ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৩১ মে ২০২৪, ২২ জিলকদ ১৪৪৫

ইসলাম

‘স্মরণ’

আধুনিক শাসনব্যবস্থার রূপকার হজরত উমর (রা.)

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭২৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৫, ২০১৫
আধুনিক শাসনব্যবস্থার রূপকার হজরত উমর (রা.)

আজ পহেলা মহররম (১৫ অক্টোবর ২০১৫, বৃহস্পতিবার)। ২৪ হিজরির এই দিনে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) শাহাদাতবরণ করেন।

হজরত আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। হজরত উমর (রা.) ইসলামি আইনে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন। ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে আল ফারুক (সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। আমিরুল মুমিনিন উপাধিটি সর্বপ্রথম তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে খিলাফতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। তার শাসনামলে জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হয়। তিনি ইহুদিদেরকে জেরুজালেমে বসবাস ও উপাসনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন।

হজরত উমর (রা.) মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খাত্তাব ইবনে নুফায়েল এবং মায়ের নাম হানতামা বিনতে হিশাম। ইসলাম পূর্ব আরবে লেখাপড়ার রীতি বেশি প্রচলিত ছিল না। এরপরও তরুণ বয়সে হজরত উমর (রা.) লিখতে ও পড়তে শেখেন। নিজে কবি না হলেও কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। কোরাইশ ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি কৈশোরে সমরবিদ্যা, অশ্বারোহণ ও কুস্তি শেখেন। তিনি দীর্ঘদেহী ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন। কুস্তিগীর হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। এছাড়াও তিনি একজন সুবক্তা ছিলেন।

৬১০ সালে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলাম প্রচার শুরু করলে অন্যান্য মক্কাবাসীর মতো হজরত উমর (রা.) ইসলামের বিরোধীতা করেছিলেন। তার হাতে মুসলিমরা নির্যাতিত হয়। বিরোধীতার এক পর্যায়ে তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে নবী মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করতে যেয়ে তিনি ইমলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

তার ইসলাম গ্রহণের পর প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ আদায় করতে মুসলিমরা আর বাঁধার সম্মুখীন হয়নি। ইসলাম গ্রহণের পর গোপনীয়তা পরিহার করে প্রকাশ্যে তিনি মুসলিমদের নিয়ে বাইরে আসেন এবং কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি ছাড়াও হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। সেদিন নবী করিম (সা.) তাকে ‘ফারুক’ উপাধি দেন।

ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় হজরত উমর (রা.)-এর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি কঠোর প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তবে তিনি ইচ্ছাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক সচেতনতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি সদয় আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন।

শাসক হিসেবে হজরত উমর (রা.)-এর অমর কীর্তিসমূহ হলো-
বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার উদ্ভাবন, বিচারিক আদালত প্রতিষ্ঠা ও কাজি মনোনয়ন, হিজরি সনের প্রবর্তন ও প্রচলন, পৃথক সেনা বিভাগ স্থাপন, রাষ্ট্রীয় কাজের সুবিধার্থে দপ্তর বা সেক্রেটারিয়েট স্থাপন, জরিপ প্রথার প্রচলন (ভূমি জরিপ স্থাপন), আদমশুমারি প্রথা প্রচলন, দেশকে প্রদেশে বিভক্তকরণ, অমুসলিম দেশের ব্যবসায়ীদের মদিনায় ব্যবসা করার প্রবেশাধিকার প্রদান, জেলখানা স্থাপন, রাত্রিকালে ঘুরে ঘুরে জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা পর্যবেক্ষণ, পুলিশ বিভাগ প্রতিষ্ঠা, রাস্তায় পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য এতিমখানা নির্মাণ, বিভিন্ন শহরে ও নগরে গেস্টহাউস বা অতিথিশালা স্থাপন, নিঃস্ব খ্রিস্টান ও ইহুদিদের জন্য ভাতা নির্ধারণ, শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা, রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবি জামাতের সঙ্গে পড়ার ব্যবস্থা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের রাষ্ট্রীয় বেতন-ভাতা নির্ধারণ, দাসপ্রথা উচ্ছেদের চেষ্টা, মসজিদসমূহে রাত্রিকালে আলোর ব্যবস্থা করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্য গুদামজাত করার প্রক্রিয়াও তিনি প্রচলন করেন ও রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নামে নির্দিষ্টহারে ভাতার প্রচলন করেন। এসব কাজের প্রেক্ষিতে তাকে আধুনিক শাসনব্যবস্থার রূপকার বলা হয়।
 
তিনি ১৪ সন্তানের জনক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জন ছেলে ও ৪ জন মেয়ে। হজরত উমর (রা.)-এর জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ছিল মাসিক মাত্র ১৩০ টাকার সরকারি ভাতা। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সামান্য আহার গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ পৃথিবীর মহান খলিফা হয়েও তিনি খেজুর পাতার মসজিদ ঘরে বসে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন এবং প্রহরীবিহীন সাদামাটা ঘরে দিনযাপন করতেন।

হজরত উমর (রা.) ৬২২ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কিছু পূর্বে মদিনায় হিজরত করেন। ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে হজরত উমর (রা.)-এর পরামর্শানুযায়ী আজানের ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়। তিনি বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে খায়বর যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির মর্যাদা লাভ করেন। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে তাবুক যুদ্ধে অর্ধেক সম্পত্তি দান করেন। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে হজরত আবু বকর (রা.) মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১০ বছর ছয় মাস চার দিন খেলাফতের পদ অলংকৃত করেন তিনি।

তার শাসনামলে ইরাকে বুআইব যুদ্ধে সেনাপতি মুসান্না জয়লাভ করেন, সেনাপতি সাদ কাদেসিয়ার যুদ্ধে জয়লাভ করেন, এ যুদ্ধে ইরানি সেনাপতি রুস্তম নিহত হন। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমুক যুদ্ধে ৪০ হাজার মুসলমান আড়াই লাখ রোমক সেনাকে পরাজিত করেন। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে বায়তুল মুকাদ্দাস অধিকার করেন। ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি আবদুল্লাহ স্পেন জয় করেন ও মিসরে আলেকজান্দ্রিয়া অধিকার করেন। ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে আজারবাইজান ও তাবারিস্তান বিজয় করেন। ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে আর্মেনিয়া বিজয়। পূর্ব দিকে কিরমান, মাকরান ও খুরামান মুসলমানদের অধিকারে আসে।

পারসিক খ্রিস্টান ক্রীতদাস আবু লুলু তার মনিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে হজরত উমর (রা.)-এর দরবারে বিচার প্রার্থনা করেন এবং বিচারে আবু লুলু অসন্তুষ্ট হয়ে নিতান্ত ব্যক্তিগত আক্রোশে হজরত উমর ইবনুল খাত্তাবকে ২৬ জিলহজ মদিনার মসজিদে নামাজ সমাপনান্তে ছুরিকাঘাত করে। পহেলা মহররম তিনি শাহাদতপ্রাপ্ত হন। তিনি দুনিয়ায় সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির অন্যতম একজন। মদিনায় হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজার পাশেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।



বাংলাদেশ সময়: ১৭২৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৫, ২০১৫
এমএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।