রাজা তার রাজদরবার থেকে যত রকমের খাবার সরবরাহ করতে থাকে। কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে। খেতে খেতে তো এক সময় রাজার ভাণ্ডার খালি হয়ে যাবে। তাতে আরও মহাসংকট দেখা দেবে। রাজা রাজদরবারে জরুরি সভা ডাকলেন যে কি করা যায়? উজির, নাজির, পাইক, পেয়াদা, কৃষক ও দিন মজুর সবাইকে নিয়ে রাজা বসলেন। এর মধ্যে রানীকেও ডাকা হলো। সব জল্পনা-কল্পনার পর রাজা রানীর উপর ছেড়ে দিলেন কি করা যায়।

রানী অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, রাজ্যে একটি পুকুর খনন করা হোক, যেখান থেকে সবাই উপকৃত হতে পারবে। এ কথা শুনে রাজা রাজি হয়ে গেলেন। রাজা উজিরকে বললেন, রাজ্যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দিন। একটি পুকুর খনন করা হবে যা থেকে সবার উপকার হবে। চাষাবাদও হবে। পরের দিন থেকে শত শত লোক দিয়ে পুকুর খনন শুরু হয়ে গেল। এভাবে খনন করতে করতে একসময় দেখা গেল সেখানে কোনো পানি নেই।

একফোঁটা পানিও বের হচ্ছে না। এই দেখে রাজা মহা দুশচিন্তায় পড়েন। আর বলেন, পুকুর খনন বন্ধ করা যাবে না। কাজ চালিয়ে যান। এভাবে মাসের পর মাস চলতে থাকে কিন্তু পানির সন্ধান মেলে না। এমন সময় কোথা থেকে এক ফকির বাবা এসে হাজির হন। এরপর জিজ্ঞেস করে তোমরা এখানে শুধু শুধু পুকুর খনন করছো কেন? একজন বলে উঠে বাবা এই এলাকায় কয়েক মাস ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না, পানির অভাব। তাই আমরা কোনো উপায় না পেয়ে পুকুর খনন করে পানি আনার চেষ্টা করছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, আজ কয়েক মাস হয়ে গেল আমরা এই পুকুরে পানি পাচ্ছি না।

ফকির বাবা বলেন, থামো থামো একটু চিন্তা ও চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ থাকার পর বলে ওঠেন, পানি তোমরা পাবে তবে... একটি শর্ত আছে। কি শর্ত? বাবা বলেন, আমাকে এই পুকুরের আধাআধি অংশ দিতে হবে। যদি এই শর্তে রাজি হও তাহলে পানি আসবে। এই কথা শুনে সকলে চুপ হয়ে গেলো।

এরপর ফকির বাবাকে রাজ দরবারে নিয়ে আসা হলো রাজার সামনে। রাজা মশায় বলেন, এই ফকির বাবাকে ধরে এনেছো কেন? উজির বলেন, হুজুর উনি বলেছেন এই পুকুরে পানি আসবে তবে একটি শর্ত আছে? কি সেই শর্ত? বলুন, ফকির বাবা বলেন, আমাকে এই পুকুরের আধাআধি অংশ দিলে পানি আসবে। এই কথা শুনে রাজা বিচলিত হলেন! হতবাক হয়ে ফকির বাবাকে বলেন, আধাআধি কেন? পুকুর কি কখনো আধাআধি ভাগ করা যায়। আপনি অন্য কিছু নেন। বাবা বলেন না আমি এই পুকুরেই নেব। রাজা সব প্রজার কথা চিন্তা করে রাজি হয়ে গেলেন পুকুরের অর্ধেক অংশ দেয়ার জন্য।
রাজা মশায় বলেন, ফকির বাবা আপনি কোন দিক নেবেন।

ফকির বাবা বলেন, আমাকে পূর্বদিক দেবেন।

রাজা মশায় ফকির বাবার কথা মতো পুকুরের আধাআধি করে অর্ধেক অংশ দলিল করে দিয়ে দিলেন। আর উত্তর দক্ষিণ পাড়ে মাঝামাঝি দুটো সীমানা চিহ্ন দিয়ে দিলেন। পরের দিন সকাল বেলা গ্রামবাসী দেখেন পুকুরে পানি আর পানি। সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। গাছপালা, পশুপাখি সবাই মধুর সুরে গান গেয়ে ওঠে। আবার সবাই নতুন জীবন ফিরে পায়।

এরপর ফকির বাবা চলে যান। আর কোনো দিন তাকে এ এলাকায় দেখা যায় নি।

এখন পুকুরের পশ্চিম পাড়ে কবর স্থান করা হয়েছে। এলাকার সব মৃত ব্যক্তিকে কবর দেয়া হয়। পূর্বপাশে কোনো কবর দেয়া হয় না। তবে সেখানে গরু ছাগল ঘাস খেয়ে বেড়ায়। এদিকে পশ্চিম পাড়ে কবর দিতে দিতে কোথাও কোনো জায়গা নাই। এলাকার ইমাম সাহেব বলেন, পূর্ব পাড় তো ফাঁকা পড়ে আছে। সেখানেই না হয় কবর দেয়া হোক। এই ভেবে একজন মৃত ব্যক্তিকে পূর্ব পাড়ে কবর দেয়া হলো।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেই রাতে মসজিদের ইমাম সাহেবকে স্বপ্নে বলেন, আমার জায়গায় কেন কবর দিয়েছো তোমরা? এখান থেকে কবর সরিয়ে নেও। আমার জাগায় কেউ থাকবে না। পরের দিন ইমাম সাহেব এলাকার সবার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে। সবাই পুকুর পাড়ে ভীড় জমায়। পুকুর পাড় দেখতে আসে। আর ওই কবরটি সরিয়ে পশ্চিম পাড়ে নেয়া হয়। আজ অবধি পুকুরের পূর্ব পাড়ে কোনো কিছু লাগানো হয় নি। এখনো ফাঁকা পড়ে আছে পূর্ব পাড়। শুধু ঘাস আর ঘাস। তবে মনে মনে ভাবি-
এমন রাজা এমন রানী
হয় না কেন ভাই?
সেই যে গেলে ফকির বাবা
কোথায় খুঁজে পাই।

বাংলাদেশ সময়: ২১৩৬ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa