ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

ইসলাম

বিশ্ব ইজতেমার বয়ান

‘দুনিয়ার জীবন, পরীক্ষার জীবন’

ইসলাম ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৪৩০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২২, ২০১৭
‘দুনিয়ার জীবন, পরীক্ষার জীবন’ মাওলানা সাদ কান্ধলভি। ফাইল ছবি

ঢাকা: শনিবার (২১ জানুয়ারি) মাগরিবের পর বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে মুসল্লিদের উদ্দেশে দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন, মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব সম্পর্কে বয়ান করেছেন তাবলিগের কেন্দ্রীয় মারকাজ দিল্লি নিজামুদ্দিনের মুরুব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভি।

বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য সেই বয়ানের চুম্বুকাংশ তুলে ধরেছেন মুফতি মাহবুবুর রহমান নোমানি।

দ্বীনের কাজের জন্য নিজেকে আল্লাহর কাছে মঞ্জুর করানো সবচেয়ে বড় কামিয়াবি| আর এ জন্য যোগ্যতা নয় বরং কবুলিয়াতের (মান্যতার) গুণ অর্জন অপরিহার্য।

শয়তানের যোগ্যতার কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু সে আল্লাহর অভিশাপে পতিত হয়েছে স্বীয় যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকার দরুণ। মাটির তৈরি আদমকে সেজদার নির্দেশ ছিল প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার একটি পরীক্ষা মাত্র। সে পরীক্ষায় ইবলিশ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পরিণামে সে আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয়েছে। পক্ষান্তরে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে স্বীয় যোগ্যতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহর হুকুম বিনা বাক্যে মেনে নেন। সে সময় থেকেই বিনাশর্তে আল্লাহর হুকুম ও ইসলামের বিধান মেনে নেওয়ার মতো পরীক্ষার সূচনা হয়েছে।  

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন পয়গম্বরগণ। আসমানি পরীক্ষার মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে তারা হয়েছেন আল্লাহর প্রিয়পাত্র। আর মানবকুলের জন্য হয়েছেন অনুকরণীয় ও  শ্রদ্ধারপাত্র। নবীদের পরে পর্যায়ক্রমে সব মুমিন-মুসলমানের জীবনে আসে খোদায়ী পরীক্ষা। বস্তুত আল্লাহতায়ালা যার দ্বারা যত বেশি দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দেওয়ার ইচ্ছা করেন, তাকে তত বেশি পরীক্ষায় করে যাচাই করেন।  

হজরত ইবরাহিম (আ.) এর জীবনেও এসেছে কঠিন কঠিন পরীক্ষা। জন্ম নিয়েই তিনি দেখতে পান সমগ্র জাতি মূর্তি পূজায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সবার বিশ্বাস ও রীতিনীতির বিপরীত তাওহিদি র্ধম তাকে প্রদান করা হয়। এক আল্লাহর দিকে জাতিকে আহ্বান করার গুরু দায়িত্ব তার স্কন্ধে অর্পিত হয়। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি মানুষকে তাওহিদের দিকে দাওয়াত দিতে শুরু করেন। ফলে পুরো জাতি তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। সম্রাট নমরুদ তাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা সিদ্ধান্ত নেয়। এটা ছিল তার জীবনের প্রথম পরীক্ষা।  

দ্বিতীয় পরীক্ষা শুরু হয় আদরের সন্তান ইসমাইল ও প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হাজেরাকে মক্কার মরুভূমিতে রেখে আসার মাধ্যমে। এক অসহায় নারী ও তার দুধের সন্তানেকে জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে আসা কোনো পিতার পক্ষে কল্পনা করা যায়? কিন্তু ইবরাহিম (আ.) হাসিমুখেই তা পালন করেছিলেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটা মহান প্রভুর আরেক পরীক্ষা। তার জীবনে সবচেয়ে কঠিন ও মারাত্মক পরীক্ষা এসেছে কলিজার টুকরো, হৃদয়ের মানিক পুত্রধন ইসমাইলকে কোরবানির নির্দেশের মধ্য দিয়ে। এ পরীক্ষাতেও তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। কোনো প্রশ্ন নয়- প্রভু হে, এতো কঠিন নির্দেশ তুমি আমায় কেন দিলে? এতে তোমার কী হেকমত নিহিত? তিনি বরং ছেলের আনুগত্য ও বিশ্বাসের গভীরতা মাপতে চেয়েছেন। তাই জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘বৎস! আমি তোমাকে জবাই করার নির্দেশ পেয়েছি। এতে তোমার অভিমত কী? আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ইসমাইল (আ.) বললেন, আব্বা! আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করুন। আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। ’

পিতা-পুত্রের আনুগত্যের কী অনুপম দৃষ্টান্ত! তাদের এ আনুগত্যের কারণেই মিল্লাতে ইবরাহিমিকে সকল আসমানি ধর্মের ভিত্তিমূল করা হয়েছে।
ইজতেমার ময়দানে হেদায়েতি বয়ান শুনছেন মুসুল্লিরা
মানুষের আবেগ, ইচ্ছা ও চাহিদার বিপরীত বিধি-বিধান দিয়ে আল্লাহতায়ালা জগতের মানুষকে পরীক্ষা করেন। দ্বীনের যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মানুষের প্রবৃত্তি বিরোধী। কিন্তু প্রবৃত্তিকে মিটিয়ে দেওয়া, তার রুচি ও চাহিদাকে কোরবানি করে দেওয়ার নামই দ্বীন। এটাই ছিল নবীদের শিক্ষা। তারা মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য শিখিয়েছেন।

মদিনায় গমনের পর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেনন। একদিন জোহরের নামাজ আদায়কালে বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করার নির্দেশ আসে। নামাজের মধ্যেই তিনি সাহাবিদের নিয়ে কাবামুখি হন। কেউ-ই আপত্তি করেননি। কেউ বলেননি যে, নামাজের মধ্যখানে অন্যদিকে মুখ ফেরানোর কী দরকার ছিল? পরবর্তী নামাজ থেকে ফিরালেই তো হতো। কারণ সাহাবারা জানতেন- আনুগত্যের নামই দ্বীন।  

মদ হারাম সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূল (সা.) মদিনার অলি-গলিতে ঘোষণা করার জন্য একজন ঘোষক প্রেরণ করেন। ঘোষণা শোনার পর যার হাতে মদের পাত্র ছিল, তিনি হাত থেকে ফেলে দেন। এমন কি শরাবের পেয়ালা অনেকের ওষ্ঠ স্পর্শ করেছিল। তবুও গলধ:করণ করেননি। এই ছিল সাহাবাদের আনুগত্য।

মূলত নবী করিম (সা.) থেকে সাহাবারা আনুগত্যের পূর্ণ দীক্ষা লাভ করেছিলেন। এই আনুগত্যই দ্বীনের মূলভিত্তি।  

আনুগত্যের পাশাপাশি দাওয়াতের কাজের জন্য অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রয়োজন। এটি ছিল সব পয়গম্বরদের অনন্য গুণ। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ছিলেন ধৈর্যের মূর্তপ্রতীক।
ইজতেমার ময়দানে হেদায়েতি বয়ান শুনছেন মুসুল্লিরা
একবার তিনি যায়েদ ইবনে সানা নামক জনৈক ইহুদি আলেম থেকে নির্ধারিত মেয়াদে ঋণ করেছিলেন। কিন্তু সে ইহুদি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার তিন দিন পূর্বে এসে পাওনা মিটিয়ে দিতে বলে। সেই সঙ্গে নবীজির সাথে খুব খারাপ আচরণ করতে থাকে। হজরত ওমর (রা.) তা দেখে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন তার গর্দান উড়িয়ে দেই। নবীজি (সা.) বললেন, আমি তোমার থেকে এমন জবাব আশা করিনি হে ওমর! তুমি বরং আমাকে বলো, আপনি তার পাওনা পরিশোধ করে দিন। আর তাকে বলো- উত্তমভাবে পাওনা চাওয়ার জন্য। অতঃপর নবীজি (সা.) হজরত ওমর (রা.) কে ইহুদির পাওনা পরিশোধ করতে আদেশ করেন এবং বলে দিলেন, তাকে অতিরিক্ত কিছু দিয়ে দাও।

বিশ্বনবীর এমন সহনশীলতা ও উত্তম আচরণ দেখে ইহুদি বলল, আসলে আমি আপনাকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কারণ, আমাদের তাওরাত কিতাবে উল্লেখ আছে, আখেরি নবীর বৈশিষ্ট্য হবে- তার সাথে যত দুর্ব্যবহার করা হবে, ততই তার ধৈর্য ও সহনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। আমি এর বাস্তবতা পেয়েছি। তাই কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম।  

নবীরা কখনও প্রতিশোধ পরায়ণ ছিলেন না। বরং তারা ছিলেন ক্ষমার আধার। হজরত ইউসুফ (আ.) আপন ভাইদের হিংসাত্মক আচরণ ও র্দুব্যবহার ক্ষমা করে ঔদার্যের পরিচয় দিলেন। বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাকে মিসরের সিংহাসনে সমাসীন করেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং ধৈর্যধারণ করে, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। ’ –সূরা ইউসুফ: ৯০

সুতরাং যারা ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সমাজের কাজ করবেন, তাদেরকে তাকওয়া, ধৈর্য, ঔদার্য ও ক্ষমার গুণ অর্জন করতে হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন। আমিন।

বাংলাদেশ সময়: ১০২৮ ঘন্টা, জানুয়ারি ২২, ২০১৭
এমএইউ/এসএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।