ঢাকা, সোমবার, ১২ আশ্বিন ১৪২৮, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮ সফর ১৪৪৩

কৃষি

চোখে অন্ধকার দেখছেন খামারিরা

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮০৮ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
চোখে অন্ধকার দেখছেন খামারিরা ছবি: বাংলানিউজ

ফেনী: নবীন খামারি আরাফাত খান। ফেনী শহরের পাঠান বাড়ি এলাকায় হাসিনা অ্যাগ্রো নামের একটি খামার রয়েছে তার।

আসন্ন ইদুল আজহাকে ঘিরে তার খামারে রয়েছে ২৫টির গরু। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ করেছেন ২৫ লাখ টাকার মত। ঈদের আর বেশি দিন বাকি না থাকলেও চলমান ‘লকডাউনের’ কারণে পশুর হাট এখনও বসছেনা। শেষ পর্যন্ত কী হতে চলেছে এ নিয়ে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

একই ধরনের শঙ্কায় ভূগছেন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার রাবেয়া বেগম। আসন্ন ইদুল আজহায় ২০টি গরু বিক্রির জন্য প্রস্তত করেছেন তিনি। কিন্তু ‘লকডাউনের’ কারণে এখনও বসছেনা পশুর হাটগুলো, আদৌ বসবে কিনা-এ নিয়ে চিন্তায় তার কপালেও ভাঁজ পড়েছে।

শুধু ফেনীর আরাফাত খান কিংবা লক্ষ্মীপুরের রাবেয়া খাতুন একা নয়- নিজেদের লালিত-পালিত ও ক্রয়কৃত পশু বিক্রি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এমন আরো অনেক খামারি। লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ- কী হবে এটা ভেবে অনেকেই চোখে অন্ধকার দেখছেন। ‘লকডাউনের’ কারণে গরু বাজার ও দাম নিয়ে শঙ্কিত আছেন তারা।

প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য মতে চলতি বছর ফেনীতে কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৭২ হাজার। অপরদিকে এ জেলায় লালনপালন করা হচ্ছে ৮০ হাজার ৮৬৫টি গবাদিপশু। প্রতিবছর কোরবানি ঈদ এলে শহর-নগর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লার সব জায়গায় বসে পশুরহাট। কিন্তু করোনার এই মহামারিতে পশু ক্রয়-বিক্রয় কীভাবে হবে এ নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে খামারি ও ক্রেতা—দুই পক্ষের মধ্যেই।

খামারিদের শঙ্কা, করোনার কারণে এ বছর তাদের লোকসান গুনতে হবে। এর মধ্যে চোরাইপথে ভারতীয় গরু এলে তাদের লোকসান আরও বাড়বে। ফেনীর স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তপথ দিয়ে পশু ঢুকছে প্রতিনিয়ত। একই ধরণের অভিযোগ রয়েছে লক্ষ্মীপুরের খামারিদেরও।

ফেনী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, আসন্ন ইদুল আজহা উপলক্ষে প্রায় ৭২ হাজার কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে ৮০ হাজার ৮৬৫টি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফলে ফেনীতে এবার কোরবানির পশু সংকট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এ ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে এক বা একাধিক কোরবানির পশু লালনপালন করছেন। এর সংখ্যাও ২০ হাজারের বেশি।



জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য মতে, ফেনী সদর উপজেলায় ২১ হাজার ৩২২, দাগনভূঁঞায় ৮ হাজার ৮৩০, ছাগলনাইয়ায় ১৮ হাজার ৭২৫, সোনাগাজীতে ১৭ হাজার ৫০৫, ফুলগাজীতে ৫ হাজার ২০৬ এবং পরশুরামে ৮ হাজার ২২৭টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ফেনীর পরশুরাম পৌরসভার মেয়র নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সাজেল একজন সফল খামারি। তিনি চৌধুরী অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক। তিনি বলেন, এ বছর ওজন করে পশু বিক্রি করারও প্রস্তুতি আছে। গত ২০ বছরের চিত্র আর চলতি বছরের চিত্রে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস।

‘এ বছর মার্চ মাস থেকে করোনায় দেশের সবগুলো গরুর বাজার বন্ধ ছিল। এ জন্য আমরা খামারিরা গরু কিনতে পারিনি। প্রত্যেক বছর ৫০০ থেকে ৬০০ গরু কোরবানির ঈদের জন্য প্রস্তুত করি। কিন্তু এ বছর আমি ৩০০ গরুর বেশি নিতে পারিনি। ’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বছর কোরবানি পশুর বাজার কোন পরিসরে হবে, আমরা এখনো নির্দেশনা পাইনি’।

তিন দিকে সীমান্তবেষ্টিত পরশুরাম উপজেলা। প্রতিবছরই কোরবানি ঈদ সামনে রেখে চোরাইপথে প্রচুর গরু বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এতে দাম কমে গিয়ে বাংলাদেশের ছোট-বড় গরু খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ভারতীয় গরুর প্রবেশ প্রসঙ্গে সাজেল চৌধুরী বলেন, পরশুরামের বক্স মাহমুদের খাজুরিয়া ও মির্জানগর সীমান্ত দিয়ে প্রতি রাতে কয়েক শতাধিক গরু প্রবেশ করে। এভাবে যদি গরু ঢোকে, তাহলে দেশি খামারিদের সব কষ্ট, শ্রম ও পুঁজি বৃথা যাবে।

সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবির ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)। ফেনী ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রহিম জানান, ‘কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্তে গরু চোরাচালান রোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবির সদস্যরা, বাড়ানো হয়েছে নজরদারি’।

কোরবানির পশু লালনপালনে নিয়মিত খামারিদের সহযোগিতা করছে প্রাণিসম্পদ অফিস। ফেনী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নাজমুল হক জানান, ‘কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে নিয়মিত খামার পরিদর্শন, খামারিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও যাবতীয় সহযোগিতা করা হয়ে থাকে’।

ফেনীর জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান বলেন, অবৈধপথে ভারতীয় পশু আসা বন্ধ করার জন্য বিজিবি ও পুলিশকে টহল বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফেনী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আনিসুর রহমান জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন গরু বাজার মোটামুটি জনপ্রিয় হলেও ফেনীতে অনলাইনে এখনো তেমন বেচাবিক্রি হয় না। তবে গত বছর থেকে করোনার মধ্যে অনলাইনে গরু বিক্রির জন্য জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা ক্রেতা বিক্রেতাদের অনুপ্রাণিত করে আসছেন। পশু বিক্রয়ের জন্য চাষিরা নিজের ফেসবুক ছাড়াও জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ফেসবুক পেইজে পশুর ছবি, ভিডিও, বিবরণ ও দামসহ প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করে পোস্ট দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

বাংলাদেশ সময়: ০৮০৫ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০২১
এসএইচডি/কেএআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa