ঢাকা, শুক্রবার, ২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৫ শাওয়াল ১৪৪৬

বাংলানিউজ স্পেশাল

অর্ধেক সময় পেরোলেও নিবন্ধন পেতে ইসির আহ্বানে সাড়া নেই দলগুলোর

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করসেপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭১১ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
অর্ধেক সময় পেরোলেও নিবন্ধন পেতে ইসির আহ্বানে সাড়া নেই দলগুলোর

ঢাকা: এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিবন্ধন দেওয়ার লক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নেওয়া কার্যক্রমে দলগুলোর কোনো সাড়া নেই। সংস্থাটির বেঁধে দেওয়া সময়ের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো দল আবেদন করেনি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, আইন অনুযায়ী প্রতি সংসদ নির্বাচনের আগে নিজ দলের প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিতে নিবন্ধন নিতে আগ্রহীদের আবেদন আহ্বান করে কমিশন। সে ধারাবাহিকতায় এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেও সামনে রেখে গত ১০ মার্চ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে আবেদনের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ২০ এপ্রিল পর্যন্ত।

জানা গেছে, ইসির বেঁধে দেওয়ার সময়ের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো দল আইনানুগভাবে আবেদন করেনি। একটি দল আবেদন করলেও সেটি যথাযথ হয়নি। তাই সেটিকেও আমলেও নেওয়া হচ্ছে না। তবে ঈদের পর অনেকেই আবেদন করতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।

ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১৫ বছরের যেসব দল নিবন্ধন পায়নি, তারাও এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে নতুন দলগুলোরও কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাদের মতে, নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি জারি করার পর নতুনদের অনেকেই নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানতে ইসিতে আসেন। এবার সে প্রবণতাও এখনো দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে শেষ সময়ে এসে আবেদনের হিড়িক পড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

নতুন দলের মধ্যে দেশে এখন আলোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া এ দলটি ব্যতীত অন্য কোনো দল গঠনের খবরও এখন পর্যন্ত কোথাও আসেনি। এনসিপি’র নেতারা এলাকায় গিয়ে প্রাক নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জনসংযোগ করলেও দল গঠনের আইনি কাঠামো দাঁড় করানোর উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ছে না। যদিও দলটির শীর্ষ নেতারা নিবন্ধন পাওয়ার দিকেই এখন মনযোগ দেওয়ার কথা বলছেন।

ইসি কর্মকর্তারা যা বলছেন

ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেলেও দলগুলোর সাড়া না পাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে সাংগঠনিক অবস্থা। কেননা, নিবন্ধন পেতে হলে একটি দলকে যে শর্ত পূরণ করতে হয়, সে প্রস্তুতি হয়তো কারোরই এখন নেই। সে দিকগুলোই হয়তো তারা গুছিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে বাছাইয়ে যেন বাদ না পড়ে সেজন্য হয়তো আটঘাট বেঁধেই তারা আবেদন করতে চাচ্ছেন। কেননা, অতীতে অনেকেই আবেদন করে প্রাথমিক বাছাইয়েই বাদ পড়েন। এছাড়া বর্তমান নিবন্ধন পদ্ধতি কঠোর হওয়ায় তা সহজ করার আলোচনা বিভিন্ন মহলে। এক্ষেত্রে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে সে প্রক্রিয়া সহজ হয় কি-না, সেটাও হয়তো অনেক দল পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

নিবন্ধনের পদ্ধতি

গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এ নতুন দল নিবন্ধনের জন্য তিনটি প্রধান শর্তের যে কোনো একটি পূরণ করতে হয়।

(ক) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যে কোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভের সমর্থনে প্রামাণিক দলিল; অথবা

(খ) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যে কোনো একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোট সংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট লাভের সমর্থনে কমিশন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র; অথবা

(গ) দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ, সেটি যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দপ্তর, অন্যূন এক তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা দপ্তর এবং অন্যূন একশটি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দপ্তর এবং ওই রকম প্রতি উপজেলায় বা থানায় অন্যূন দুইশত ভোটার সদস্য হিসাবে দলের তালিকাভুক্ত থাকার সমর্থনে প্রামাণিক দলিল।

এছাড়া দলের প্রতিটি কমিটি নির্বাচিত, সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য পদ রাখা, বিদেশি শাখা না রাখার মতো শর্তগুলোও রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ জমা দিয়ে ইসি নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়।

আইনি কাঠামোর বাইরে আবেদন

গত ২৪ মার্চ ‘আওয়ামী লীগ’ নামের একটি দল গঠন করার ঘোষণা দিয়ে উজ্জল রায় নামের এক ব্যক্তি নিবন্ধন পেতে ইসিতে আবেদন করেছেন। তবে তিনি কোনো শর্ত পূরণ করতে যেমন পারেননি, তেমনি ব্যাংকে ইসি সচিব বরাবর নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থও জমা দেননি। তাই তার আবেদনটি গণনার মধ্যেই রাখছে না সংস্থাটি।

দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে নতুন এ দলের প্রধান উজ্জল রায়ের বাড়ি। বাবার নাম নরেশ চন্দ্র রায়, মায়ের নাম পারুল রায়।

নিবন্ধন চেয়ে ইসি সচিবের কাছে করা আবেদনে উজ্জল রায় উল্লেখ করেন, দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন হয়েছে গত ২৪ মার্চ, এ কমিটির মেয়াদ শেষ আগামী ২০ এপ্রিল। প্রতীক হিসেবে নৌকা বা ইলিশ দাবি করেছেন৷ তিনি নিজেকে সভাপতি পদে আসীন হিসেবে আবেদনে উল্লেখ করলেও তার দলে আর কোনো সদস্য নেই। দলের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ উল্লেখ করলেও তার আবেদনে কোনো সড়ক ও বাড়ির নম্বর নেই।

উজ্জল রায় বলেন, ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৫ আসনে আমি ভোট করতে চাই। সাম্প্রদায়িক সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি৷ তিনি যদি দেখা করতেন, তাহলে এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান হতো। আর এখন তো তিনিই নেই। তাই আবেদন করেছি।

আবেদনে তিনি নিবন্ধনের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানকে (ফিজার) সপ্তম সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন।

এনসিপি কী বলছে

জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা এরই মধ্যে নিজ নিজ জেলায় জনসংযোগের মতো কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া তারা মাঠ পর্যায়ে নিবন্ধনের শর্তপূরণের লক্ষে কার্যক্রমও শুরু করে দিয়েছেন। এরই মধ্যে তারা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে তারা ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি দেওয়া লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন।

এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এরই মধ্যে গণমাধ্যমকে বলেছেন, তারা এখন নিবন্ধনের শর্ত পূরণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম মার্চেই শুরু করা হয়েছে। ঈদের পর পুরোদমে সম্পন্ন করা হবে।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ

ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। ঐকমত্য কমিশনেও বিষয়টি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশে বলেছে, নতুন দল নিবন্ধনের শর্ত শিথিলের লক্ষে বিদ্যমান এক তৃতীয়াংশ জেলা কমিটির পরিবর্তে ১০ শতাংশ জেলা এবং ১০০ উপজেলার পরিবর্তে ৫ শতাংশ উপজেলা/থানায় দলের অফিস এবং ন্যূনতম ৫,০০০ সদস্য থাকার বিধান করতে হবে।

ইসির কী অবস্থান

নিবন্ধনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী নেওয়াজ বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া মেনে এখনো কোনো দল আবেদন করেনি। আওয়ামী লীগ নামে একটি দল আবেদন করলেও ব্যাংকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থা জমা করেননি। এছাড়া অন্যান্য শর্তও পূরণ করেনি।

সংস্কার প্রস্তাবেব ভিত্তিতে নিবন্ধনের শর্ত সহজ করার জন্য আইন সংশোধন হলে ইসির ভূমিকা কী হবে, এমন বিষয় উত্থাপন করা হলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নিবন্ধন পেতে চাইলে আইনে এখন যে শর্ত আছে তা পূরণ করেই ২০ এপ্রিলের মধ্যে আবেদন করতে হবে। এরপর তা পর্যালোচনা করে নিবন্ধনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

ইসি কর্মকর্তারা যদিও বলছেন, অতীতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার সময় বাড়ানোর নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২২ সালের ২৬ মে আবেদন আহ্বান করে সে বছরের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছিল তৎকালীন কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সিইসিকে সময় বাড়ানোর অনুরোধ করলে দুই মাস সময় বাড়ানো হয়েছিল। তবে এবার যেহেতু ডিসেম্বরকে টার্গেট করে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি, তাই সব কার্যক্রম আগস্টের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সংস্থাটি। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এ বিষয়ে বলেন, ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে হলে অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। আর আগস্টের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

নিবন্ধিত দল

ইসিতে বর্তমানে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪৯টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবি পার্টি, নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ঐক্য এবং গণসংহতি আন্দোলন নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দলগুলোর প্রায় প্রতিটিই আবেদনের পাঁচ থেকে ছয় বছর পর আদালতের আদেশে নিবন্ধন পেয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালেও শর্ত পূরণ না করার কারণ দেখিয়ে ৭৬টি দলের কোনোটিকেই নিবন্ধন দেয়নি ইসি। পরে ২০১৯ সালে ববি হাজ্জাজের দল এনডিএম আদালতের আদেশে নিবন্ধন পেয়েছিল।

নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রথা চালু হয়। এ পর্যন্ত ৫৪টি দল ইসির নিবন্ধন পেলেও পরবর্তীতে শর্ত পূরণ, শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থতা এবং আদালতের নির্দেশে পাঁচটি দলের নিবন্ধন বাতিল করে ইসি। দলগুলো হলো- জামায়াতে ইসলামী, ফ্রিডম পার্টি, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, পিডিপি ও জাগপা।

বাংলাদেশ সময়: ০৭১০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
ইইউডি/জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।