ঢাকা, রবিবার, ১ কার্তিক ১৪২৮, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মালয়েশিয়া

সহি আমলনামা-৪

শুধুই কাজ করে গেলেন, মজুরি পেলেন না...

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৫৫৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭
শুধুই কাজ করে গেলেন, মজুরি পেলেন না... কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রবাসী শামসুর রহমান/ছবি: বাংলানিউজ

কুয়ালালামপুর থেকে: আর দশ জনের মতো শামসুর রহমান মালয়েশিয়া এসেছিলেন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। ভিটে-মাটি বন্ধক রেখে পাড়ি দিয়েছেন ভাগ্যদেবির খোঁজে। কিন্তু বিদেশে মাটিতে এসে বারবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামের বাসিন্দা শামসুর রহমান। তাও আবার নিজ গ্রামের মকসুদুল হকের কাছে।

শামসুরের দেনার টাকা শোধ না হলেও মকসুদুল এখন জমিজমা কিনে ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে কোটিপতি হয়ে গেছেন। অন্যদিকে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন শামসুর রহমান।



২০০৭ সালে ভাগ্য গড়তে এসেছিলেন মালয়েশিয়া। যখন মালয়েশিয়া আসেন তখন ভাবনা ছিল, চার-পাঁচ বছর থেকে কিছু পয়সা কামিয়ে দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু এগারো বছর হতে চলল, যে টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া এসেছেন সেই টাকাই তুলতে পারেন নি।

মালয়েশিয়া আসতে তার খরচ হয় দু’লাখ টাকা। সেই টাকা যোগান দিতে ৬ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন ৭০ হাজার টাকা, দেড় বিঘা জমি বন্ধক রেখেছিলেন ১ লাখ টাকা, আর গরু বিক্রি করেছিলেন ৫৫ হাজার টাকায়।

এসেই বার বার প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি। দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, আর মজুরি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশি কয়েকজন প্রতারক। যাদের উপর বিশ্বাস করে তিনি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছে, তারাই তাকে ঠকিয়েছে। সব মিলিয়ে সাড়ে ২৬ হাজার রিঙ্গিত (৪লাখ ৭৭ হাজার টাকা) লুটে খেয়েছে ওই প্রতারকরা।

যে কারণে বন্ধকী জমিটি এখনও পুরোপুরি ফেরত নিতে পারেন নি। মাত্র চার-পাঁচ বছর থাকার ইচ্ছা নিয়ে মালয়েশিয়া এলেও এখন ঠিক কবে নাগাদ দেশে ফিরতে পারবেন সেই ক্ষণ ঠিক করতে পারছেন না।

মালয়েশিয়া এসে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস বেকার ছিলেন। এরপর জহুরবারুতে শিপ তৈরির কাজে যোগ দেন দেশি ভাই সাইফুল (যশোরের বাঘারপাড়া থানার তালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা) ইসলামের অধীনে। সাড়ে তিন মাস কাজ করার পর একদিন রাতে তিনিসহ প্রায় দু’শ বাংলাদেশিকে নিয়ে পুড়ুতে চলে আসেন।

কথা ছিল পুডুতে এসে সাড়ে তিন মাসের মজুরি দিয়ে দিবেন। কিন্তু এসে বাস থেকে নামিয়ে কাউকেই টাকা না দিয়ে চলে যান। শামসুর রহমানের পকেট তখন পুরোপুরি ফাঁকা। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের থেকে দশ রিঙ্গিত ধার করে সিগানপুর চলে যান।

এখানে দ্রুতই কাজ পেয়ে যান তার নিজ গ্রামের মকসুদুল ইসলামের মাধ্যমে। ভেবেছিলেন এবার নিজের গ্রামের লোক পেয়েছি, আর টাকা মাইর যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এখানেও তাকে হতাশ হতে হলো। বিশ দিন কাজ করার পর তার টাকা তুলে নিয়ে শূন্যহাতে বিদায় করে দেওয়া হয়। তাকে বলেছিলেন বস দিলে দিয়াম। এখনও বিল পাইনি।

এরপর চলে যান ওয়াটেল কোম্পানিতে। এবার তার ভাগ্য কিছুটা সহায় হয়। দেড় বছর কাজ করে পুরো টাকা হাতে পান। তারপর দেশে কিছুটা টাকা পাঠাতে সক্ষম হন।

এরপর যোগদেন একটি চীনা কোম্পানির ভবন নির্মাণ কাজে। এখানে সাড়ে ছয় মাস কাজ করেন। কিন্তু মজুরি পান মাত্র সাড়ে তিন মাসের। বাকি টাকা মেরে দেয় ঠিকাদার। এরপর আবার স্বদেশি মকসুদুলের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হন এই প্রবাসী।

এবার মকসুদুল তাকে বলেন, কাজে যোগদাও কোনো সমস্যা হবে না। আগের টাকাসহ দিয়ে দেব। তাকে কাজ দেওয়া হয় ভবন ভাঙ্গার আবর্জনা পরিষ্কার করতে। কাজ করেন দুই মাস বেতন দেওয়া হয় মাত্র এক মাসের।

এ অবস্থায় তাকে টিএমবি প্রজেক্টে সরিয়ে নেন মকসুদুল। এ প্রজেক্টে কাজ করেন দেড় মাস। বেতন না দিয়ে বিআরসিসি প্রজেক্টে কাজ দেন। এখানে কাজ করেন ৫ মাস। এখানেও তার সাড়ে ৫ হাজার রিঙ্গিতসহ অনেকের টাকা মেরে গাঁ-ঢাকা দেন স্বদেশি ‘টাউট’ মকসুদুল।

এরপর ভারতীয় একটি কোম্পানিতে এক বছর কাজ করেন শামসুর রহমান। এখানে এক মাসের টাকা খোয়া যায়। গত ছয় মাস ধরে বুকিত বিনতানের সিআরসিসি প্রজেক্টে কাজ করছেন।

জন্মের সাত বছরের মাথায় এতিম হওয়া শামসুর রহমান তার বন্ধকী জমিটুকুও ফেরত নিতে পারেন নি। আরও চল্লিশ হাজার টাকা পাবেন বন্ধকদার। এখন স্বপ্ন দেখেন ঘুরে দাঁড়াবার। তাই কখনও কখনও দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করেন।

সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত করেন রোস্টার ডিউটি, এরপর রাত ৮টা পর্যন্ত করেন ওভার ডিউটি। এরপর চুক্তি নিয়ে সকাল ৭টা পর্যন্ত কাজ করে অট্টালিকা গড়েন। এভাবে নব্বই ঘণ্টা কাজ করেছেন গত সপ্তাহে। কিন্তু নিজের ঘরটিও তার এখনও অধরা।

এখন আর বেশি বড় স্বপ্ন দেখতেও ভয় পান। শুধু গ্রামে বাড়ি করার টাকা জোটাতে পারলেই দেশে ফিরে যাবেন বলে জানান তিনি। এখন নাকি আর শরীর চলে না, মাঝে মাঝে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। কাজ করেন এলুমিনিয়াম পাইপ বসানোর। দুপুর বেলা তপ্ত রোদে কখনও কখনও হাত ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।

ঠিক কত টাকা দেশে পাঠাতে পেরেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, একটা লোকের সাড়ে ২৬ হাজার টাকা মারা গেলে আর কি থাহে? বাড়ির খরচে দিয়ে লাখ খানেক টাকা দিতে পারিচি।

থাকেন যেখানে সে কথা বলাই বাহুল্য। তার ঘরে ছারপোকা, নাকি ছারপোকার ঘরে তিনি থাকেন এটাই এখন বড় প্রশ্ন। ওষুধ দিয়েও ঘুমাতে যান। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয় না। পুরো শরীর জুড়ে ছাপ্পর মেরে দিয়েছে ছারপোকা।

বাংলাদেশ সময়: ১১৪৭ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭
এসআই/এসএইচ
**মালয়ে সংকল্প, কক্সবাজারে না
**প্রবাসীদের সহি আমলনামা-৩
**প্রবাসীদের সহি আমলনামা-২
** মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের সহি আমলনামা
** বুকিত বিনতানের সম্প্রীতি
** মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের আস্থা ‘লাকম ইনন’
** বাংলানিউজের সিরাজ এখন মালয়েশিয়ায়

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa