ঢাকা, বুধবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩১, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ২৬ শাবান ১৪৪৬

জাতীয়

অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনি

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১১৮ ঘণ্টা, মে ৭, ২০১৭
অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনি অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনি-ছবি: বাংলানিউজ

কিশোরগঞ্জ থেকে: অনন্যা পরিবহনের বাসটি যখন কিশোরগঞ্জ শহরের বাস টার্মিনালে এসে পৌঁছালো তখন রাত প্রায় ১০টা ছুঁই ছুঁই। একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় চাপলাম চালকের ডানপাশে বসে। গন্তব্য শহরের প্রাণকেন্দ্র কালিবাড়ি মোড়। পাশে বসা বছর পঞ্চাশের অটো চালক আমির হোসেন।

আগন্তুক শহরে নতুন-কিভাবে যেন বুঝে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার শওরে নতুন নি’।

ব্যস, আলাপ করার সুযোগটা আর ছাড়লাম না।

পরনে চেকশার্ট, মুখে একগাল দাড়ি, অটো চালক আমির হোসেনের রোদে পোড়া কালো মুখ। উজান থেকে নেমে আসা অকাল ঢল ছোবল দিয়েছে তাকেও। দৈনিক ৫শ’ টাকা জমা দেয়ার পর রাতে বাড়িতে নিতে পারেন তিনশ’ বা চারশ’ টাকা। কপাল ভালো হলে বড় জোর ৫শ’। তার এই আয়ে ভরণ-পোষণ হয় ছয়টি খানেয়ালা মুখের। ছেলে-মেয়েরা কেউ প্রাথমিকের, কেউবা হাইস্কুলের গণ্ডিতে।

শহরের পাশেই পুলিশ লাইনের পেছনের গ্রামে তার বাড়ি। পাশেই হাওরের শাখা ‘বাক্সর বিল’। এ বিলে এবার দুই বিঘার একটু বেশি জমিতে বিআর-২৯ জাতের ধান বুনেছিলেন তিনি। সাধারণত এই ধানেই তার পরিবারের বছরের ভাতের খোরাকিটা হয়ে যায়। কিন্তু বিধিবাম! অকাল ঢলে তলিয়ে গেছে তার খোরাকির ধান। এক মুঠ ধানও নাকি এবার ঘরে উঠবে না তার।

চিন্তিত আমির হোসেনের বক্তব্য, এবার বছর পার করবাম যে কেমনে স্যার?অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনিসবে বৈশাখ চলছে। পরবর্তী মৌসুমের ধান কাটা হতে হতে সেই অঘ্রান। মাঝে সাতটি মাস। নতুন ধান না ওঠা পর্যন্ত এই সাত মাস চাল কিনতেই নাভিশ্বাস উঠবে এবার এ অঞ্চলের মানুষের এমনটাই জানালেন আমির হোসেন। আয় ইনকামও নাকি কিছুটা কমে গেছে তার। দুর্দিনের শঙ্কায় মানুষ টাকা খরচ করছে হিসেবে করে।

তাকে সমর্থন জানালেন চালকের বামপাশের সিটে বসা যাত্রী বাদশা মিয়া। জানা গেল, বাদশা মিয়ার ক্ষতিটা আরও ভয়াবহ।

হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চল অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুরে বাড়ি রোদে পোড়া কুচকুচে কালো ছোটখাটো মানুষটির। চোয়ালগুলো ভাঙা চোখের নিচে কালি। দুই চোখে যেন রাজ্যের দুশ্চিন্তা।

বাদশা মিয়া জানালেন, এবারের ঢলে তলিয়ে গেছে তার প্রায় ২০ বিঘা জমির ফসল। সেখান থেকে ধান পাওয়ার আর কোনো আশা নেই। আমির হোসেনের তাও বিকল্প পেশা আছে। কিন্তু কৃষি কাজ ছাড়া আর কিছু জানেন না বাদশা মিয়া। ফসল হারিয়ে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। হাওরে যেতে পারি শুনে নেমন্তন্ন করলেন আব্দুল্লাহপুরে তার বাড়িতে যাওয়ার। বললেন, ‘গ্যালে নিজের চক্ষেই দ্যাখতে পারবাইন, আমাগোর কি সর্বনাশ হইছে’।
অকাল ঢলে ভাটির দেশে ‘অশনি সঙ্কেত’ এর পদধ্বনিসন্ধ্যার আগে আগে চেপে বসেছিলাম অনন্যা পরিবহনের বাসটিতে। পুরো বাসে যাত্রী আমিসহ সাকুল্যে নয়-দশজন।  

গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে কিছুদূর গেলেই রাজেন্দ্রপুর। এই রাজেন্দ্রপুর থেকে একটি রাস্তা মহাসড়ক থেকে নেমে চলে গেছে কাপাসিয়া হয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে। ভৈরব হয়ে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের আরও একটি সড়ক থাকলেও, মহাখালী থেকে ছাড়া বাসগুলোর রুট মূলত এটিই।

রাজেন্দ্রপুর থেকে কাপাসিয়া হয়ে কিশোরগঞ্জের প্রায় পুরোটা রাস্তাই খুবই সরু। দু’টি গাড়ি একে অপরকে পাশ কাটাতে গেলেও যেন গায়ের সঙ্গে গা লেগে যায়।

পুরোটা পথে বিপরীত দিক থেকে কিশোরগঞ্জ থেকে অন্যান্য পরিবহনের অনেকগুলো বাসকেই আসতে দেখা গেল ঢাকার দিকে। তাদের প্রায় সবগুলো বাসেরই যাত্রী আসনগুলো পূর্ণ। অথচ আমার বাসের প্রায় সব সিটই ফাঁকা। বিষয়টি চোখ এড়ালো না। বাসের হেলপারকে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, ঢাকা থেকে যাওয়ার মানুষ কম, এখন আসার মানুষ বেশি। বেশির ভাগ মানুষই ভাটি এলাকার। কাজের সন্ধানে ঢাকার দিকে যাচ্ছেন। ঢাকা থেকে ফাঁকাই আসতে হলেও কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার দিকে যাত্রায় পুষিয়ে যায় তাদের খরচ।

ইঙ্গিত পরিষ্কার, ঢলে ফসল হারিয়ে মানুষ এখন দিশেহারা। গোলায় ধান ওঠাতে পারেনি হাওরের মানুষ। একেবারে ভূমিহীনরাও, ফসলের মৌসুমে চাষিদের কাজে হাত লাগিয়ে বছর আধ বছরের খোরাকিটা তুলে নিতে পারেন। কিন্তু এবার আর এই সুযোগ নেই। মৌসুমের প্রথম দিন থেকেই চাল কিনে খেতে হবে তাদের। অপরদিকে হাওর এলাকায় বিকল্প জীবিকাও নেই। তাই দলে দলে রাজধানীর দিকে ছুটছেন তারা।

সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জের মাটিতে পা দিয়েই বুঝতে পারা গেল এবারের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। মনে পড়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবির সেই আকালের কথা। সত্যিই যেন এবার অশনি সংকেতেরই শঙ্কা হাওর এলাকার মানুষের।

বাংলাদেশ সময়: ০৩১৩ ঘণ্টা, মে ০৮, ২০১৭
আরআই/আরবি/ 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।