ঢাকা, বুধবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৭ শাবান ১৪৪৫

ইচ্ছেঘুড়ি

ছোট্ট পরমাণুর প্রলয়ঙ্করী আঘাত

বিপাশা চক্রবর্তী । বিজ্ঞান লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯৩৮ ঘণ্টা, আগস্ট ৬, ২০১৫
ছোট্ট পরমাণুর প্রলয়ঙ্করী আঘাত

আজ থেকে দু’হাজার ছয়শ বছর আগের কথা। অর্থাৎ যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ছয়শ বছর আগে এ ভারতীয় উপমাদেশেরই একজন দার্শনিক ‘কণাদ’ প্রথম বলেছিলেন, ‘সব পদার্থই ক্ষুদ্র এবং অবিভাজ্য কণিকা দ্বারা তৈরি।



তারও ২০০ বছর পরে গ্রিক দেশে উত্তর এজিয়ান সাগরের তীরে ছোট এক শহর আবডেরায় বাস করতেন ওই সময়ে গ্রিক দেশের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তিনি এমনই এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, যা ছিল সে যুগের মানুষের মনে আসা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। আর সেটি হলো, এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কী দিয়ে তৈরি? তখনকার গ্রিক বিজ্ঞানীরা আঁতিপাতি করে খুঁজছিলেন এ প্রশ্নের উত্তর। ডেমোক্রিটাস তার গুরু লিউসিপাসের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমাদের জগতের সব বস্তুই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত। আর বাকি সব শূন্য বা খালি। এর মানে দাঁড়ায়, মানুষ, গাছপালা, জীব জন্তু, নদী, পাহাড়-পর্বত, ফুল, পাখি, পাথর, মাটি সবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত।  

ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন, যদি কোনো বস্তুকে ক্রমাগত বিভক্ত করা হয়, তাহলে সেটি বিভক্ত হতে হতে এক সময় এমন এক অবস্থায় গিয়ে পৌঁছবে যখন আর তাকে বিভক্ত বা খণ্ডিত করা যাবে না। বস্তুর এ ক্ষুদ্রতম অংশ বা অবস্থাকে গ্রিক বিজ্ঞানীরা নাম দেন ‘এটম’। বাংলায় যাকে আমরা পরমাণু বলি। গ্রিক ভাষায় এটমের মানে হচ্ছে, যাকে আর ভাঙা যায় না।

এরপর বহুকাল মানুষ আর এটম নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ১৮০৩ সালে লন্ডনে একজন রসায়নবিদ জন ডাল্টন আবার নতুন করে এটমের কথা বললেন। তিনি ধারণা দিলেন, এ এটম বা পরমাণু দ্বারাই যে কোনো বস্তুর অনু গঠিত হয়। অর্থাৎ অনুর ভেতর থাকে পরমাণু। আর এ পরমাণু দ্বারাই বিশ্বের যাবতীয় বস্তু গঠিত এবং পরমাণুর ধ্বংস নেই। সে পরিবর্তিত হয়, নয়তো নতুন করে গঠিত হয়।

তারপর একে একে পদার্থ বিজ্ঞানী স্যার জোসেফ জন থমসন, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, জেমস চ্যাডউইকসহ আরও অনেকে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের মতো পরমাণুর ক্ষুদ্রতম কণিকার খোঁজ পান। এবং এসব কণিকার ধনাত্মক বা ঋনাত্মক স্বভাব সম্পর্কেও ধারণা পেতে শুরু করেন।    

 ১৯১৩ সালে পদার্থ বিজ্ঞানী নিলস বোর তো একেবারে ছবি এঁকে মডেল তৈরি করে পরমাণুর ভেতরটা ব্যাখ্যা করেন। এ মডেলের মাধ্যমে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল, পরমাণুর ভেতরের নিউক্লিয়াস সম্পর্কে। যার ব্যাপারে আগেই বলেছিলেন  রাদারফোর্ড।

এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসীম শক্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে জানতে শুরু করলেন। এমনকি বিজ্ঞানীরা এটম বা পরমাণুকে ভাঙতে বা বিভক্ত করতে শুরু করলেন। এভাবে ১৯৩৯ সালে বেশ কয়েবজন বিজ্ঞানী ইউরেনিয়াম নামে একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরমাণুকে ভাঙতে সক্ষম হন। এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, এর থেকে প্রচণ্ড শক্তি বেরিয়ে আসছে। এরপর থেকেই চিন্তাভাবনা শুরু হয়, এ শক্তিকে কিভাবে সামরিক কাজে বা যুদ্ধে ব্যবহার করা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, প্রকৃতিতে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম পাওয়া তার অতি সামান্য অংশই কাজে লাগে। কাজে লাগার মতো এ অংশটুকুর বিজ্ঞানীরা নাম দিলেন ইউরেনিয়াম-২৩৫। এদিক দিয়ে প্রকৃতি আমাদের কিছুটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করে পারমানবিক বোমা বানানোর প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন জার্মানি বিজ্ঞানী অটো হ্যান। কিন্তু পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম যোগাড় করতে না পারায় কারিগরি জ্ঞান আর সামর্থ্য থাকার পরেও হিটলারের জার্মানি তখন এ মারণাস্ত্র বানাতে পারেনি। কিন্তু আমেরিকা কিন্তু ঠিকই বানিয়েছিল। আর সেই পারমানবিক বোমা বানানো বিজ্ঞানী দলটির নেতা ছিলেন পরমাণুবিদ রবার্ট ওপেনহাইমার।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই তাদের এ আবিষ্কারের প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পরে ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় এ বোমার প্রথম আঘাত হানা হয়। আর তার মাত্র তিনদিন পর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে দ্বিতীয় ও শেষ আঘাতটি করা হয় এ বিধ্বংসী অস্ত্রের। এতে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় গোটা পৃথিবী। বোমার আঘাতে সঙ্গে সঙ্গে নিহত ও আহত হয় কয়েক লাখ মানুষ। আর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে মারা যায় আরও কয়েক লাখ। এ বোমা মারার পর জাপান আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেনি। আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই জাপানকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতে নেয় আমেরিকা।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায় হিরোশিমা দিবস। এমন দিবসে ভাবছি, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে পারমানবিক বোমার মজুদ বাড়ছে, তাতে যদি কোনোভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যায়, তাহলে কী হবে কল্পনা করতেও ভয় হয়।

শেষ করছি মহামতি আইনস্টাইনের অনুতপ্ত হবার কাহিনী দিয়ে। আমেরিকার পরমাণু বোমা তৈরির পিছনে পরোক্ষ একটি ভূমিকা পালন করেছিলেন এ বিজ্ঞানী। তিনিই প্রথম পারমানবিক বোমা তৈরির প্রকল্প হাতে নেওয়ার জন্য আমেরিকার তখনকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টকে চিঠি দেন। কারণ আইনস্টাইন আশঙ্কা করেছিলেন আমেরিকার আগেই যদি জার্মানরা পারমানবিক বোমা বানিয়ে ফেলে তাহলে হিটলার সারা পৃথিবী তছনছ করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। শেষ বয়সে আইনস্টাইন স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি যদি জানতেন, জার্মানি পারমানবিক বোমা বানাতে সক্ষম হবে না, তাহলে কখনই রুজভেল্টের কাছে চিঠি লিখতেন না।

আসলে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনের নিয়ন্ত্রক হয় রাষ্ট্রযন্ত্র। অর্থাৎ যারা দেশ চালায় তাদের হাতে থাকে আসল ক্ষমতা। তাই আগামীর পৃথিবী নিরাপদ রাখার স্বার্থে বিশ্ব নেতৃত্বেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে কিভাবে ব্যবহার করবো আমরা।     

বাংলাদেশ সময়: ০৯৩৫ ঘণ্টা, আগস্ট ৬, ২০১৫
আরএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।