ঢাকা, সোমবার, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জুন ২০২২, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

আইন ও আদালত

স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন ও টিআইবি’র প্রতিবেদন

মানবাধিকার ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪৪৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ৭, ২০১৪
স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন ও টিআইবি’র প্রতিবেদন

সুস্থ জনসম্পদই দেশের ভবিষ্যত। একটি সুস্থ জনসম্পদই পারে সমৃদ্ধশালী জাতি গঠন করতে।

তাই, স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত।

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের কিছু দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি এ খাতে সাফল্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাস্থ্যখাতে যে অগ্রগতি তার প্রধান চ্যালেঞ্জ সুশাসনের অভাব। স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। তাই এখানে সুশাসন ও শৃঙ্খলা অপরিহার্য। সেই সুশাসন ও শৃঙ্খলা আনতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য অধিকারকে পাশ কাটিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সুশাসন কোনোটিই সম্ভব না।

সব দেশেই স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।   স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও  ব্যবস্থাপনার জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক বরাদ্দের একটি বড় অংশ থাকে। কিন্তু টিআইবি প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের দেশে এ বরাদ্দ দিনদিন কমে যাচ্ছে। অবকাঠামো, জনবল ও এর গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হলে আর্থিক বরাদ্দের কোনো বিকল্প নেই। দেশের এই বিরাট জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে যথাযথ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকতে হবে।

সেই সাথে জনবলের বিষয়টিতো রয়েছেই। জনবলের মধ্যে চিকিৎসকের ঘাটতি এখানে প্রকট। চিকিৎসক ও রোগীর অনুপাতে বৈষম্য চিকিৎসা প্রাপ্তিতে বড় বাধা।

দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। সাধারণ চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। যারা আছেন তাদের রোগীর চাপ অনেক। ফলে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে হলে ১ মাস থেকে শুরু করে ৩-৪ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে করে বহুল জনপ্রিয় ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মার গেল’ কথাটির কথা মনে পড়ে।  

স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা প্রতিবেদনে বলা আছে তাও উদ্বেগজনক। তবে বিষয়টি নতুন নয়। তাই সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। চিকিৎসা খাতে নিয়োগের দুর্নীতি একটি মারাত্মক অপরাধ। কারণ, যোগ্য চিকিৎসক নিয়োগ না দিয়ে তার জায়গায় অযোগ্যদের নিয়োগ দিলে জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যত কি তা সহজেই অনুমান করা যায়। একই সাথে বদলী ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও যদি কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে সে বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের সাথে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও দালালদের কমিশনের সম্পর্ক আছে। প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সেবা নিতে আসা রোগীদের কাছে বিষয়টি ওপেন  সিক্রেট। কিন্তু তারপরও চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করতেই হয়। তবে, সবাই যে এমনটি করছে তাও নয়। অনেকেই হয়তো এর সাথে জড়িত না।

একজন হতদরিদ্র রোগী বা তাদের আত্মীয়স্বজন যারা সর্বস্ব বিক্রি করে জীবনের তাগিদে সেবা নিতে আসেন বিষয়টি তাদের জন্য মরার ওপর খারার ঘা। তাই কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা জরুরি। মানুষের জীবন নিয়ে এ চিকিৎসা বাণিজ্য বন্ধ করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিদ্যমান অনিয়মের জন্য বিত্তশালীরা বিদেশে যান। ব্যাংকক সিংগাপুরে যাদের যাওয়ার সমর্থ নেই তারা দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর দ্বারস্থ হন।

নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা গ্রামে থাকতে চান না। নিয়োগের প্রথম কার্যদিবস থেকেই তদবির করেন ঢাকা বা ঢাকার আশপাশের কোনো জেলায় আর না হয় নিজ জেলায় বদলীর। এ সমস্যার একটি সমাধান জরুরি। তাই গ্রামে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করতে শহরের ভালো চিকিৎসকদের প্রণোদনার মাধ্যমেও উৎসাহিত করা যায়।

স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের ব্যয় দশমিক ৮৪ শতাংশ যা দিন দিন কমছে। এটি আশঙ্কার কথা।  

দেশে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি রয়েছে যা ২০১১ সালে প্রণীত হয়। এছাড়া মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) (অর্ডিন্যান্স), মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস্‌ অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪সহ আরো কিছু আইন ও বিধি আছে। কিন্তু এ বিধিগুলো যুগোপযুগি নয়। কিছু কিছু সংশোধনের প্রয়োজন আছে।

চাকরির ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের কোনো জবাবদিহিতা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। আর চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনিয়ম ও গাফলতিতো আছেই।

আমাদের সংবিধানের স্বাস্থ্য অধিকারের কথা সরাসরি বলা নেই। তবে জীবনের অধিকার স্বাস্থ্য অধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়।

কিন্তু ভারতের  সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪২, ও ৪৭-এ স্বাস্থ্য অধিকারের কথা বলা আছে। যদিও এ অনুচ্ছেদ দুইটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়নি। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অধ্যায়ের অর্ন্তভূক্ত।

এছাড়া অনুচ্ছেদ ২১-এ জীবনের অধিকারের কথা বলা আছে। আইনের ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্য অধিকারকে জীবনের অধিকারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সেখানে একাধিক মামলাও আছে।

পাঞ্জাব বনাম. মহিন্দার সিং মামলায় স্বাস্থ্য অধিকারকে জীবনের অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আবার পরমানন্দ কাটারা বনাম. ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলার রায়ে বলা হয়েছে, Every doctor whether at a government hospital or otherwise has the professional obligation to extend his services with due expertise for protecting life”.

তাই জীবনের অধিকার স্বীকার করলে স্বাস্থ্যের অধিকারও স্বীকার করতে হয়। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির পরিমান ও মাত্রা যাই হোক, এর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। পরিমান ও মাত্রা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে তা দূর ও নিয়ন্ত্রণ করতে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪৪৬ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৭, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa