ঢাকা, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ শাবান ১৪৪৫

ইচ্ছেঘুড়ি

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

নীলু আর বিলু ‍|এহসান হায়দার

গল্প/ইচ্ছেঘুড়ি | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬১৭ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫
নীলু আর বিলু ‍|এহসান হায়দার

প্রথম কিস্তি
নীলু আর বিলু দুই ভাই-বোন। গত ভোর রাত থেকে তারা হাঁটছে।

যাবে বারুইপুর, মানিকগঞ্জের একটি গ্রাম। এই গ্রামে ওদের নানাবাড়ি। কখনোই এভাবে যায় নি। এখন যেতে হচ্ছে। ওদের মতো অনেকেই যাচ্ছে এ পথে। কোথাও কোনো গাড়ি নেই।

বাবা-মায়ের সাথে আগে যখন নানাবাড়ি যেত, দেখত পথে পথে ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এখন তাও নেই। দলে দলে শত শত মানুষ ছুটছে এখন।   গত পরশু থেকে ঢাকায় গোলাগুলি আর আগুনের লেলিহান শিখা দেখেছে ওরা। বাবা- মা কেউ বেঁচে নেই। পরশু রাতে ওরা ঘরে ঢুকেই আলমারির চাবিটা নিয়ে বাবা-মাকে গুলি করেছে।  

নীলু আর বিলু ছিল অন্য ঘরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুমদাম করে ঘরের সব জিনিস তছনছ করে চলে গেছে। সেই থেকে নীলু বিলুর মুখে কোনো কথাই আসেনি,  বাবা মার শরীর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াত আর মা সামাজিক আন্দোলন করত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাসা ছিল। এই এলাকার কোনো বাসায় হয়তো কেউ বেঁচে নেই- এমন ভেবেছিল ওদের কোয়ার্টারের দারোয়ান করিম চাচা। তার পরিবারেরও কেউ নেই। বাসার সামনে রাস্তায় একটা বুড়ির চায়ের দোকান ছিল। তাও নেই। আগুন দিয়েছে ওরা। একতরফা আক্রমণ। কেউ কিছুই করে নি, তবু এভাবেই সবাইকে মারল। থেকে থেকে শহরে গুলি হচ্ছিল, আগুন জ্বলছিল, বেশি শব্দ আসছিল পিলখানার দিক থেকে।  

নীলু বিলুর চেয়ে বড়। এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। আর বিলু ক্লাস এইটে পড়ে। বিলু নীলুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপু আমরা এখন কী করবো?  আমাদের তো  কেউ বেঁচে নেই।   মা-বাবাকে শয়তানরা মারল কেন?  কী করেছে বাবা-মা?’

নীলু বলে- ‘তুই বুঝবি নে রে বিলু, ওরা সবাইকে মারতে চায়। কাউকে বাঁচতে দেবে না। এ দেশটা ওরা ওদের মতো করে গড়ে নিতে চায়, তাই বাঙালি মারার নিয়ম করেছে। দাঁড়া, তুই একটু কিছু খেয়ে নে।   কাল থেকে তোর পেটে কিছুই পড়েনি রে। ’

বিলু প্রতিবাদ করে বলল, ‘না আমি খাবো না। তুমি চলো নানাবাড়ি। আমার পা ব্যথা করছে। ’ 

নীলু ভাবে, তাই তো! বিলু তো এমন কখনও হাঁটেনি।  

একটু বসে বিশ্রাম নেয়া দরকার। কিন্তু কোথায় বিশ্রাম নেবে? শোনা যাচ্ছে মিলিটারিরা শহর ছেড়ে গ্রামের দিকেও আসতে শুরু করেছে। যত দ্রুত সম্ভব নানাবাড়ি পৌঁছানো দরকার। তাছাড়া রাজাকাররাও সব জায়গায় টহল দিচ্ছে। কোথায় কখন কি হয়ে যায় কে জানে! ওদের বিশ্বাস নেই। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নীলু ইয়াসমিনদের বাসায় ফোন করেছিল কী করবে তাই জানার জন্যে। ইয়াসমিনের বাবা পুলিশের ডিআইজি। ইয়াসমিন বলেছে ওর বাবা কোনো রকমে পালিয়ে এসেছে বাসায়। রাতেই ওরা শহর ছাড়তে চায়। বাসায় থাকলে ওদের বাঁচতে দেবে না। ইয়াসমিন নানাবাড়ি চলে যাওয়ার কথা বলেছিল। ও বলছিল বিশেষ করে মেয়েরা নিরাপদ না কোথাও। তাছাড়া পাকিস্তানদের দালালেরা মিলিটারিদের সবার বাড়িঘর চিনিয়ে দিচ্ছে। গণহত্যা শুরু হয়েছে সারাদেশে।

নীলু ইয়াসমিনের কথা শুনে ছোট ভাইকে নিয়ে দু-তিনটা কাপড়চোপড় ব্যাগে ভরে বেরিয়ে এসেছে। নিজেও কখনও এমন কষ্ট করেনি। কিন্তু বিলু তার বড্ড আদরের ভাই। একা একা কীভাবে থাকবে এই বাসার মধ্যে? করিম চাচা বাবা-মায়ের কবর দেবে। নানাবাড়ি গেলে মামারা আছে, নানা-নানি আছে। সমস্যা হবে না। কিন্তু পথ তো শেষ হচ্ছে না....

(চলবে..)

বাংলাদেশ সময়: ১৬১৪ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।