ঢাকা, সোমবার, ৯ কার্তিক ১৪২৮, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

সুড়ঙ্গপথে লুটের মালামাল এনে রাখতো পর্তুগিজ জলদস্যুরা 

সোহেল সরওয়ার, সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১১০৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১
সুড়ঙ্গপথে লুটের মালামাল এনে রাখতো পর্তুগিজ জলদস্যুরা  ছবি: বাংলানিউজ

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন ‘দারুল আদালত’। বয়স সাড়ে তিনশ’ বছরেরও বেশি।

এটি নির্মাণ করেছিলেন পর্তুগিজরা। তাই পর্তুগিজ ভবন নামেও পরিচিত। একসময় দারুল আদালত এলাকায় ছিল বিচারপ্রার্থীদের আনাগোনা। কালের বিবর্তনে ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। ঝোপঝাড়ে ঢাকা ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে গেছে।

পাহাড়ের ওপর চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের একপাশে স্থাপিত এই ভবনকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

সরেজমিন দেখা গেছে, ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত প্রায় পৌনে এক একর জায়গায় ইট দিয়ে তৈরি গোলাকার দ্বিতল ভবনটির দুইদিকে দুটি স্তম্ভ রয়েছে। ভবনটিতে একটি প্যাঁচানো সিঁড়িসহ তিনটি সিঁড়ি, ও ২০টি কক্ষ।  দোতলা ও নিচতলার প্রতিটিতে মাঝখানে একটি কেন্দ্রীয় কক্ষ আছে, যার চারপাশে অন্য কক্ষগুলোর অবস্থান। লোহার ভিত্তি ছাড়াই ১০ ইঞ্চি প্রস্থ দেয়াল। ভবনের ওপর দেখা গেছে কামান বসানোর চিহ্ন।  

ছাদের ওপর দুটি ছোট গম্বুজ। এখানে পাহারায় থাকতেন রক্ষীরা। খসে পড়ছে ভবনের ভেতর-বাইরের পলেস্তারা। আগাছার ভারে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির কিছু অংশ মাটিতে দেবে গেছে। ভেঙে গেছে দরজা-জানালা ও সিঁড়ি।  

কালের সাক্ষী এই পর্তুগিজ ভবনের পাশ দিয়েই চলাচল করেন শিক্ষার্থী সহ পথচারীরা। ২০০৯ সালে মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর পরিচালিত সমীক্ষায় জানা যায়, ১৫১২-১৬ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে আসে। তারা ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত ছিল। প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর আগে তারা এই ভবনকে দুর্গ ও দরবার ভবন হিসেবে ব্যবহার করতো।  

মহসিন কলেজে সংরক্ষিত নথি বলছে, এই ভবন থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে একটি সুড়ঙ্গপথ তৈরি করা হয়েছিল। পর্তুগিজ জলদস্যুরা লুটকৃত মালামাল সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এনে এখানে রাখতো। শহর ছাড়ার সময় তারা সুড়ঙ্গটি সিলগালা করে দেয়। এখানে পর্তুগিজদের আমোদ-প্রমোদের জন্য একটি প্রমোদশালাও ছিল। প্রতিরাতে সেখানে বসতো নাচ-গানের আসর।  

ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের ইতিকথা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠার পর ১৭৬১ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসকরা এখানে দারুল আদালত নির্মাণ করে। এই ভবন নির্মাণে মোগল ও পাশ্চাত্যের স্থাপত্যকৌশলের মিল রয়েছে’।  

মূলত ইংরেজরা বাংলার শাসন ক্ষমতা লাভ করলে ইংরেজ বণিক ও পাদ্রিদের প্রাধান্য বিস্তারের মুখে পর্তুগিজদের অবস্থান ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তদুপরি দস্যুবৃত্তি ও লুটপাটের জন্য তারা স্থানীয় মানুষের বিরাগভাজন হওয়ায় ক্রমে ক্রমে বিতাড়িত হয়ে ভারতের অপর প্রান্তের পর্তুগিজ অধ্যুষিত গোয়া, দমন, দিউ প্রভৃতি স্থানে চলে যায়।  

তবে এখনো চট্টগ্রামে পর্তুগিজ জাতির মিশ্রিত বংশধারা ও খ্রিস্ট ধর্মচর্চার ক্ষুদ্র একটি স্রোত লক্ষ্য করা যায়, যদিও সেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়াঙ নগরে নয়, শহর ও আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে গেছে।

১৮৩৫ সালে দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিনের ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে গঠন করা হয় মহসিন ফান্ড। মহসিন ফান্ডের টাকায় ১৮৭৪ সালের ২০ জুলাই চট্টগ্রামে একটি মাদ্রাসা (বর্তমান মহসিন কলেজ) প্রতিষ্ঠা করা হয়।  

১৮৭৯ সালে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশ সরকার থেকে পর্তুগিজ ভবনসহ পাহাড়টি কিনে নেয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মাদ্রাসার স্থানে ১৯২৭ সালে কলেজ চালু হলে বেশ কিছুদিন পর্তুগিজ ভবন ছাত্রাবাস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ও আগে এ ভবনে ছিল। ২০০২ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ সময়: ১১০০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ 
এসএস/এসি/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa