ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩০, ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৫

কৃষি

শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত চারা পল্লীর চাষিরা

কাওছার উল্লাহ আরিফ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬৩৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৩
শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত চারা পল্লীর চাষিরা

বগুড়া: ঋতুচক্রে শরৎ চলমান। বছরের এ সময়টায় রবি মৌসুমের শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত বগুড়ার চারা পল্লীর চাষিরা।

বীজতলায় সবজির চারা তৈরি, বিক্রি ও পরিচর্যা করতে ব্যস্ত নার্সারিগুলো। অন্যদিকে জমি ফাঁকা হতেই শীতকালীন সবজি চাষে প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাষিরা।

বগুড়ার শাজাহানপুর ও সদর উপজেলার শাহানগর, কামারপাড়া, মহাস্থানসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে নতুন নতুন সবজির বীজতলা নিয়ে চাষিদের এমন কর্মব্যস্ততা দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চাষিরা কাকডাকা ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছেন বীজতলা তৈরির জন্য। কাঁচি, কোদাল, পাচুনসহ (স্থানীয় ভাষায়) আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি নিয়ে নেমে পড়ছেন জমিতে। কেউ কেউ প্রস্তুতকৃত জমিতে রোপণ করছেন বীজ। অনেকেই হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ব্যস্ত রোপনকৃত বীজতলা পরিচর্যায়। বীজতলা প্রস্তুতের পর জমির মাঝ বরাবর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ছোট ছোট আইল তৈরি করে বীজ রোপণ করা হয়েছে। এরপর বাঁশের তৈরি ‘বেতি’গুলো রিংয়ের মতো বসিয়ে ওপর পলিথিন দিয়ে পুরো বীজতলা মুড়িয়ে দেওয়া হয়।

পলিথিন মোড়ানো জমিতে চাষ করা হচ্ছে সবজির চারা। শুধু পলিথিন টাঙানো জমিই নয়; বিশেষ ধরনের নেটে ঘেরা রয়েছে অনেক জমি। প্রতিটি জমিতেই পুরুষের সঙ্গে নারীও কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জমিতে প্লাস্টিকের ট্রেতে নারকেলের ছোবড়া বিছিয়ে তাতে জৈব সার ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে সব ধরনের সবজি চারা।  

শাজাহানপুর উপজেলার চুপিনগর ও খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের আড়াই শতাধিক নার্সারিতে রোগবালাইমুক্ত, উচ্চ ফলনশীল জাতের সবজি চারা তৈরি হচ্ছে। চারা তৈরির এই পল্লী থেকে উৎপাদিত সবজি চারা দেশের প্রায় ২৫টি জেলায় সরবরাহ করা হয় প্রতি মৌসুমে।

নার্সারির মালিক ও স্থানীয়রা জানান, শাজাহানপুর উপজেলার শাহনগর, চক চুপিনগর, দিহিগ্রাম, বড়পাথার ও বৃ-কুষ্টিয়াসহ বেশকিছু গ্রামজুড়ে গড়ে উঠেছে নার্সারি। এসব নার্সারিতে কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার কয়েক হাজার মানুষের। অভাব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকেই। ওই পল্লীতে ঘিরে গড়ে উঠেছে সার, বীজ, কীটনাশকের দোকান। দূরদূরান্ত থেকে চারা কিনতে আসা মানুষের জন্য গড়ে উঠেছে খাবারের হোটেল। চারা পরিবহণে কর্মসংস্থান হয়েছে রিকশা-ভ্যান, অটোরিকশা চালকদের।

দুলাল নার্সারির মালিক মো. দুলালা মিয়া বাংলানিউজকে জানান, বছরজুড়েই তারা সবজি চারা উৎপাদন করলেও সাধারণত প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সবজির চারা বেশি উৎপাদিত হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখান থেকে চারা নিয়ে যান। মুঠোফোনে চাহিদা পাঠিয়েও কুরিয়ারের মাধ্যমে এবং বিশেষ প্যাকেটে যাত্রীবাহী বাসে অনেকে চারা সংগ্রহ করেন। অনেকে স্ব-শরীরে এসে দেখেশুনে চারা সংগ্রহ করেন।  

তিনি আরও জানান, এখন চারার মধ্যে সিংহভাগই ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, বেগুন ও টমেটোর চারা। এছাড়াও বিজলি, বিজলি প্লাস, গ্রিন সুপার, গ্রিন মাস্টার, এনএস-১৭০১, লুবাসহ নানা জাতের হাইব্রিড মরিচের চারা উৎপাদন করা হয়েছে নার্সারিগুলোতে। এসব নার্সারিতে পেঁয়াজ, রসুন, গাজর, পটোল, শিম, বরবটি, পালং শাক, লাল শাক, ঝিঙা, করোলাসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারাও গাছ পাওয়া যায়।

নার্সারি মালিক সামছুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, বীজতলায় গরম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পলিথিন দিয়ে ঘরের মতো তৈরি করা হয়েছে। মাঝে মাঝে ঢেকে দেওয়া পলিথিনগুলো সামান্য উঠিয়ে এক পাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। যেন বাইরের বাতাস বীজতলায় প্রবেশ করতে পারে। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে প্রথম এক সপ্তাহের মতো এ কার্যক্রম চলে। বীজ গজিয়ে ওঠার পর চাষিরা সেই পলিথিনগুলো সরিয়ে ফেলেন। এরপর বিক্রির আগ পর্যন্ত নিয়মিত চলে পরিচর্যা। পুরুষদের পাশাপাশি এ কাজে নারীরাও সহায়তা করে থাকেন।  

চাষি হান্নান আলী জানান, বছরের ছয় মাস নাসারিতে ব্যবসা চলে। শাজাহানপুর উপজেলায় কমপক্ষে দুই শতাধিকেরও বেশি সবজি নার্সারি রয়েছে। এসব নার্সারিতে নানান জাতের সবজি বীজ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে প্রতি এক হাজার পিস ফুলকপির চারা এক হাজার থেকে ১২০০, বাঁধাকপির চারা এক হাজার থেকে ১২০০, মরিচের চারা ৮০০ থেকে এক হাজার, টমেটোর চারা ৭০০ থেকে এক হাজার, বেগুনের চারা ৮০০ টাকায় বেচা-বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, বগুড়ার শাজাহানপুর, শিবগঞ্জ, শেরপুর, সদর, গাবতলী ও কাহালু উপজেলায় চাষিরা নার্সারি আকারে নানা জাতের সবজি বীজতলা তৈরি করেছেন। প্রতি বছরের মতোই এবারও শাজাহানপুর উপজেলার শাহনগর এলাকায় ব্যাপক চারা উৎপাদন করা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন চারা পাওয়ায় প্রতি বছর এখানকার চারার চাহিদা বাড়ছে।

তিনি আরও জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ায় চারা উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য পলিথিনের ছাউনিতে নার্সারির বেডগুলো ঢেকে দেওয়া হয়। চারা উৎপাদনে সম্পৃক্ত নার্সারি মালিকদের কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি ওই এলাকায় নিয়মিত মাঠ দিবস পালন করা হয় বলেও জানান তিনি।

গত বছর রবি মৌসুমে বগুড়া জেলায় প্রায় ১২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ বছর কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে মন্তব্য এ কৃষি কর্মকর্তার।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৩৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৩
কেইউএ/এসএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।