ঢাকা, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৯ শাওয়াল ১৪৪৫

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

ফিরে দেখা-২০১৪

বিশ্ব কাঁপানো রায়, স্তম্ভিত বিচারক

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯১৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪
বিশ্ব কাঁপানো রায়, স্তম্ভিত বিচারক ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম: দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রামে। সেই অস্ত্র চোরাচালানের মামলার দুনিয়া কাঁপানো রায় আসে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি।

রায় দেন তৎকালীন চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমান।

চাঞ্চল্যকর মামলায় সামরিক-বেসামরিক সর্বোচ্চ প্রভাবশালীদের শাস্তি দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় তুললেও রায়ের পর্যবেক্ষণে ঘটনার পরম্পরায় নিজের স্তম্ভিত হওয়ার কথাও তুলে ধরেছেন বিচারক।


দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচার চলাকালে বিচারকের বাসভবন লক্ষ্য করে হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। বাসার নিচে পেট্রল বোমাও রেখেছিল দুর্বৃত্তরা। বিচার বিলম্বিত করার মরিয়া কৌশল ছিল আসামিপক্ষের আইনজীবীদের। কিন্তু সব বাধা, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রায় ঘোষণার পর বিশ্ব মিডিয়ায় সেই রায়ের পাশাপাশি বিচারকের নামটিও উঠে আসে সগর্বে। সেই রায় দেশের পাশাপাশি আর্ন্তজাতিক অঙ্গণেও তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।

দশ ট্রাক মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে রায় পর্যন্ত পৌঁছাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ও তৎকালিন মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ।

বাংলানিউজকে তিনি বলেন, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা কোন সাধারণ মামলা নয়। একটি স্বাধীন দেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আরেকটি স্বাধীন দেশের বিদ্রোহিদের কাছে। আবার এ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিল সরকারের দু’জন মন্ত্রী, ডিজিএফআই-এনএসআই’র মত রাষ্ট্রীয় সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ মামলার বিচার শেষ করা সহজ কথা নয়। বিচারকের দৃঢ়তা, সাংবাদিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকায় এবং আইনজীবীদের সহযোগিতায় মামলাটির বিচার হয়েছে।

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল জেটিঘাটে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে।

অস্ত্র আটকের ঘটনায় দায়ের হওয়া চোরাচালান মামলায় সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদন্ড দেন আদালত। একই রায়ে তাদের পাঁচ লক্ষ টাকা করে জরিমানাও করা হয়।

একই ঘটনায় দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় একই আসামীদের ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৯ (সি) ও ১৯ (এফ) ধারায় সাত বছর কারাদন্ড দেন বিচারক।

এছাড়া অস্ত্র চোরাচালান মামলায় ৩৮ জন আসামী বেকসুর খালাস পান। আর অস্ত্র আটক মামলায় ৩৬ জন বেকসুর খালাস পান।

সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা হলেন, জামায়াতের আমির ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা’র সামরিক কমাণ্ডার পরেশ বড়ুয়া, এনএসআই’র সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই’র সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, ডিজিএফআই’র সাবেক পরিচালক (নিরাপত্তা) অবসরপ্রাপ্ত উইং কমাণ্ডার সাহাবুদ্দিন আহমেদ, এনএসআই’র সাবেক উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, রায়ে আদালত এনএসআই’র সাবেক মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, রায়ে আদালত সিইউএফএল’র সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহসিন উদ্দিন তালুকদার,  সিইউএফএল’র সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, রায়ে আদালত চোরাচালানি হিসেবে অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান, অস্ত্র খালাসের জন্য শ্রমিক সরবরাহকারী দীন মোহাম্মদ ও ট্রলার মালিক হাজী আবদুস সোবহান।

৩০ জানুয়ারি রায় ঘোষণা হলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ৪ ফেব্রুয়ারি। দু’টি মামলায় আড়াই’শ পৃষ্ঠা করে মোট ৫’শ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আট পৃষ্ঠা করে ১৬ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

পর্যবেক্ষণের শুরুতে আদালত বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে শক্তিশালী করতে দশ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাংলাদেশের দু’টি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা এতে সহযোগিতা করেছিলেন। বিষয়টিতে আদালত বিস্মিত হয়েছেন।

‘খালেদার নীরবতা রহস্যজনক’
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছেন, সাক্ষী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি ডিজিএফআই-এর প্রধান হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে (বেগম খালেদা জিয়া) এ মামলা সংক্রান্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটকের ঘটনা টেলিফোনে অবহিত করলে তিনি কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঘটনাটি অবগত আছেন এবং একটি কমিটি করে দেবেন বলে জানান। এতবড় একটি ঘটনার বিষয়ে অবহিত হয়ে কোনরূপ কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে তৎকালীন সরকার প্রধানের নীরব ভূমিকা পালনও রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

‘বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত প্রতিরক্ষা বাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ডিজিএফআই ও এনএসআই’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের ‘বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছেন, বিপথগামী এসব সামরিক কর্মকর্তা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পররাষ্ট্র নীতিকে কলংকিত করেছেন, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সুনাম ও সুখ্যাতির প্রতি তারা ভ্রুক্ষেপ করেননি। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অব্যাহত সুসম্পর্ক বিনষ্টের দুরভিসন্ধি ছিল তাদের। তারা নিজ দেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে গোটা জাতিকে ধ্বংস করার করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বলেও পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছেন আদালত।

‘সরকারের মদদ ছাড়া এত অস্ত্র আনা সম্ভব নয়’
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, কোনরূপ সাক্ষ্য প্রমাণ, বিশ্লেষণ ছাড়াই যে কোন লোকই এটা বিশ্বাস করবে যে, এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ কোনরূপ বাধাবিঘ্ন ছাড়া ভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে সরকারী মদদ ব্যতীত আনয়ণ করা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। এই মামলায় সাক্ষ্য প্রমাণে উদঘাটিত হয়েছে যে, তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সাথে হাত মিলিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ঘটনা সংঘটিত করেছেন। এ ধরনের একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, এনএসআই এবং ডিজিএফআই-এর মত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব ওমর ফারুকের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংগৃহীত সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনাপূর্বক আসামী হাফিজুর রহমান, দীন মোহাম্মদ ও হাজী আবদুস সোবহান মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। বিস্ময়করভাবে অন্যান্য আসামীদের কথা বাদ দিলেও ঘটনার মূল হোতা উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার নামটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোন ব্যক্তির কাছে এটা বিশ্বাসযোগ্য হবেনা যে, মাত্র তিনজন ব্যক্তি চীনের তৈরি কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের মামলার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশের বাইরে থেকে জাহাজে করে সেন্টমার্টিন এল‍াকায় বিদেশি জলসীমায় এনে সেখান থেকে নৌবাহিনী-কোস্টগার্ডসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সিইউএফএল জেটিঘাটে এনে ট্রাকে তুলতে সক্ষম হবে।

‘ছোটখাট ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা সম্ভব’
রায় ঘোষণার সময় সারসংক্ষেপে বিচারক বলেন, বাংলাদেশে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার মত আর কোন মামলা কখনো হয়নি। বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের মামলা হয়েছে বলে কোন তথ্য আমরা এখনও পাইনি। যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে তা দিয়ে ছোটখাট একটি ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা যেতে পারত।

সারসংক্ষেপে বিচারক আরও বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ করে কারও প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণের কোন যুক্তি আমি পাইনি। একটি-দু’টি অস্ত্র পাওয়া গেলেও আমরা সাজা দিই। কিন্তু এতবড় অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা একই ধারার চিন্তা করা কারও উচিৎ হবেনা।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে আলোচিত বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান ২০১৪ সালের ১২ জুলাই অবসরে যান।

বাংলাদেশ সময়: ১৯১৮ ডিসেম্বর ৩০,২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।