ঢাকা, সোমবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জুন ২০২২, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

শিল্প-সাহিত্য

হাইড্রোফোবিয়া | সানজিদা সামরিন

গল্প ~ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮১৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৬, ২০১৫
হাইড্রোফোবিয়া | সানজিদা সামরিন

রাত দু’টার কাছাকাছি। শীতের রাত, তাই একটু বেশি শুনশান।

অবশ্য শহরের বাড়িতে আবার শুনশান কী। সব ঘরের ফ্যান বন্ধ বলে চুপচাপ পরিবেশ বলা যেতে পারে। সমস্ত নিস্তব্ধতা ভাঙার দায়িত্ব পড়েছে আমার মাথার ওপর ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানটার ওপর। ঘটাংঘটাং শব্দ। এই শীতে ফ্যান চালানোর যুক্তির চেয়ে অযৌক্তিকতাই বেশি। রাতে শোয়ার আগে আমার ফ্যান চালানো নিয়ে খাম্মীর কিছু না কিছু বলা চাই-ই। মাঝরাতে ওয়াশরুমে যাবার সময়ও এ ব্যাপারে নিজে নিজে দু’চারটা বাক্য ছাড়তে ভোলেন না। ইদানীং বেশিরভাগ মাঝরাতেই তার কথা শুনতে পাই।

খাম্মী মা’র মতো না হলেও তার কাছ থেকে মা’র ফ্লেভার পাই। মা আর খাম্মী জমজ বোন ছিলেন। মা মারা গেছেন ১০ বছরের খানিক বেশি হবে। অ‍ামার মধ্যে মা’র অভাববোধটা নেই খাম্মীর স্নেহেই। খাম্মী আর মাকে আলাদা করা যেত না। দুজনেই অনেক লম্বা। বাংলাদেশি নারীদের তুলনায় যাকে এক্সক্লুসিভ বলা চলে। দারুণ ফর্সা। কিন্তু তাদের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য ছিল। মা চুপচাপ অ‍ার অন্তর্মুখী ছিলেন। খাম্মী ভীষণ হাসিখুশি আর দিলখোলা মানুষ। কারণে অকারণে কথার ঝাঁপি খুলে বসেন।



রাতে বালিশে মাথা রাখার আগে একটা ওষুধ খাই। নিজের চাইতে এই ওষুধটাকে অনেক বিশ্বাস করি। ইদানীং ওষুধটা বিশ্বাস ভাঙছে। ঘুম আসে না। আজকাল রাতে ওষুধ খাওয়ার সময় ভয় লাগে। ভয়টা ওষুধে নয়, পানিতে। পানিতে ভয় লাগার ব্যাপারটা নতুন। হঠাৎ হাইড্রোফোবিক হয়ে যাওয়ার কারণ জানলেও মানতে পারি না। পানি খাওয়ার সময় মনে হয় যেন দম আটকে গেল। আবার সাওয়ার ছেড়ে গোসল করার সময়ও মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছি না। ইচ্ছে হয়, বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করি



প্রায়ই গভীর নিস্তব্ধতায় ঘুম ভেঙে যায়। ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলে দেখি মাথার ওপর ফ্যানটা বন্ধ। খাম্মীর কাজ।

মস্ত খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। অবশ্য নিজেরই মনে ছিল না, এভাবে শুয়ে আছি অনেকক্ষণ ধরে। খাম্মী এসে বললেন, “তিতলি, এখনো ঘুমাসনি? রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাবি, সকালে তাড়াতাড়ি উঠবি। এত বেলা করে উঠিস কেন? সকাল সকাল উঠে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারিস। ”

এরপর অ‍ারো অনেক কথা, অনেক শব্দ, অনেক...। খাম্মীর চেহারাটা যেন আমি আর দেখতে পারছি না। প্রথমে আবছা, তারপর অদৃশ্য। হঠাৎ মনে হলো, একটু আগে খাম্মী অ‍ামার সঙ্গে কথা বলছিলেন। পাশে তাকিয়ে দেখি তিনি নেই। তার ঘরের দরজা দিয়ে আলো আসছে না। শুয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই। মনে করার চেষ্টা করলাম, শেষমেশ খাম্মী কী বলেছিলেন।

অজান্তেই মনে হলো, আজ আমার কোনো ফোন আসেনি। গতকালও না। তার আগের দিন? না। গত এক সপ্তাহে কেউ ফোন দেয়নি আমাকে। ওহ হ্যাঁ, পরশু বাবা একবার কল দিয়েছিলেন। ধরিনি। ইন্টারন্যাশন্যাল কোনো ফোন আমি রিসিভ করি না। কেন করব? ওখানে কে আছে আমার? খাম্মী, মেসোবাবু আর পিপলু ছাড়া পৃথিবীতে আমার কেউ নেই।

মেসোবাবুর সঙ্গে খাম্মীর বিয়ে হয়েছে আমার জন্মের এক বছর আগে। পিপলু আমার সাত মাসের বড়। ভাইয়ের চেয়ে বন্ধুই বেশি ও আমার। বাবা-মা’র ডিভোর্স হওয়ার পর মা বেঁচেছিলেন তিন বছর। বাবা তো আগেই ফের সুখের সংসার পেতেছেন। তারপর থেকেই এ পরিবারের স্থায়ী সদস্য আমি। এত ঘটনার পরও দোতলা বাড়ির ছাদের নিচে নরম বিছানায় শুয়ে অলীক ভাবনায় ডুবে থাকা আমার জন্য সুখদায়কই হওয়ার কথা।

কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে বুক চাপড়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। ঘুমাতে পারি না। মনে হয়, আমি সুখী নই। মনে হয় আমি একা। ঘুমন্ত শহরে কাঁটা ছড়ানো বিছানায় জেগে থাকি আমি।

আচ্ছা পিপলুকে ঘুম থেকে ডেকে তুললে কেমন হয়? অনেকদিন রাতজেগে গল্প করি না দুই ভাই-বোন।
 
“পিপলু!”
“হুম, কী হয়েছে?”
“কিছু না। উঠবি একটু? ওঠ না। ”
“এত রাতে ডাকিস কেন? যা ভাগ্। ”
“আমার ঘুম আসছে না। ওঠ না গল্প করি। ”
“উফ জ্বালাস না তো! ঘুম না এলে কফি খা আর সুডোকু সলভ কর্। ”

পিপলু অনেক ক্লান্ত। আমি জানি। ওকে ঘুমাতে দেওয়া উচিত।

মস্ত খাটের একমাত্র বাসিন্দা আমি। মশারি টাঙানোর পর যে কাজটা থাকে তা হলো ডায়েনিংরুম থেকে পানি আনা। খাবার পানি। আমার বিছানায় আমার সঙ্গে ঘুমায় সুনীলের অখণ্ডিত প্রথম আলো, ফার্মেসি থেকে পাওয়া নোটপ্যাড আর কালো একটা পেন্সিল। দু’দিন আগে মেসোবাবু একটা অনুবাদের বই দিয়েছেন। সেটাও থাকছে, কিন্তু পড়া হয় না কোনোটাই।

রাতে বালিশে মাথা রাখার আগে একটা ওষুধ খাই। নিজের চাইতে এই ওষুধটাকে অনেক বিশ্বাস করি। ইদানীং ওষুধটা বিশ্বাস ভাঙছে। ঘুম আসে না। আজকাল রাতে ওষুধ খাওয়ার সময় ভয় লাগে। ভয়টা ওষুধে নয়, পানিতে। পানিতে ভয় লাগার ব্যাপারটা নতুন। হঠাৎ হাইড্রোফোবিক হয়ে যাওয়ার কারণ জানলেও মানতে পারি না। পানি খাওয়ার সময় মনে হয় যেন দম আটকে গেল। আবার সাওয়ার ছেড়ে গোসল করার সময়ও মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছি না। ইচ্ছে হয়, বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করি।

বাড়িতে শুধু আমার ঘরের বাতি নেভানো বাকি ছিল। আমি বাতি নেভালেই রাত উদ্ধার পায়। কিন্তু বাতি নিভিয়ে আমি কী করব? কী কাজ আমার? কাঁদব? কাঁদাটা কি যৌক্তিক হবে? ঘুমাব? অ‍াচ্ছা যদি ঘুমিয়ে পড়ি আর মাঝরাতে হঠ‍াৎ উঠে যদি সিলিং ফ্যানের শব্দ না পাই! যদি দেখি ফ্যান বন্ধ, কী হবে তখন? না, এই শীতে ফ্যানটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না, ফ্যানের বাতাসও না। কিন্তু ওই ঘটাংঘটাং শব্দটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মাঝরাতে ওটাই আমার একমাত্র অবলম্বন।

আমি নিস্তব্ধতা ভয় পাই। ভয় পাই একা হতে। অলক চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুকূপে হারিয়ে গেছি আমি। সময় অসময়ে স্যাঁতস্যাঁতে লতানো কষ্টগুলো আমাকে আঁকড়ে ধরে। আমি আর পেরে উঠি না। হাত-পা অসাড় হয়ে আসে।

যখন থেকে অলককে চিনি, তখন থেকেই আমার মনে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করত। সময়ের পর সময় বয়ে গেছে। কাল সেই প্রশান্তিকে ঠেলেঠুলে দম আটকে যাওয়া ভয়গুলোকে জায়গা করে দিয়েছে।

কয়েকমাস আগের কথা। সকাল সকাল ক্লাসে অলকের ফোন পেলাম। ক্ল‍াসরুম থেকে বেরিয়ে রিসিভ করতেই,
“তুমি কোথায়?”
“আমি ক্লাসে। ”
“কখন শেষ হবে?”
“বিকেল হবে। কেন?”
“ক্লাস শেষে আমার সঙ্গে মিট করবে। ”

একটা কফিশপের নাম বলে অলক ফোন রেখে দেয়। জীবনে প্রথমবার অলকের কণ্ঠটা এত সিরিয়াস মনে হলো। কী হয়েছে ওর। কেন যেন আবার মনে হচ্ছিল, আমি জানি অলক আমাকে কী বলবে, কী বলতে চায়। হয়ত তাই অনেক বেশি শান্ত ছিলাম সেদিন। শান্ত রাখতে পেরেছিলাম নিজেকে।
 
কিন্তু ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার সময় মনের মধ্যে, রক্তের শিরায় শিরশিরানি হচ্ছিল। ওয়াশরুমে গিয়ে একবার আয়না দেখে নিলাম। পিচ রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছি। গলায় ছোট্ট একটা লকেটসহ চেইন। অলক আমায় আজ নতুন দেখছে না। তবুও।

তড়িঘড়ি করে বের হলাম। ইউনিভার্সিটি থেকে ওই কফিশপ কম হলেও আধঘণ্টার দূরত্ব। অবশ্য আজ যেহেতু অলকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, পথে কোনো না কোনো ঝামেলা থাকবেই। সত্যিই বাস পেলাম না। পেলাম, অনেক ভিড়। ভিড়ওয়ালা বাসে আমি চড়তে পারি না। গা ঘিনঘিন করে। রিক্সা নিয়েই ছুটলাম। অতঃপর কফি শপের সামনে রিক্সা থামতেই দেখি অলক দাঁড়িয়ে।

দেখা হওয়াজনিত সহজাত হাসিটা ঠোঁটে এলো না। অলকও হাসল না। কফিশপের দরজা খুলে অলক আমায় ঢুকতে বলল। দু’জন সামনাসামনি বসলাম। অলক আজ সাদা-কালো চেক শার্ট পরেছে। ওর চুল থেকে স্পাইক নেমেছে গত দু’বছর আগে। ঝরঝরে কয়েকটা চুল ডান চোখের ওপর এসে পড়েছে। মনে হলো, যত না সামনাসামনি, বরং ফোনে অনেক বেশি সহজ আমরা। সামনে দাঁড়ালে, চোখে চোখ রাখলে বাস্তবতাও সামনে এসে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে।

আমার মাথায় এলোমেলো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। যখন অলকের সঙ্গে পরিচয় হয়, আমি উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি। পিপল‍ুর বন্ধুর বন্ধু ও।

অলক কখনোই আমার বন্ধু ছিল না। তবে যা ছিল তাকে প্রেম বলা যাবে না। কিন্তু অলকের কথা, আচরণ, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—অ‍ামাকে সাংঘাতিকরকম প্রভাবিত করত। করে বৈকি! অ‍ামি বিষণ্ণ হয়ে যাই। হারিয়ে যাই, অদৃশ্য হয়ে যাই সবার মাঝে থেকেও। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে অলক বলল,
“তুমি কী করবে?”
“বলেছিই তো কী করব। ”
“ওই ছেলেটাকেই বিয়ে করবে?”
“হুম। ”
“এটা তুমি মন থেকে বলছো না। ”
“অলক, আমি মন থেকেই বলছি। খাম্মী আমার খারাপ চান না। ”
“না। ”

অলকের ‘না’ শোনার পর আমি আর কিছু বলতে পারিনি। হয়ত সত্যের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম।

অলক আমার নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে বলল, “তিতলি, আমি তোমাকে চাই। উইল ইউ ম্যারি মি?”

যদিও কফিশপে আসার পথে, সকালে অলকের ফোন পাওয়ার পরই মনে হয়েছিল অলক হয়ত এমন কোনো কথাই বলবে। তবু সেটা ছিল পুরোটাই আমার ভাবনা। আর এখন অলক যা বলছে, পুরোটাই বাস্তব। আর এ বাস্তবতা আমার চোখের সংগঠিত হচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি খুশি হওয়া উচিত? আনন্দে উদ্বেল হওয়া উচিত?

অলক এত বছর বাদে আমাকে বলছে, হি ওয়ান্টস মি!

মনের সমস্ত অশান্ত ঢেউকে সামলে নিয়ে আমি বললাম,
“কী বলছো এসব? ঠিক বলছো?”
“আমি ঠিক বলছি। আমাকে বিয়ে করবে?”
“তুমি খাম্মীকে রাজি করাতে পারবে অলক?”
“পারব। চলো আজ যাব তোমার খাম্মীর কাছে। ”

আমি আশাহত হই। শঙ্কায় আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। খাম্মী নিঃসন্দেহে অ‍ামার মা’র জীবন্ত ফসিল। কিন্তু অলক? খাম্মী কখনোই অলককে মেনে নেবেন না। বিয়ের সময় হলে পরিবার মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খোঁজে। সেরকম উপযুক্ত পাত্রের তালিকায় অলক পড়ে না।

“না অলক। ”
“আমি জানি তিতলি, অনেক সমস্যা। কিন্তু আমাদের তো সেগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। ”
“হ্যাঁ মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু তার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই আমাদের। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কোথায় ছিলে এতদিন তুমি? কোনো পরিস্থিতিই আর বদলাবে না। ”
অলক আমার হাত দুটো চেপে ধরে বলল,
“চুপ। আগে বলো তুমি আমাকে চাও কিনা? ভালোবাসো আমাকে?”
“হ্যাঁ বাসি। ”
“আমাকে শুধু কয়েকটা মাস সময় দাও। আমি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিই। একটা ভালো জব তো পেতে হবে। আরো অনেক প্রিপারেশন আছে। বাসা থেকে বিয়ের চাপ এ ক’টা মাস আটকে রাখতে পারবে না?”

আমি জানি পরিস্থিতি এত সহজ নয়। তবুও কোত্থেকে এক শক্তি পেলাম। বললাম, “পারব। তুমি সময় নাও। তবে মনে রেখো অ‍ামার হাতে সময় খুব কম। ”

ওইদিন কফিশপ ছেড়ে ওঠার সময় নিজেকে অনেক হালকা লাগছিল। শরীর-মন দুটোর ওজনই যেন কয়েকগুণ কমে গেছে। অলক আমাকে রিক্সায় তুলে দেয়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রিক্সার হুড তুলে দিয়ে রিক্সাওয়ালার হাতে ভাড়াও গুঁজে দেয় অলক। রিকশা একটু এগিয়ে গেলে পেছনের পর্দা তুলে আমি এক নজর দেখলাম ওকে।

বুঝতে পারছিলাম না। যা ঘটল, তা ঘটল সত্যি? এটা কি কোনো সুখের ঘটনা? আমার কি খুশি হওয়া উচিত? নাকি সুখস্বপ্ন ভেবে ভুল করছি!

অলক আমার জীবনে সবচেয়ে বড় দ্বিধা। না, বলা ভালো ও নিজেকে নিয়ে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বে আছে। কী ও চায়, আদৌ জানে? আমিই কি ওকে বিশ্বাস করি? ছেড়ে যাবে না এই বিশ্বাস? নাকি আমি নিজেকে বিশ্বাস করি বলে এপথে এগুচ্ছি? যদি কখনো অলক আমাকে ছেড়ে চলে যায়, সেই পরিস্থিতিতে নিজে সামলাতে পারব এই বিশ্বাস থেকেই কি আমি হাঁটছি এ পথে?

সপ্তাহ দুই বেশ গেল। সেদিন খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, অলককে একটু দেখতে। একটু ছুঁয়ে দেখতে। স্বভাবতই ওকে কথাটা জানাইনি। পাছে কষ্ট পেতে হয়।
 
সন্ধ্যেবেলা অলক নিজেই ফোনে বলল, “তিতলি সন্ধ্যেবেলা দেখা করব। কোথায় যাব জানি না। কিন্তু আমি তোমাকে নিতে আসব। ”

বাঁধ ভেঙে গেলে জল যেমন ছোটে আর কি—আমিও তেমন তীব্রতায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটের সামনে থেকে অলক আমাকে পিক করল। সিএনজিতে উঠে বসতেই আমাকে বলল, “তুমি একটু বসো। আমি আসছি। ”

নেমে ও সামনের একটা ফাস্টফুডের দোকানে ঢোকে। সিএনজির ওপাশের দরজাটা হা করে খোলা। আমার সরাসরি ফুটপাতে একটা মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে। মিটিমিটি হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। এরইমধ্যে ছোট এক ছেলে সিএনজির খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে বলছে, “আপু একটা টাকা দাও না। আপু, ও আপু”... অন্যসময় হলে ব্যাগ খুলে বাচ্চাটার জন্য টাকা বের করতাম। কিন্তু ওইসময় বাচ্চাটার কথাগুলো স্রেফ ঘ্যানঘানানি মনে হলো।

উফ অলক, তাড়াতাড়ি এসো তো। মনে হওয়া মাত্রই অলক এসে সিএনজিতে ঢুকল। বাচ্চাটা অলককে বলল, “ভাইয়া, একটা টাকা”... অলক বলল, “এখন সময় নেই যাও। একথা বলে সিএনজির দরজা বন্ধ করে দিল। অলকের হাতে কোকাকোলার একটা ওয়ানটাইম গ্লাস।
“এত পিপাসা লেগেছিল বলার মতো না। ” কোকাকোলায় একটা চুমুক দিয়ে ও বলল, “নাও খাও। ”
আমি একটু ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম। অলক বলল, “খেয়ে ফেলো পুরোটাই। ”

আমি খেলাম না। সিএনজি কয়েক মিনিট ট্রাফিক জ্যামে আটকে রইল। অলক আর আমার মাঝে কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। ট্রাফিক জ্যামটা ছুটে গেলে এই দূরত্বটাও দূর হয়ে যাবে জানি।

সাঁই সাঁই করে সিএনজি ছুটছে। হাওয়ারও ওজন আছে। ধুপধাপ মুখে এসে পড়ছে। অলক ওর একটা হাত পেছন দিক থেকে আমার কাঁধে রাখল। দূরত্ব ঘুঁচে যাবার পালা। আমিও ওর কাঁধে মাথা রাখলাম। ওর অমসৃণ গালটা আমার কপাল ছুঁয়ে আছে।
 
অলক বলল, “কাল জাফলং যাচ্ছি। ভাবল‍াম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই। মনে হচ্ছিল তুমিও দেখা করতে চাচ্ছো কিন্তু বলছো না। ”
“হুম। ”
“তিতলি, আমি না তোমাকে আমার মতো করে ভালোবাসতে পারছি না। ”
“কেন?”

অলকের কথাটা কঠিন ছিল কিনা জানি না। এই কথার অনেকগুলো মানে হতে পারে। কোনটা বুঝব? কিন্তু নিঃসন্দেহে কথাটার গভীরতা আছে। সিএনজির ভোঁ ভোঁ শব্দের মাঝেও নিরনিরে সহজ কণ্ঠের বলা কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল‍াম। অনেকটা সময় চুপচাপ ছিলাম দু’জন। তবে মনে মনে তথা হচ্ছিল,
“তুমি চাও?”
“আমি চাই। ”
“কী চাও? ”
“জানি না। ”
“তুমি জানো। ”
“হুম জানি। ”
“আমিও জানি। ”

চিবুক উঁচিয়ে বললাম, “ভালোবাসতে পারছো না?”
অলকের চোখ আমি দেখতে পেলাম না। তবে অলক হাসছে। হা হা টাইপ হাসি না। দুষ্টু হাসিও না। চোয়াল লাল হয়ে যাওয়া হাসি।
 
বললাম, “আমি বাসলে হবে?”
“তুমি আর কত ভালোবাসবে? হাঁপিয়ে গেছো তো। ”

তারপর অনেকটা সময় পার হলো। একটু বিরতি নেওয়া দরকার। অলক আর আমি সিএনজি থেকে নামলাম। চা খাওয়ার কোনো প্ল্যান ছিল না। কিন্তু দু’জনেই চায়ের টংয়ে ঢুকলাম। গরম চায়ের সঙ্গে উঠে এলো বাস্তবতার ধোঁয়া। অলক বাস্তবতার শিকার। ও বাস্তবতা বোঝে। কিন্তু বাস্তব তৈরি করতে জানে না। ও নিজের সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে নয়। ও সময়কে মেনে নেয়। সময়কে তৈরি করতে জানে না। ওর সঙ্গে আমার ওখানেই পার্থক্য। আমি নতুন বাস্তব তৈরিতে বিশ্বাসী। বাস্তব তৈরির অ‍াত্মবিশ্বাস তখনই পাই, যখন অলক আমার সঙ্গে থাকে।

অলক যতবারই আশ্বাস দেয় ততবারই আমার মনে হয় সে আসলে নিজেকেই আশ্বাস দিচ্ছে। দিতে চাচ্ছে।

ফেরার পথে পুরো সময়টাই দু’জনে চুপ ছিলাম। মন খারাপ নয়। মনোমালিন্যও নয়। কোনো কোনো সময় নীরবতা শব্দ-বাক্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। সেই সন্ধ্যাটা ছিল অসাধারণ। রাতে অলকের সঙ্গে কথা হয়েছিল ফোনে। সবই তো ঠিক ছিল। ঠিক থাকারই তো কথা।

পরদিন সকালে অলোককে ফোন দিই। প্রথমবার সে ফোন ধরে না। হয়ত ঘুমাচ্ছে। আধঘণ্টা বাদে দ্বিতীয়বার ফোন দিলে ধরে,
“হ্যালো। ”
“ঘুমাচ্ছিলে?”
“না, ঘুম ভেঙেছে অনেক আগে। শুয়েছিলাম। ”
“ওহ। ”
“ইম্পর্টেন্ট কিছু বলবে?”
“কেন ইম্পর্টেন্ট না হলে কল দেয়া যাবে না?”
“তা যাবে না কেন। তিতলি আমি ফোন রাখি। আজ আর ফোন দিও না। ”

অলক কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ও কি অভিমান করল। পরে ভেবেছি ও-ই আমাকে ফোন দেবে। এরপর দুপুর গড়াল, বিকেল শেষে সন্ধ্যা। সারাদিনে অলকের কোনো ফোন পেলাম না। গতদিনের ভালোলাগা কোথায় যেন হারিয়ে যাই যাই করছে। অলকের কী হয়েছে, বুঝতে পারছি না।
 
সন্ধ্যায় একটা ম্যাসেজ পেলাম অলকের। জানাল, ওদের জাফলং যাওয়ার প্ল্যান ক্যানসেল হয়েছে। সে একা গাজীপুর যাচ্ছে এক বন্ধুর কাছে।

ম্যাসেজ পেয়ে একটু হাসতে পেরেছিলাম, মনে আছে। সেদিন বারবার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ চলে যাচ্ছিল। না, অলক সারারাতে একবারও ফোন দেয়নি। পরদিন কেটে গেল, আরো দুটি দিনও পার হলো। অলোক আর ফোন দেয়নি। এরপর আমিই ফোন দিলাম। ওর ফোনটা সুইচড অফ। এবার আমার দুশ্চিন্তা রাগে রূপান্তরিত। অলোক কোথায়। ও ঠিক আছে তো!

অলোকের এক বন্ধুর কাছ থেকে ওর খবর জানা গেল। যে খবর পেলাম তার জন্য আমার মানসিক প্রস্তুতি থাকা উচিত ছিল। যে কারণে অলকের বিয়ের প্রপোজে সেদিন আনন্দে উদ্বেল হতে পারিনি। একই কারণে আজ কাঁদতেও পারছি না। বুক ভেঙে আসছে। আমার বোঝা উচিত ছিল, অলক কী চায় ও নিজেও তা জানে না। কখনো জানেওনি। তাই আমি বারবার একা হয়ে যাই।

অলকের বন্ধুর মাধ্যমে ওকে জানালাম ওর সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই।

আমি দাঁড়িয়ে আছি। অলকও এসেছে। লাল-নীল চেক শার্ট। মুখে জোর করে বসানো একটা হাসি। কোনো কথা হলো না আমাদের। দু’জনেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। আমার মনে হলো, আজ বুঝি আমিই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে এখ‍ানে এসেছি। ওই মুহূর্তে অলকের সঙ্গে দেখা করাটা নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কিছু বলেই মনে হলো না।

“তুমি কোথায় ছিলে এই ক’দিন?”

বলতে গিয়ে টের পেলাম কণ্ঠটা নিজের কানে বেশ স্বাভাবিকই শোনাচ্ছে।
অলক বলল, “তিতলি, একট‍া কথা কি জানো? তুমি যখন বলো, আমাকে নিয়ে তুমি সুখী হবে তখন আমার মনে হয় যে তুমি হয়ত তোমার কল্পনা থেকে কথাটা বলো। এটা বাস্তব না। ”

আমার মাথাটা কেন যেন ঝিম করে উঠল। এসব কী বলছে অলক।

“এসব কী বলছো অলক? হঠাৎ একথা আসছে কেন?”
“হঠাৎ না। এটাই সত্যি। তুমি আমাকে ছাড়া অন্য যেকোন একটা মানুষকে নিয়ে সহজেই খুব সুখী হতে পারবে। ”
“অলক আমি বুঝতে পারছি না। আমাদের মধ্যে হঠাৎ কী হলো যে এসব কথা আসছে। ”
“তিতলি, কোনো দিক থেকেই নিজেকে তোমার যোগ্য বলে মনে হয় না। নিজেকে খুব ছোট লাগে। ”
“অলক, কী যা তা বলছো। ”
“যা তা না। তিতলি নিজের লাইফটা স্টার্ট করো। ”

আমি আর কিচ্ছু শুনতে পারছিলাম না। আমার কী ইচ্ছে হচ্ছিল আমি জানি না। শুধু পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হচ্ছিল।

আমি বললাম, “সেদিন যখন আমাকে বললে ইউ ওয়ান্ট টু ম্যারি মি তখন কেন বলেছিলে বলো? তুমি আমাকে ভালোবাসো না অলক?”
“তোমার কি মনে হয় আমি তোমাকে ভালোবাসি না?”
“আমার এখন কিছুই মনে হচ্ছে না। প্রশ্ন করো না আমাকে। বলো কেন বলেছিলে?”
“তুমি নিজেকে বুঝ দিতে পারবে তো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না? যদি পারো তাহলে সেভাবে নিজেকে সামনে নিয়ে যাও। ”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না, পারব না। ” চোখে দরদর করে জল গড়াল। অলক কিছুই বলতে পারল না। একহাত দিয়ে কোনোভাবে আমার কব্জি চেপে বলল, “তিতলি লাইফটা স্টার্ট করো। ”

আমি আর কিছু বলতে পারল‍াম না। ঝড়ের বেগে বের হয়ে এলাম।

অলকও আমার পেছন পেছন এলো। আমি হয়ত সত্যিই খুব অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলাম। নয়ত অলক এভাবে আমার পেছন পেছন এলো কেন? প্রবল বেগে রাস্তা পার হওয়ার সময় আমার হাতটা ধরল ও। খপ করে ধরার মতোই। আমি কি বেগতিক চলছিলাম? জানি না।

আমাকে রিক্সায় তুলে দিল ও। প্রপোজ করার দিনের মতো হুড তুলে দিল। জোর করে যখন রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিচ্ছিল, আমার অস্পষ্ট মনে পড়ে, আমি চিৎকার করে বলছিলাম, “না না না। অলক তুমি যাও। প্লিজ যাও!”

বাড়ির পথেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু সারাটা পথ মনে হচ্ছিল নিরুদ্দেশ কোনো গন্তব্যে চলেছি আমি। চারদিকের অন্ধকার আরো আবছা হতে লাগল। চোখ বন্ধ হয়ে এলো আমার।

ইদানীং নিস্তব্ধতায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যখন দেখি সিলিং ফ্যানটা বন্ধ, মনে হয়, হয়ত কোনো জ্যান্ত দুঃস্বপ্ন পাড়ি দিচ্ছি আমি।

গলা শুকিয়ে আসে কিন্তু জল স্পর্শ করতে পারি না...



বাংলাদেশ সময়: ১৬১৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৬, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa