ঢাকা, সোমবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৭ মে ২০২৪, ১৮ জিলকদ ১৪৪৫

ইচ্ছেঘুড়ি

হাতিবৃষ্টি | আহমেদ রিয়াজ

ঈদগল্প/ইচ্ছেঘুড়ি | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫৫৬ ঘণ্টা, জুলাই ১৭, ২০১৫
হাতিবৃষ্টি | আহমেদ রিয়াজ

হাতির পিঠে চড়ে তো নবনিল অবাক! আহ্! কী আরাম।

হাতির পিঠে চড়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়।

একটুও আরাম নেই। শক্ত করে হাতির পিঠে বাঁধা দড়ি ধরে থাকতে হয়। তারপর আবার যে ভাবে হাতি চলে, মনে হয় এই বুঝি পিঠ থেকে পড়ে যাবো। যদিও হাতি চলে দুলকি চালে। তাতে কী! দুলকি চালে চলুক আর ফুলকি চালে চলুক। হাতির পিঠ থেকে নিচের দিকে তাকালেই গলা শুকিয়ে আসে। এত উঁচু থেকে পড়ে গেলে কী হবে? শরীরের কিছুই আস্ত থাকবে না।

বেশ কিছু দিন ধরে নবনিল জ্বালাচ্ছিল। হাতির পিঠে চড়ব, হাতির পিঠে চড়ব। কদিন পর বাবা ওকে নিয়ে গেলেন চিড়িয়াখানায়। নবনিল বলল, কই, আমাকে হাতির পিঠে ওঠাও?

বাবা বললেন, ওঠাবো।

ওঠাবো ওঠাবো বলে তো ওঠাচ্ছ না। ওঠাও?

নাহ্! হাতির যন্ত্রণায় অস্থির বাবা-মা-ভাইয়া সবাই। কিন্তু সেদিন পিঠে চড়ার মতো কোনো হাতি ছিল না। হাতির ঘরের আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসছিল ওরা। নবনিল জানতে চাইল, আজ আমরা হাতির পিঠে উঠব না?

বাবা মুখ কালো করে বললেন, না।

কেন?

আজ কোনো হাতি কাউকে পিঠে নিচ্ছে না।

কেন?

হাতির ইচ্ছে। প্রতিদিন মানুষজন পিঠে নিতে ভালো লাগে না হাতির।
কবে ভালো লাগবে?

আচ্ছা হাতিকে জিজ্ঞেস করে দেখি।

হাতির ঘরে একটা হাতি তখন খাচ্ছিল। নেচে নেচে। টুকরো টুকরো কলাগাছ হাতির সামনে। শুঁড় দিয়ে কিছু তুলে মুখে পুরছে। আর কিছু মাথার উপর ছিটাচ্ছে।

হাতির অমন খাওয়া দেখে নবনিল বলল, হাতিটা খুব দুষ্টু। কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাচ্ছে, দেখেছো?

তাই তো! বাবা বললেন, অমন দুষ্টু হাতির পিঠে আমরা চড়ব না।

কেন?

যদি আমাদের পিঠ থেকে ফেলে দেয়?

কিন্তু নবনিল অনড়, আমি চড়ব।

বাবা তখন হাতির কাছে গিয়ে জানতে চাইল, ওহে জনাব হাতি। কবে আপনি আবার মানুষজন পিঠে তুলবেন?

হাতিটা কী বুঝল কে জানে, একটা শব্দ করল। মনে হলো গুহার ভিতর থেকে কেউ কথা বলছে। বাবা বললেন, দেখেছ? হাতিটা বলছে ওর পিঠে উঠতে হলে পরে একদিন আসতে হবে।

নবনিল বলল, তুমি হাতির কথা বুঝতে পারো?

সবসময় পারি না। এখন পেরেছি।

আমরা আবার কবে আসব?

যেদিন হাতি ওর পিঠে উঠতে দেবে, সেদিন আসব।

সত্যি সত্যি এরপর যেদিন ওরা আবার চিড়িয়াখানায় গেল, সেদিন হাতির পিঠে চড়ল। আর বুঝল, হাতির পিঠে চড়া চাট্টিখানি কথা নয়। হাতির পিঠে উঠে এবার চেঁচাতে লাগল নবনিল, আমায় নামাও। আমায় নামাও।

কেন?

আমার ভয় করছে। কষ্ট হচ্ছে।

কী আর করা। মাহুত বেচারা অনেক কসরত করে হাতিটাকে আবার সিঁড়ির কাছে নিয়ে এলেন। তারপর নবনিলকে নামিয়ে দিলেন।

নিজে থেকেই হাতির পিঠ থেকে নামল নবনিল, তবু হাতির পিঠে চড়ার দুঃখ ওর গেল না। প্রতিদিনই নবনিল মনে করিয়ে দেয়, আমাকে তো হাতির পিঠে চড়ালে না তোমরা।

ভাইয়া বলল, তুমি নিজেই তো নেমে গেলে।

মা বললেন, তুমিই তো ভয় পেয়ে নেমে গেলে।

নবনিল বলল, ওই হাতির পিঠে একটু আরাম নেই। আরাম পিঠঅলা হাতির পিঠে চড়াও না কেন আমাকে?

বাবা এবার হাসতে হাসতে বললেন, আরাম পিঠের হাতি কোথায় পাবো?

নবনিল বলল, তাহলে ছোট কোনো হাতি।

হুঁ। এটা অবশ্য ঠিক কথা বলেছে। ছোট হাতি। ভাইয়া বলল, হাতি আবার ছোট হয় নাকি? সব হাতিই বড়।

বাবা বললেন, উঁহু। ছোট জাতের হাতিও আছে। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে বেশি পাওয়া যায়। তাই ওদের বোর্নিও পিগমি হাতি বলে। ছয় থেকে আট ফুট উঁচু একেকটা হাতি। কোনোদিন বোর্নিও দ্বীপে গেলে তোমাকে ওই হাতির পিঠে চড়াব।

আজই চলো।

পাগল নাকি! আজ কেমন করে যাবো। ওখানে যাওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। হাতির পিঠে চড়ার চেয়েও কঠিন।

কিন্তু নবনিল অতো শত বোঝে না। ওকে আজই নিয়ে যেতে হবে। আজই।

বলতে বলতে কাঁদতে লাগল নবনিল। কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল বারান্দায়।

বারান্দাটা ওর খুব প্রিয়। এখান থেকে কত কিছু দেখা যায়! আকাশ দেখা যায়।

আকাশে মেঘ দেখা যায়। নিচে তাকালে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তায় মানুষ দেখা যায়। দোকান দেখা যায়।

হঠাৎ নবনিল দেখল ওদের বারান্দায় একটা হাতি। এই টুকুন। ধবধবে সাদা।

সাদা মেঘের মতো। পেঁজা পেঁজা। মনে হয় তুলো দিয়ে বানানো। না, না তুলোর মতো মেঘ দিয়ে বানানো।

হাতি দেখে তো নবনিল অবাক। তা-ও ওদের বারান্দায়। চেঁচিয়ে ওঠল ও, কী সুন্দর হাতি! মা দেখে যাও, বাবা...

ও চেয়েছিল মা বাবা আর ভাইয়া, সবাইকে ডেকে দেখাবে। দ্যাখো কী সুন্দর হাতি। কিন্তু বাকিটুকু বলতে পারল না। হাতিটা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, চুপ।

বড়দের ডেকো না।

কেন?

আমি বড়দের দেখলে লুকিয়ে থাকি। ছোটদের সামনেই আসি।
কিন্তু আমিও তো বড়।

হাতিটা কী যেন ভাবল। তারপর বলল, তোমার মতো বড়দের কাছে আসি। কিন্তু ওদের মতো বড়দের ধারে কাছেও যাই না।

তুমি কি সত্যিই হাতি?

তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? এই দ্যাখোÑআমার দুটো কুলোর মতো কান। মোটা দড়ির মতো একটা শুঁড়। থামের মতো চারটে পা। টেনিস বলের মতো দুটো চোখ। একটা লেজও আছে।

বলেই লেজ নাড়াতে লাগল হাতিটা।

নবনিল বলল, আমি তোমার পিঠে উঠব।

হাতিটা বলল, অবশ্যই উঠবে। তোমায় পিঠে নেয়ার জন্যই তো আমি নেমে এলাম।
কোথায় থাকো তুমি?

মেঘের দেশে। আমি তো মেঘের হাতি। এবার ঝটপট আমার পিঠে চড়ে বসো তো। খানিকবাদে আবার কালো হয়ে যাবো। তখন আবার আমার পিঠে উঠতে চাইবে না।

নবনিল ঝটপট হাতির পিঠে চড়ে বসল। এই টুকুন হাতি। ওটার পিঠে উঠতে একটুও কষ্ট হয় নি। এই হাতির পিঠে বসতে কী আরাম! হাতিটা ওকে পিঠে নিয়ে পুরো বারান্দা ঘুরে বেড়াতে লাগল। একবার উপরে উঠে আবার নিচে নামে।

একবার এ মাথায় ছোটে, আবার ও মাথায়। হঠাৎ নবনিল দেখল হাতিটা কালো হয়ে যাচ্ছে। ধবধবে সাদা হাতি কালো হচ্ছে কেন?

নবনিল বলল, ঘটনা কী! তুমি কালো হয়ে যাচ্ছো কেন? বুঝেছি তোমাকে ধুতে হবে। ময়লা হয়ে গেছ।

হাতি বলল, উঁহু। আমি তো মেঘের হাতি। আকাশের দিকে তাকাও।

নবনিল তাকাল। হাতিটা বলল, কী দেখছ?

মেঘ।

কালো মেঘ, তাই না?

হুঁ।

খানিক আগেও সাদা মেঘ ছিল। তখন আমি ছিলাম সাদা। মেঘের মতো। এখন মেঘগুলো কালো হয়ে গেছে। আমিও কালো হয়ে গেছি। কেন বলো তো?
নবনিল বলল, বুঝেছি, তুমি তো মেঘের হাতি।

হাতি বলল, ঠিক। আকাশে যখন যে রঙের মেঘ থাকে, আমার গায়ের রঙটাও তখন ঠিক সেরকম হয়ে যায়। এবার আমার পিঠ থেকে নামো।

না। আরো কিছুক্ষণ চড়ব তোমার পিঠে।

উঁহু। এখন আর চড়তে পারবে না। একটু পর বৃষ্টি নামবে। কালো মেঘ থেকেই বৃষ্টি ঝরে। আমিও বৃষ্টি হবো। তুমি যদি এখন না নামো, তবে ভিজে যাবে।

ঝটপট মেঘের হাতির পিঠ থেকে নামল নবনিল। আর তখনই কোত্থেকে মা ছুটে এলেন। চেঁচাতে লাগলেন, এ কী নবনিল! তুমি বারান্দায়? বৃষ্টিতে ভিজছ? এখনকার বৃষ্টিতে ভিজতে নেই জানো না? অসুখ করবে তো। চলো চলো ঘরে চলো।

বলেই নবনিলকে ঘরের ভিতর টেনে নিয়ে গেলেন মা। আর আটকে দিলেন বারান্দার দরজা।

বৃষ্টিটা বেশিক্ষণ হয় নি। ঝমঝমিয়েও পড়ে নি। একটুখানি হয়েছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল নবনিল, রাস্তাটাও ঠিক মতো ভিজল না। খানিক পরে বারান্দায় গিয়ে তো ও অবাক। বারান্দায় থইথই পানি। নিশ্চয়ই ওই মেঘের হাতিটা বৃষ্টি হয়ে ওদের বারান্দায় ঝরেছিল। নইলে সামান্য বৃষ্টিতে এত পানি আসবে কোত্থেকে!

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৪ ঘণ্টা, জুলাই ১৭, ২০১৫
এএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।