ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ কার্তিক ১৪৩১, ০১ নভেম্বর ২০২৪, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৬

শিল্প-সাহিত্য

মেলেনি স্বীকৃতি ক্ষতিপূরণ চান শহীদ কর্পোরাল রশিদের স্ত্রী

স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা/ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৪৪ ঘণ্টা, মার্চ ২৫, ২০১৫
মেলেনি স্বীকৃতি ক্ষতিপূরণ চান শহীদ কর্পোরাল রশিদের স্ত্রী ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

‘ছবি তুলে কী হবে। এসব করে কোনও লাভ নেই।

স্বীকৃতি চাইতে চাইতে এতগুলো বছর কেটে গেল, আর কত? এখন যাবার পালা। তাই শেষ বয়সে আর স্বীকৃতি নয়, ক্ষতিপূরণ চাই। ’—কাঁপা কণ্ঠে এক পাহাড় কষ্ট বুকে চেপে ক্ষোভে-আবেগে কথাগুলো বলেন ’৭১-র রণাঙ্গনে শহীদ হওয়া কর্পোরাল (নায়েক) আবদুর রশিদের বিধবা স্ত্রী কাবিরুন নেছা। বলতে বলতে সত্তরোর্ধ্ব কাবিরুন নেছার চোখ দু’টো ছল ছল করে ওঠে। ৪৪ বছর চেপে রাখা যন্ত্রণা যেন হৃদয় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে সময়ের হাত ধরে একাই পাড়ি দিয়েছেন এতটা পথ। বিভীষিকাময় সেসব দিনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন যখন—গলা ধরে আসছিল বারবার।

শহীদ কর্পোরাল আবদুর রশীদের সহধর্মিনী কাবিরুন নেছা জানান, মার্চ মাস এলেই কষ্ট বাড়ে। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। দুঃসহ কষ্টের স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায়। সেই ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। তারপর স্বাধীনতা। কিন্তু জীবন যুদ্ধে এখনও লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাকে। কথার মাঝেই ঘরের ট্রাংক থেকে একটি পুরনো ছবি বের করে দেখান। বন্ধুদের সঙ্গে তোলা স্বামীর একমাত্র ওই ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আনমনে হয়ে যান। অপলক দৃষ্টিতে যেন কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান স্বর্ণালী অতীতে।



কাবিরুন নেছার কোলে মাত্র পাঁচ মাসের রাশেদাকে রেখে চলে গিয়েছেন আবদুর রশিদ। আর ফিরে আসেননি। তখন নয় বছরের ওয়াহেদসহ ছোট ছোট আরও তিন ছেলে। লাহোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে বদলি হয়ে আসার তিন মাস পর শুরু হয় যুদ্ধ। সেখান থেকে তার শ্বশুর হরমুজ আলীকে জানানো হয়, কর্পোরাল আবদুর রশীদ পাক হানাদারদের বুলেটে শহীদ হয়েছেন। সেই থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকার নতুন যুদ্ধ শুরু হয় কাবিরুন নেছার।

ফাইল ঘেটে বিভিন্ন কাগজের ফিরিস্তি দেখিয়ে কাবিরুন নেছা আক্ষেপ করে বলেন, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমার স্বামীর শহীদ হওয়ার প্রত্যয়নপত্র রয়েছে। এসব কাগজপত্র নিয়ে এতগুলো বছর কত জায়গায় ধর্ণা দিয়েছি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজও সরকারের খাতায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বামীর নাম তুলতে পারিনি। তাই সরকারি গেজেটে নেই তার নাম, নেই কোনও স্মারক চিহ্নও। ’

একটি কাগজের ফটোকপিতে দেখা যায়, তা সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে দেওয়া। এতে স্বাক্ষর করেন সেনানিবাসের ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের ডিএএএন্ডকিউএমজি (রেকর্ডস) এর তৎকালীন একজন মেজর। ‘মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র’ শিরোনামে ওই ফটোকপি কাগজটিতে লেখা রয়েছে—‘প্রত্যায়ন করা যাচ্ছে যে, ৭০১৯০৪১ কর্পোরাল আদুর রশিদ, পিতা হরমুজ আলী (মৃত), গ্রাম: ভাটপাড়া, লক্ষীপুর, পো: রাজশাহী কোর্ট, থানা রাজপাড়া, জেলা: রাজশাহী। তিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৬নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম বিশেষ বাংলাদেশ আর্মি অর্ডার (এসবিএও)-০৩/২০০০ এর ক্রমিক নম্বর ১৬৯৮৫ এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং মুবিম/প্র:৩/মুক্তিযোদ্ধ/গেজেট/২০০৩/৪৭৯ তারিখ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০০৩ এর ক্রমিক নং ১৫৭৯২ এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ০১ জুলাই ১৯৫৭ ইং তারিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ৩১ মার্চ ১৯৭১ ইং তারিখে সৈয়দপুর সেনানিবাসে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। ’



শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদের মেজো ছেলে নাজমুল হক জানান, সৈয়দপুর সেনানিবাস ও ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাওয়া মুক্তিযুদ্ধে তার বাবার শহীদ হওয়ার এমন অনেক দলিলাদি নিয়ে স্বীকৃতির জন্য তার মা এক সময় অনেকের দ্বারে-দ্বারে ঘুরেছেন। এখন বয়স হয়ে যাওয়ায় তিনি আর পারেন না। বর্তমানে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গেছেন তিনবার। তিনবারই ফরম নিয়ে এসেছেন। কিন্তু যতবারই জমা দিয়েছেন কোনও না কোনও ভুল ধরে ওই ফরম গ্রহণ করা হয়নি। গত ছয়মাস আগেও তিনি এ নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন, কিন্তু লেখাপাড়া কম জানায় শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারেননি।

নাজমুল হক জানান, বাবা আবদুর রশিদ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলেও স্বীকৃতি না পাওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা কোনও সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পাননি। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রতিমাসে যে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয় তাও না। আর্থিক অনটনে তারা কেউ ভালোভাবে পড়ালেখা পর্যন্ত করতে পারেননি। বড় ভাই আবদুল ওয়াহেদ নিরক্ষর। তিনি ছিপ-বড়শির দোকান করেন। আর নাজমুল এখন খুচরা কাঁচামালের ব্যবসা করেন। তার ছোট ভাই শামসুজ্জোহা দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেও টাকার জন্য এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। এখনও বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর ছোট বোন রাশেদার বিয়ে হয়ে গেছে। রাজশাহী মহানগরের ভাটাপাড়া এলাকায় দাদার দেওয়া সোয়া কাঠা জমির ওপর অনেক কষ্টে বাড়ি করেছেন। সেই বাড়িতেই বিধবা মা’কে নিয়ে বাস করেন তারা।



নাজমুল হকের দাবি, তার বাবা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এতগুলো বছরে তাদের প্রাপ্য অনেক কিছুই ছিল যা তারা পাননি। তাই এত বছর পরে হলেও তাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তার মাকে শহীদের স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হোক। দীর্ঘ ৪৪ বছরে সরকারের ঘরে তার বাবার জমে থাকা সমস্ত প্রাপ্য-পাওনা তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। এ সময় তাদের পরিবারে একমাত্র অনার্স পড়ুয়া মেয়ে (শহীদের নাতনি) রাখি খাতুনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার জন্যও জোর দাবি জানান নাজমুল হক।

রাজশাহী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সাইদুর রহমান বলেন, ওই শহীদ পরিবার সম্পর্কে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানেন। সেনাবাহিনীতে থাকলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেখান থেকেই সনদসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু কোনও কারণে তাদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। এর ওপর পরিবারটিও যথেষ্ট অভিমানী হওয়ায় তারা কখনও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছে আসেনি। এলে তাদের পক্ষ থেকে যা কিছু সম্ভব তা করা হবে বলে জানান রাজশাহীর সাবেক এই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।



বাংলাদেশ সময়: ২০৪৪ ঘণ্টা, মার্চ ২১, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।