ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ মাঘ ১৪২৯, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮ রজব ১৪৪৪

ইচ্ছেঘুড়ি

রবির বন্দি শৈশব | মো. মনির হোসাইন

গল্প/ইচ্ছেঘুড়ি | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫১৭ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১২, ২০১৫
রবির বন্দি শৈশব | মো. মনির হোসাইন

রবি একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বাবা মায়ের আদরের একমাত্র সন্তান।

বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, স্কুল শেষে বাসায় ফেরা রবির প্রতিদিনের রুটিন।

বাসায় ফেরার পর বিকেলে ইংরেজি স্যার আসেন পড়াতে। স্যার চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আসেন অন্য আরেকজন স্যার। তিনি আরেকটি বিষয় পড়ান। প্রত্যেক শিক্ষক রবিকে সপ্তাহে তিন দিন করে পড়ান। এভাবে করে রবি বাসায় চারজন স্যারের কাছে পড়ে। প্রতিদিন দুজন করে স্যার আসেন। এতগুলো বইয়ের বোঝা কাঁধে চাপিয়ে স্কুলে আবার স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পর একটু বিশ্রামের সুযোগও পায় না রবি। আদরের সন্তান হলেও পড়াশুনার ব্যাপারে রবির প্রতি সমান কঠোর বাবা-মা দুজন। পড়াশুনার ব্যাপারে সে কখনো বাবা মায়ের কাছে ছাড় পায় না।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে বাবা মায়ের সাথে এক টেবিলে নাস্তা সেরে নেয় রবি। বাবা- মা অফিসে যাওয়ার সময় তাকে তার স্কুলের সামনে নামিয়ে দিয়ে যান। ছুটির পর একা একা বাসায় ফেরে রবি। বাবা-মা দুজনে বাসায় ফেরেন বিকেল চারটার পরে। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে প্রতিদিন দুজন স্যারের কাছে পড়ার পর রবি অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু বাবা- মা কেউ এ বিষয়ে পাত্তা দেন না। তারা ভাবেন রবি পড়াশুনায় ফাঁকি দেওয়ার জন্য ক্লান্তির মিছে অভিনয় করে।

বন্দিত্ব থেকে একটু মুক্তির জন্য সে যখন মাঝেমধ্যে  মায়ের কাছে মাঠে খেলার জন্য একটু অনুমতি চায়, মা তখন রুক্ষ গলায় তার আবেদন নাকচ করে দেন।

“এখন খেলাধুলা নয়, সামনে পরীক্ষা। যাও পড়তে বোসো”। এটাই যেন মায়ের নিয়মিত উত্তর। রবি বোঝে মায়ের কাছে খেলার অনুমতি চাইলে মা এই কথা বলবেন।

তারপরও মাঝেমধ্যে মাকে খেলার কথা বলে। সে ভাবে এতে মায়ের হয়তো মন গলবে কিংবা খেলার অনুমতি মিলবে। কিন্তু মায়ের কাছে এই অনুরোধ রবির কাছে এখন “অরণ্যে রোদন,” অর্থাৎ বৃথা অনুনয় বিনয়ের মত।

স্কুলে যাওয়া আসার সময় বাসার সামনের খেলার মাঠে ছেলেমেয়েরা যখন দল বেঁধে খেলাধুলা করে রবি তখন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে হয়তো খেলতে পারবে কিন্তু বাসায় ফিরে দেখবে কোনো এক স্যার অনেকক্ষণ ধরে রবির জন্য অপেক্ষা করছে। তখন বাবা মায়ের রুক্ষ গলার শাসন রবিকে অনেক পীড়া দেবে। এ কথা ভেবে রবি খেলতে যায় না।

রবির দাদা একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। দাদা বাসায় বেড়াতে এলে রবি আনন্দের সাথে তার কাছে ছুটে যায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে। কিন্ত এটাও তার বাবা মায়ের পছন্দ না। কারণ দাদা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুরু করলে একদম থামতে চান না। অনবরত গল্প করতেই থাকেন। এতে রবির পড়ার সময় নষ্ট হয়।

বাবা মায়ের প্রতি রবির সবচেয়ে অভিমান এই জায়গায়, রবি টিভিতে একটু কার্টুন দেখতে গেলেও বাবা মা দেখতে দেন না। এই বেলাতেও তাদের একই উত্তর, “পড়তে বোসো। সময়টা কাজে লাগাও”।

স্কুল, বাসা আর পড়ার টেবিলের ভেতরেই আটকে আছে রবির শৈশব। রবির এই শৈশব এতই কঠোর যে সপ্তাহের যে একদিন ছুটির সময় থাকে সেদিন রবি সূর্যটাও দেখতে পারে না। কারণ সেদিন রবির বাসার সব স্যার পরীক্ষা নেবেন।

এভাবে একমুখো জীবন রবির আর ভালো লাগে না। বন্দি এই জীবন রবিকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। রবি এখন এই বন্দি জীবন থেকে মুক্ত চায়। শৈশব কি জিনিস তা সে জানে না। জানবেও বা কি করে ?

হঠাৎ একদিন রবি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার অবস্থা দেখে মা দিশেহারা হয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। রবির বাবা তখন অফিসের জরুরি কাজে শহরের বাইরে। রবি হাসপাতালে ভর্তি। শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। মাঝেমধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। জ্ঞান ফিরে এলে বাবার খোঁজ করে। রবির বাবা খবর পেয়ে পরের দিন চলে আসেন।

হাসপাতালে পৌঁছে রবির বাবা পাগলের মতো দ্রুত চলে যান হাসপাতালের বড় ডাক্তারের কাছে। “আমার ছেলের কি হয়েছে, ডাক্তার? প্লিজ ডাক্তার আমাকে বলুন, প্লিজ। ” এভাবে ডাক্তারের কাছে অনুনয় করতে থাকেন রবির বাবা। রবির বাবাকে শান্ত হয়ে চেয়ারে বসতে বলে ডাক্তার বললেন, “আপনার সন্তানের তেমন মারাত্মক কিছু হয় নি। তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস”।
“আচ্ছা আপনার সন্তানের বয়স কত বলুন তো?” ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন।
“জি, ১৩ বছর হবে। ” রবির বাবা উত্তর দিলেন।
“রবি কোন ক্লাসে পড়ে?” ডাক্তার সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন।
“ক্লাস সেভেনে। ইংরেজি মাধ্যমে। ” রবির বাবা উত্তরে বললেন।
“আপনি কিছু মনে না করলে আমি আপনাকে দুটো কথা বলতে চাই। ” ডাক্তার বললেন। “নিশ্চয়ই” বলে সম্মতি জানালেন রবির বাবা।
“আপনি কি জানেন, আমরা আমাদের সন্তানের উপর খুব অল্প বয়সে পড়াশুনার অনেক বোঝা চাপিয়ে দেই। বলতে পারেন, কেন? কারণ আমরা সবাই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতে সফল, প্রতিপত্তিশালী, বিত্তবান ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাই। আর এই জন্যই খুবই অল্প বয়সে তার উপর পড়াশুনার বোঝা চাপিয়ে দেই। যার উপর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি সে এই বোঝার চাপ সহ্য করতে পারবে কিনা এটা আমরা ভাবি না। আমাদের শৈশবে আমরা কতই না দুরন্ত ছিলাম! কত খেলাধুলা করেছি, আনন্দ করেছি। অথচ এখনকার ছেলেমেয়েরা শৈশব কি এটাই জানে না !

শৈশবে শিশুর মধ্যে চাঞ্চল্য থাকবে, তারা অন্যমনস্ক থাকবে, তাদের মধ্যে দুষ্টুমি থাকবে, থাকবে দুরন্তপনাও। এই সব কিছুই শৈশবের অংশ। এগুলোর মধ্যে দিয়ে শিশু বেড়ে উঠবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের আরও কিছু দায়িত্বশীল শ্রেণির মানুষ শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি। সন্তানকে তার নিজের মতো করে চলতে দিন। ওকে বাইরের আলো- বাতাস দেখতে দিন। সবুজ মাঠে খেলতে দিন। সে যা করতে চায় তাই করতে দিন। তাহলেই দেখবেন সে একদিন কালজয়ী মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে। দীর্ঘদিন বন্ধ ঘরে থাকতে থাকতে রবি হাঁপিয়ে উঠেছে। তাছাড়া রবির অন্য কোনো সমস্যা নেই। আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি ওর সমস্যা এটাই।

ডাক্তারের কথাগুলো একনাগাড়ে শুনে রবির বাবা উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ডাক্তার সাহেব। আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি এখন আর রবিকে কড়া শাসনের মধ্যে রাখব না, কথা দিলাম। ”



বাংলাদেশ সময়: ১৫১৭ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১২, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa