ঢাকা, শনিবার, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি: গোডাউন মালিকরা কোথায়?

শেখ জাহাঙ্গীর আলম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭২৪ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১
চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি: গোডাউন মালিকরা কোথায়? চুড়িহাট্টার বর্তমান চিত্র। ছবি: বাংলানিউজ

ঢাকা: পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারান ৭১ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার দুই বছর কেটে গেলো।

কিন্তু এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কাউকে আজও বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। দুই বছর ধরে ঝুলে আছে ঘটনার তদন্ত।  

ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনের মালিক দুই সহোদর মো. হাসান (৫০) ও মো. সোহেলও (৪৫) বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। কিন্তু ওই ভবনের দ্বিতীয়তলায় থাকা রাসায়নিক গোডাউন মালিকদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে দুই বছরেও মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) তৈরি করতে পারেনি পুলিশ।

ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মো. জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার এজাহারে ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই সহদোর মো. হাসান ও মো. সোহেল ওরফে শহীদকে আসামি করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়।

এদিকে, চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমরা ঘটনার তদন্ত করে যাচ্ছি, তবে এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। আরও কতদিন সময় লাগবে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

চুড়িহাট্টার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত করেই যাচ্ছে। কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম হচ্ছে না। কারণ ঘটনার পর হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনের ওই ভবনের মালিক দুই সহোদর হাসান ও সোহেল দীর্ঘদিন পালিয়ে ছিলো। পরে তারা দুইজন আদালতে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে জামিন নিয়েছিলো। এখন তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদিকে, ওই ভবনের দ্বিতীয়তলায় রাসায়নিক গোডাউনের মালিক বা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।  

ওই ঘটনায় নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিলো। কিন্তু গত দুই বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সরকারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো কোনও সহযোগিতা পায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কবির হোসেন হাওলাদার বাংলানিউজকে বলেন, চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুনের ঘটনায় দায়ের মামলার বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলছে। মামলার পরপরই হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকদের গ্রেপ্তার করে কোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছে। চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনগুলো আমরা সংগ্রহ করেছি। তবে ওই ভবনের দ্বিতীয়তলায় থাকা স্প্রে গোডাউন মালিকদের বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য পাইনি। মূলত এই কারণেই তদন্তে আমাদের দেরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ওই গোডাউন মালিক ঘটনার পরপরই গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের কারও অবস্থানই শনাক্ত করা যায়নি। কিছু কিছু তথ্য আমরা পাচ্ছি তবে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করা হচ্ছে। গোডাউন মালিকদের গ্রেপ্তার করা গেলেই আমরা এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিতে পারবো।

সেদিন যা ঘটেছিলো চুড়িহাট্টায়:
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে আকস্মিক যানজটের সৃষ্টি হয়। এই সময় হঠাৎ বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে। হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনসহ আশেপাশে ছড়িয়ে যায় আগুন। কেউ পালানোরও সুযোগ পায়নি সেখান থেকে। হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয়তলা থেকে বুলেটের মতো ছুটে বের হতে থাকে আমদানিকৃত বিদেশি সব সুগন্ধির (বডি স্প্রে) ধাতব বোতল। মোডের তিনটি সড়কের অনেকদুর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, ভ্যান পিকআপভ্যান, প্রাইভেটকার সবই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেখানে থাকা যাত্রী, পথচারীসহ ৭১ জন প্রাণ হারান। আহত হন অন্তত শতাধিক। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা ওই আগুন জ্বলতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত। আগুনের প্রচণ্ড তাপে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলের কাছে যেতে পরেননি ওই রাতে। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ঘটনাস্থল থেকে একে একে ৭১টি মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। পরে নিহতের স্বজনদের মাধ্যমে ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।    

চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পরে ঘটনার তদন্তে নামে অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ মোট ৫টি সংস্থার তদন্ত কমিটি। মাঠ পর্যায়ে ঘুরে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত বিচার বিশ্লেষণ করে এই কমিটিগুলো তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করে। তবে সবগুলো প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় স্প্রে (কেমিক্যাল) গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। হদিস মেলেনি ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’র মালিকদের:
‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করত। এই প্রতিষ্ঠানটি অন্তত তিন দশক ধরে সুগন্ধী ও কসমেটিকস জাতীয় পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে আসছিল। পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের মূল অফিস ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের ৬৬ মৌলভী বাজারের তাজমহল মার্কেটে। এছাড়া হাতিরপুলের ১৩/১ নম্বর সোনারগাঁও রোডে কাশেম সেন্টারের ছয়তলায় একটি ছিল। ঘটনার পর তাদের এসব ঠিকানায় গিয়ে অফিস গেট তালাবন্ধ থাকতে দেখা যায়। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠনটির অন্যতম নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবাল ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কারও কোনো হদিস পায়নি পুলিশ।

কসমেটিকস ও সুগন্ধী আমদানিকারক একাঠিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ‘পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি সুগন্ধী আমদানি করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল সুগন্ধী ক্যান তৈরি করত। এসব ক্যানেই নতুন করে রিফিল করার কারণে তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। আর শুগন্ধী যেমন দাহ্য কেমিক্যাল একং সঙ্গে গ্যাসও দাহ্য। রিফিলের কারণেই ওই গোডাউনে গ্যাস চেম্বার তৈরি হয়।  

এছাড়া চুড়িহাট্টা মোড়ে অনেক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোড়ে প্রায় সব সময় (বডি স্প্রে) সুগন্ধীর ঘ্রাণ পাওয়া যেতো।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভারতের মারোয়ারি গোত্রের লোক। বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী কোনও ঠিকানা পাওয়া যায়নি। তাদের যেসব ঠিকানা দেওয়া ছিলো সেগুলোতে গিয়ে তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

চুড়িহাট্টার বর্তমান চিত্র:
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঘটনার দুই বছর পর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনটি ঘটনার এক বছর পর পর্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিলো। এরপর ভবন মালিক দুই সহোদর হাসান ও সোহেল পুনরায় ভবনটি মেরামত করে ফেলেছেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এই ভবনটি মামলার জব্দ আলামাত হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, তারা দুইজন কোনো প্রকার অনুমোতি না নিয়ে ভবনটি সংস্থার করেছেন।  

এদিকে, তার বিপরীত পাশে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশে নন্দ কুমার দত্ত লেনে ৬৩ নম্বর ভবনটি মেরামত করে দোকান করে দেওয়া হয়েছে এবং দ্বিতীয় তলায় একটি নতুন রেস্টুরেন্ট দেখা গেছে।

হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশে বাস্তায় মুখোমোখী দুটি হোটেল ছিলো। সে দুটির মধ্যে রাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট একইভাবে আছে। কিন্তু বিপরীত পাশে থাকা হোটেলটি ভেঙে দুটি দোকান করা হয়েছে। বর্তমানে তার একটিতে মোল্লা বিরানী হাউজ এবং অপর একটি বেনামে খাবার হোটেল। মোড়ে থাকা চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের দেওয়ালে ক্ষতিগ্রস্ত  টাইলসগুলো মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনটি দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এখানে গত দুই বছর আগে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছিলো।

মামলার বাদি মো. আসিফ বাংলানিউজকে বলেন, চুড়িহাট্টার ঘটনায় আমার বাবা মারা গেছেন। গত দুই বছরে সরকারের কোনো সংস্থা একবারের জন্য মাথায় হাত বোলাতেও আসেনি, সাহায্য-সহযোগিতা তো পরের বিষয়। পুলিশ শুধু তদন্তই করছে, কিন্তু আগুনের ঘটনায় যারা দোষী তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাইকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তারা পলাতক থাকার পর আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। বর্তমানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা সিটি কর্পোরেশন বা কোনো সংস্থার অনুমোতি ছাড়াই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি সংস্থার করে ফেলেছে। এ বিষয়েও কেউ কিছুই বলছে না।

তিনি আরও বলেন, তৎকালীন মেয়র সাইদ খোকন বলেছিলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু কয়েকজনকে কর্পোরেশনে নিম্ন পদে চাকরি দিয়েই শেষ। অনেককে আশ্বাস দিলেও তাদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

বাংলাদেশ সময়: ১৭২১ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১
এসজেএ/এজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa