ময়মনসিংহ: কোনো পণ্য বিক্রি হচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু ক্রেতা বা বিক্রেতার ন্যূনতম অভাব নেই।
এ ঈদে তাদের কদর আকাশচুম্বী! ঈদের নামাজ শেষে কসাই ‘কিনতে’ ভিড় করছেন কোরবানিদাতারা।
দরদাম ফুরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গরুর মাংস বানানো এবং চামড়া ছাড়ানোর কাজে। অবশ্য তাদের বেশিরভাগই দিনমজুর, রাজমিস্ত্রী, ভ্যান চালক কিংবা কামলা।
কেউ এ কাজে পেশাদার নন তারা, প্রতিবছরই ঈদুল আজহার দিন বাড়তি আয়ের আশায় ময়মনসিংহে পাড়ি জমান।
অনন্ত একদিনের জন্য কসাইয়ের খাতায় নাম লেখান তারা। এ কারণে অনেকেই বলেন মৌসুমী কসাই, কেউ আবার বলেন ‘নয়া কসাই’।
ময়মনসিংহ শহরের সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টার দিকে দেখা যায়, রেলক্রসিং এলাকার দু’পাশে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে, জটলা পাঁকিয়ে গালগপ্প করছেন একসঙ্গে অনেক লোক। কারো মাথায় গামছা বাঁধা, সঙ্গে চটের বা প্লাস্টিকের ব্যাগ। রয়েছে দা, ছুরি, চাকু, কোবা, খাইট্যাসহ কোরবানির গরু বানানোর সরঞ্জাম।
গরিব খেটে খাওয়া এসব মানুষ ঈদের দিনও বসে থাকেন না। উল্টো এ দিনটি তাদের জন্য চরম ব্যস্ততার একদিন।
![Koshai_mymensingh_2 Koshai_mymensingh_2](files/September2015/September25/Koshai_mymensingh_2_113034434.jpg)
নিজেদের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় খুশির এ দিনটাতেও শ্রম বিনিয়োগ করে ক্রেতার কোরবানির গরু বানিয়ে চুক্তিভিত্তিক পারিশ্রমিকের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্য নিয়ে যান মাংসও।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে দলবেঁধে আসা এসব মৌসুমী কসাই শুক্রবার সকাল থেকেই শহরের সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় জড়ো হন। শহরের পাড়া-মহল্লায় নগদ নগদ অর্ডার নিয়েই কাজে লেগে যান তারা।
পথ চলতে গিয়ে এখানে আলাপ হয় সদর উপজেলার দাপুনিয়া গোস্টা এলাকা থেকে আসা মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। জানতে চাইলে এই চালশে একনাগাড়ে বলে গেলেন, ‘গরু জবাই করবার লাইগ্যা এইহানে বইসা আছি। কাস্টমার আইলেই দরদাম ফুরাইয়া চইল্ল্যা যামু। আমরা গরুর মাংস বানাইয়া ও চামড়া ছাড়াইয়া ফিটফাট কইরা দেই। ’
জানালেন, বছরে মাত্র একবার এ কাজ করেন মোফাজ্জল। তার সঙ্গে আছেন আরও চার সহযোগী। পাঁচজন মিলে তাদের এই কসাই টিম! একটি কোরবানির গরু বানাতে ৪ হাজার টাকা হাঁকলেন এক ক্রেতার কাছে।
বনিবনা হওয়ায় কোরবানিদাতার ডাকে যখন মোফাজ্জল সাড়া দিয়ে পথ চলতে শুরু করলেন তখন সঙ্গী আরেক ‘নয়া কসাই‘ আবুল কাশেম ইশারায় থামলেন।
চটজলদি বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। নিজেগর কোরবানি দিবার তো আর সামর্থ্য নাই। তাই মাইনষের গরু বানাইয়া টেহা পামু আর মাংসও বাড়িত লইয়্যা যামু। ’
সদর উপজেলার চর কালীবাড়ি গ্রাম থেকে আসা ফজল হক (৪৫) রেলক্রসিংয়ের ওপারে তার দলবল নিয়ে জটলা পাঁকিয়ে বসে আছেন।
একটি গরু বানাতে কেমন দাম নেন, জানতে চাইলে উত্তর দেন, ‘ছোট গরুতে প্রতি হাজারে একশ’ টাকা আর বড় গরুতে দুইশ’ টাকা নেই। এজন্য সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। ’
![Koshai_mymensingh_1 Koshai_mymensingh_1](files/September2015/September25/Koshai_mymensingh_1_315694338.jpg)
‘চুক্তি বা হাজারে টেহা দিলেও মাংস আমাগো দিতেই অইবো,’ পাশ থেকে বললেন শহরের কাঁচারিঘাট এলাকার হাবিবুর।
বললেন, ‘আমরা হারা বছর মজুরের কাম (কাজ) করি। ঈদের দিনেও কাম কইরা ভাত খাই। ’
‘মাংস ও চামড়া ছাড়ানোর কাজ শেষে জনপ্রতি গড়ে ৭শ’ টাকা মজুরি পামু। এই টেহা নিয়া বউয়ের হাতে তুইল্লা দিমু,’ বলছিলেন মৌসুমী কসাই হাবিবুর।
অবশ্য পেশাদার কসাইদের অভিযোগ, মৌসুমী কসাই দিয়ে মাংস কাটা এবং চামড়া ছাড়ানোর ফলে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তারা কম টাকায় শ্রম বিকোয়। ফলে অনেক কোরবানিদাতাই চামড়ার ঠিক দাম পান না।
তবে এমন অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই মৌসুমী কসাই শফি ও সোহাগ বললেন, ‘গরুর চামড়া নষ্ট হইলে আমরা পয়সা নিতাম না। ৫ থেকে ৬ বছর ধইরা ঈদে এ কাম করতাছি। আসল কসাইগর ব্যবসা নষ্ট হইতাছে। এইল্লেগ্যা হেরা আমগর বদনাম করে। ’
বাংলাদেশ সময়: ১৩২৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৫
এমএ/