ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আইন ও আদালত

সমালোচনা ও আদালত অবমাননা কি একই?

মোহাম্মদ আরজু | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩৫১ ঘণ্টা, মে ১০, ২০১৪
সমালোচনা ও আদালত অবমাননা কি একই? ছবি: প্রতীকী

নাগরিক তার মনের ভাব প্রকাশে মুক্ত থাকবে। রাষ্ট্রই নাগরিককে এই গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছে।

অন্যসব অধিকারের মত এই মুক্তির চূড়ান্ত সুরক্ষাদাতা হিসেবে আদালতের ভূমিকাই মূখ্য।

আর সব নাগরিক, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের তরফে এ স্বাধীনতাকে খাটো করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে আদালত প্রতিরক্ষা করবে, এটাই কথা।

আদালতের সমালোচনা করা আদালত অবজ্ঞার অপরাধের মধ্যে পড়েনা বলেই আধুনিক রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রে যে আইনের শাসন রয়েছে, তা বোঝার অন্যতম উপায় হচ্ছে, নাগরিক নির্বিবাদে আদালত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় যেকোনো প্রতিষ্ঠানের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারছেন।

অবশ্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও রাজনীতির অন্ধকার যুগে, আঠারো শতক তক আদালতের সমালোচনা খুব বড় অপরাধ ছিল। তখন আদালতের কোনো রায়ের সমালোচনা করাকেও আদালত অবজ্ঞা বলে সাব্যস্ত করা হতো। বলা হতো রায়ের সমালোচনা মানে হচ্ছে আদালতের নামে কলঙ্ক রটানো, স্কান্ডালাইজিং দি কোর্ট।

প্রথমত, আদালতের আদেশের লঙ্ঘন করা এবং দ্বিতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়ায় বাঁধা তৈরি করার পাশাপাশি তৃতীয়ত, আদালতের সমালোচনা করাকেও তখন আদালত অবজ্ঞা বলে সাব্যস্ত করতেন বিচারকরা। বিচারকরা তখন রাজতন্ত্র ও সরকারি আনুকূল্যেই নিয়োগ পেতেন। আর রাজতন্ত্র বিরোধী নাগরিক-সমালোচক-বক্তা-সাংবাদিকরাও কষে তাদের রায়ের সমালোচনা করতেন।

এখন অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে আদালতের রায়ের সমালোচনা দেদারছে করতে পারেন নাগরিকরা। সমালোচনামূলক বক্তব্য দেয়া বা নিবন্ধ লেখাতো রীতিমত প্রবন্ধ সাহিত্যের একটি প্রতিষ্ঠিত শাখায় পরিণত হয়েছে।

আদালতের বা বিচারকের বা রায়ের সমালোচনাকে আর আদালত অবজ্ঞা বলে ধরা হয় না। একইসঙ্গে ‘বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা’ বলতে কি বোঝায় তারও সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন আদালত অবজ্ঞার অভিযোগে ক্যালিফোর্নিয়া সুপ্রিম কোর্টের দেয়া শাস্তির রায় নাকচ করে আমেরিকার ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হুগো লাফাইয়েট ব্লাক ১৯৪১ সালে দেয়া রায়ে (Bridges v. Callifornia) বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করা মানে হচ্ছে বিচারকের উপস্থিতিতে আদালতে বিচারকাজ চলাকালে যদি এমনভাবে কোনো বক্তব্য দেয়া বা কিছু প্রকাশ করা-যাতেকরে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

তেমন ক্ষেত্র ছাড়া আদালত বা বিচারককে নিয়ে দেয়া সমালোচনামূলক কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনাকে ‘বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা’ বা আদালত অবজ্ঞা হিসেবে মনে করে শাস্তি দেয়া যাবে না।

অবশ্য ঔপনিবেশিক বৃটিশ আদালত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে এযাবত সাবেক উপনিবেশিত দেশগুলোর আদালতে দেখা গেছে, বিচারকরা মুখ ফুটে বলেন না যে আদালত বা বিচারক কিম্বা রায়ের সমালোচনা করার কারণে তারা আদালত অবজ্ঞার অভিযোগ আনছেন।

তারা বরং ‘বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত’ করার মত কিছু অভিযোগের ডাকনাম বলেন। একটা আগেই বলেছি, আদালতের নামে কলঙ্ক রটানো। এর বাইরে রয়েছে যেমন আদালতকে জনসমক্ষে অশ্রদ্ধা দেখানো, আদালতের প্রতি জনমানুষের আস্থা বিনষ্ট করা কিম্বা বিচারাধীন বিষয়ে আদালতকে প্রভাবিত করা প্রভৃতি।

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি হুগো এল ব্লাক তার রায়ে লিখছেন, ‘জনমানুষের সমালোচনা থেকে বিচারকদের রেহাই দিয়ে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনমানুষের আস্থা অর্জন করা যাবে এই ধারনাটি আমেরিকার জনমতকে ভুলভাবে বুঝেছে। নিজের মনের কথাটি বলা যেহেতু একটি আমেরিকান সৌভাগ্য ও অধিকার, ফলে এই কথাটি সব জনপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সবাই সবসময় যে সুরুচিপূর্ণভাবে বলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কিন্তু বিচারকদের সম্মান রক্ষার নামে-যতই সীমিত আকারে হোক না কেন- জোর করে লোকদের নিরব রাখলে খুব সম্ভবত তা শ্রদ্ধা বাড়ানোর চেয়ে জনমানুষের বিতৃষ্ণা, ক্ষোভ, সন্দেহ ও অবজ্ঞা অনেক বেশি মাত্রায় বাড়াবে। ’

স্বর্গত বিচারপতি হুগো ব্লাকের এই রায় কতটুকু ফলছে, তা প্রিয় পাঠক, বিচারের ভার আপনার ওপর। আপনিই বিচারক।  

বিচারাধীন বিষয়ে আদালতকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে আদালত অবমাননার যুক্তি প্রসঙ্গে বিচারপতি ব্লাক বলছেন, ‘বিচার বা ট্রায়াল শব্দটিই খোদ জানান দিচ্ছে যে ট্রায়াল মানে হলো প্রকাশ্য আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণাদি ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে সঠিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। ... আইনগত প্রক্রিয়ায় ট্রায়াল কোনো নির্বাচনের মত নয় যে তা সমাবেশ, রেডিও ও পত্রিকার মাধ্যমে জেতা যায়। ’ ফলে আদালতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আদালতকক্ষের বাইরে থেকে বক্তব্য বা লেখালিখি মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রভাবিত হবার শঙ্কা নেই।

উল্টো দিকে আমরা দেখছি বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি কর্তৃক উপনিবেশিত দেশগুলোতে আদালত দাবি করেন, যে তারা সমালোচনার উর্ধ্বে থাকবেন। এমনকি দেশে দেশে জাতীয় সংসদ ও আইনসভার যে ধরনের  দায়মুক্তি বা সমালোচনার থেকে সুরক্ষার সুযোগ নেই, তাও দাবি করেন উপনিবেশিত আদালতগুলো।

এই অবস্থানের বিপরীতে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট থেকে, এবং সম্প্রতি ইরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটসের থেকে প্রচুর রায়ের দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।  

মজার ব্যাপার হচ্ছে, উপনিবেশিত আদালতের এই অবস্থানে এখনো ইংলিশ আদালত সায় দেয়, যদিও সেই ইংল্যান্ডের আদালতই বলে যে, ইংল্যান্ডে আদালতের এই বিশেষ সুবিধা থাকবে না। এই সেদিনও আদালত অবজ্ঞার অভিযোগে দুই ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দিয়ে মরিশাসের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের রায়ে বৃটিশ প্রিভি কাউন্সিল (Gilbert Ahnee v. D.P.P ১৯৯৯) বলেন, ‘আদালতের নামে কলঙ্ক রটানোকে আদালত অবজ্ঞা বলে সাব্যস্ত করার বিষয়টি মরিশাসের মত ছোট্ট দ্বীপদেশের জন্য যথার্থ। ’

যা ইংল্যান্ডে এখন আর যথার্থ নয়, তা মরিশাসে যথার্থ কেন? ১৯৯৯ সালে এসেও বিচারক লর্ড সাহেবরা প্রায় একশ বছর আগের এক মামলার দৃষ্টান্ত টানেন। যেই মামলায় (Mc Leaod V. St. Aubyn 1899) প্রিভি কাউন্সিল বলেছিলেন, আদালতের নামে কলঙ্ক রটালে আদালত অবজ্ঞার অপরাধ করা হয় বলে যে বিষয়টির চর্চা ছিল তা এই দেশে (ইংল্যান্ডে) এখন আর চালু নেই। এটি মান্ধাতার আমলের চর্চা।

আদালতের প্রতি আক্রমণ, অসম্মান বা কলঙ্কজনক মতামত বিচারের ভার জনমানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েই আদালত সন্তুষ্ট। কিন্তু যেসব দেশে প্রধানত কালা আদমিদের (কালারড পিপল) বাস, সেসব ছোট ছোট উপনিবেশে আদালতের প্রতি সম্মান ও আদালতের মর্যাদা বজায় রাখতে এসব ক্ষেত্রে আদালত অবজ্ঞার অভিযোগ আনা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। ’

আইনের শাসন রয়েছে এমন দেশে সাধারণ নাগরিকরা তাদের চোখে ধরা পড়া প্রক্রিয়ার ভুলত্রুটি নিয়ে জোরসে সমালোচনা করেন আদালতের। এমনকি তাদের পত্রপত্রিকা ঘুরে দেখতে পাবেন, অনেক নিবন্ধকার এর আইনগত দিক তুলে ধরে সমালোচনাও করছেন। যেমন বৃটিশ দৈনিক দি গার্ডিয়ানের তো একটি ধারাবাহিক উদ্যোগই আছে ‘মিসক্যারিজ অব জাস্টিস’ নামে, যেখানে তারা আদালতের দেয়া রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে যদি দেখতে পায় যে নির্দোষ একটা লোককে শাস্তি দেয়া হয়েছে, সেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা পুরো-মানুষ, আলোকিত মানুষ। ফলে তাদের দেশে তারা এগুলোকে আদালত অবজ্ঞা মনে করে না।

কিন্তু, ধরুন, ক্যাসাব্ল্যাংকা চলচ্চিত্রে যেমন দেখেছেন, কোনো একটা ঘটনা ঘটলেই পুলিশকর্তা আদেশ দেন ‘রাউন্ড আপ দি ইউজুয়াল সাসপেক্টস’, হয়তো ঘটনা ঘটানেওয়ালা তার সামনেই বসে আছেন, আর সিপাইরা বাজার থেকে যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই ধরে নিয়ে আসছে। বা ধরুন যেখানে ক্যাসাব্লাংকার পরিচালক কিম্বা নাজি জার্মানি কিম্বা মরক্কোর কর্তৃপক্ষ চিন্তাও করতে পারেননি, এমনভাব তিনহাজার ইউজুয়াল সাসপেক্টসের বিরুদ্ধে একটি মামলা দেয়া হয়। সেখানে উচ্চ আদালতের বাইরে অন্যান্য আদালত যখন কোনো ইউজুয়াল সাসপেক্টকে জামিন দেয়ার চিন্তাও করেন না। সেখানে আপনি যদি মনে করেন, রাষ্ট্রের চরিত্র বা রাজনীতি নয়, আদালতই সর্বরোগের মহৌষধ হবে। তবে আপনার জন্যও সমবেদনা!

এমন পরিস্থিতিতে শুধু আপনাকে কেন, কাউকেই কিছু বলা চলে না। সেটা ওই ক্যাসাব্ল্যাংকা চলচ্চিত্রের মতই, রাষ্ট্র ও রাজনীতির অন্ধকার যুগ, ওই অন্ধকারে বলবার ঠিক জায়গাটা খুঁজে পেতে প্রচুর সাহসের দরকার।

ইউএস আর ইইউর রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের ভাব প্রকাশের মুক্তির অধিকার আদালত স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়নি, আসলে আদালতের দেয়ার কথাও নয়। ওসব দেশের নাগরিকরা দীর্ঘবছর ধরে, ধারাবাহিকভাবে যে উপায়ে রাজনীতির মাধ্যমে তাদের মুক্তি ও অধিকার আদায় করে নিয়েছে, সেসব বিষয়ে ইতিহাস সাক্ষী।

মোহাম্মদ আরজু: সাংবাদিক ও আইনি বিষয়াদির লেখক। ইমেইল: [email protected]

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa