ঢাকা, শনিবার, ৮ মাঘ ১৪২৮, ২২ জানুয়ারি ২০২২, ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ফিচার

দক্ষিণাঞ্চলের সবচে বড় নৌকা বাইচ

মাহবুব হোসেন সারমাত | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২৩৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৩, ২০১০
দক্ষিণাঞ্চলের সবচে বড় নৌকা বাইচ

গোপালগঞ্জে দক্ষিণবঙ্গবাসী মেতেছে তিন দিনের নৌকা বাইচ উৎসবে। এটি  দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়ার নৌকা বাইচ উৎসব।

২৩ অক্টোবর শনিবার  থেকে এ নান্দনিক উৎসব শুরু হয়েছে। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে লালিত ২০০ বছরের আকর্ষণীয় এ নৌকা বাইচে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পিরোজপুর, নড়াইল ও বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দু শতাধিক সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা  বাছারী নৌকা অংশ নিয়েছে।

আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে কোটালীপাড়া উপজেলার  বাবুরখালে কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতি বছর নৌকা বাইচ  ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারের বাড়তি আকর্ষণ নৌকায় নৌকায় মেলা ও নারীদের দুটি বাইচের নৌকা।     

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী খান আবু মিয়া প্রধান অতিথি ও উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নৌকা বাইচ উদ্বোধন করেন।

দুপুর থেকে বিচিত্র সাজে সজ্জিত দৃষ্টিনন্দন এসব নৌকা তুমুল বাইচ শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে একের পর এক কুচ। দু কূলে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো সমর্থক ও দর্শক মাল্লাদের সাথে সমবেত হন। তারা উৎসাহ দেন বাইচে। নদীর দু পাড়ে  দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের করতালি ও হর্যধ্বনিতে এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। গোটা এলাকায় সঞ্চারিত হয় উৎসবের আমেজ।

উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, জলাভূমিবেষ্টিত কোটালীপাড়ার জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা। পূজার সময় নৌকা নিয়ে এলাকার মানুষ জমিদার শিবরাম চৌধুরীর বাড়িতে যেতেন।   পূজা দেখে ফেরার সময় নৌকায় নৌকায় পাল্লা হতো। নৌকার মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের চিন্তা থেকে ২০০ বছর আগে স্থানীয়রা নৌকা বাইচের প্রচলন করেন। সে থেকেই লক্ষ্মীপূজার পরের দিন থেকে এ অঞ্চলের নৌকা বাইচ হয়ে আসছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

কদমবড়ি গ্রামের ভবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (৬৫), কুমুরিয়া গ্রামের গৌর চন্দ্র বিশ্বাস (৫৮ ), চাঁনমোহন বিশ্বাস (৪৫ ) বলেন, জন্মের পর থেকে এ নৌকা বাইচ দেখে আসছি। এখানে কখনই কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে বাইচের আয়োজন করতে হয় না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ এলাকার বাইচ হয়ে আসছে।

বাইচ নৌকার মালিক সহদেব বাড়ৈ (৫০ ) জীতেন্দ্রনাথ গাইন (৪০),  রবীন্দ্রনাথ ঢালী (৪৪), সুশান্ত রায় (২৫), প্রভাস মজুমদার (১৮) বলেন, নৌকা তৈরী , সাজসজ্জা, মাঝিমাল্লাদের খাবার, পোশাকসহ  প্রচুর  ব্যয় হয়। এখান থেকে আমাদের কোনও আয় হয় না। শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা এটা করে থাকি। এ কারণেই আমাদের  এ অঞ্চলে এখনো নৌকা বাইচ টিকে আছে।

বাইচ নৌকার মাঝি লালচাঁদ বিশ্বাস (৩০), অসীম বৈদ্য (৩৪), ফুলচাঁদ বাড়ৈ (৩২) বলেন, মানুষকে আনন্দ দিতে আমরা নৌকা বাই। আমরাও  আনন্দ পাই। পারিশ্রমিকের আশায় বাইচে আসি না। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এ কাজ করি।

কালিগঞ্জের নৌকা বাইচ প্রথম দেখতে আশা  খুলনার আবদুস সালাম (৫৫) বলেন, জীবনে অনেক নৌকা বইচ দেখেছি। কিন্তু এখানকার মতো এত বড় ও রাজকীয় ঢঙের নৌকা বাইচ আমি দেখিনি। আমার দেখা নৌকা বাইচগুলোর মধ্যে এটা সেরা ও সবচেয়ে বড়।

গৃহবধূ অঞ্জলি রানী মজুমদার (৪৫), রেনুকা হালদার (৩১), পদ্মরানী বালা (৩২), রিতা বিশ্বাস (২৮) বলেন, বাইচের দিনটি আমাদের কাছে পরম পাওয়ার। এ দিন জামাই-মেয়ে, অতিথি, আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে বেড়াতে আসে। তাদের আদর-আপ্যায়ন করতে করতে আনন্দের মধ্য দিয়ে আমাদের সময় কেটে যায়। গৃহকর্ম সেরে  বিকেলে আমরা  নৌকা বাইচ দেখি। মেলা  থেকে কেনাকাটা সেরে নিই।
 
২৫ অক্টোবর সোমবার তিন দিনের এ নৌকা বাইচ উৎসব শেষ হবে।

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় ২২১০, অক্টোবর ২৩, ২০১০

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa