ঢাকা: দেড় দশকেরও বেশি সময় একনায়কতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে শোষিত হয়েছে দেশ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই ফ্যাসিবাদী শাসনের ইতি ঘটেছে।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একাট্টা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পক্ষগুলোর মধ্যে সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুতে মতের আমিল দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় দেশের সেনাপ্রধান স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, নিজেরা কাদা–ছোড়াছুড়ি, মারামারি ও কাটাকাটি করলে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাপ্রধান যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তা মোকাবিলা করার জন্য ড. ইউনুসের ইমেজই যথেষ্ট। তিনি থাকলে কোনো অপশক্তিই বাংলাদেশ বিরোধী কোনো অপতৎপরতার কথা চিন্তাও করতে পারবে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। টালমাটাল পরিস্থিতিতে সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুভার পড়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাঁধে। যাত্রার শুরু থেকেই এই সরকার পড়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জে। বিভিন্ন গোষ্ঠী-সংগঠন তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পাহাড় নিয়ে প্রতিনিয়ত রাস্তাঘাট অবরোধ করছে। বিভিন্ন ধরনের মব (দলবদ্ধ) সৃষ্টি করে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে সরকারের কাজকে। পুলিশ-প্রশাসন প্রয়োজনীয় সক্রিয়তা দেখাতে পারেনি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো নানাভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র থেকেও পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় সহায়তা। এত ‘না’ সত্ত্বেও দমে যাননি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
অভ্যন্তরীণ এমন পরিস্থিতির মধ্যে বহির্শক্তির তৎপরতার কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার কথাও ভাবতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। সচেতন মহলের মতে, এক্ষেত্রে যে ধরনের প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দরকার, তাতে অধ্যাপক ইউনূসের বিকল্প হিসেবে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক পরিসরে কোনো বাংলাদেশির কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি করলে সেটা হবে ড. ইউনূসেরই।
ইতিহাস টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে যে শূন্যতা চলছে, এর আগে এমনটা দেখা গিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরপরই। তখনো দেশে এ ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। পরে ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও বাংলাদেশে তেমনই একজন আইকনিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ছিল। আর সেই শূন্যতা পূরণের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।
বিদেশে অধ্যাপক ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা
একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। নোবেলজয়ীর ক্লাবে নাম লিখিয়ে ড. ইউনূস নিজেকে শুধু অনন্য উচ্চতায় উত্তীর্ণ করেননি, বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে চিনিয়েছেন বাংলাদেশকে। নোবেল পাওয়ার পর থেকেই সমগ্র বিশ্বে অনেক বড় পরিসরে অতিথি বা সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আসন অলংকৃত করে আসছেন। অলিম্পিক থেকে শুরু করে বহুজাতিক অনেক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে শুধু নিজে সমাদৃত হননি, হয়েছেন বাংলাদেশের পতাকাবাহীও।
শান্তিতে নোবেল জয়ের পাশাপাশি অধ্যাপক ইউনূসের ‘স্যোশ্যাল বিজনেস’ বা ‘সামাজিক ব্যবসা’ তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। সেই সুবাদে বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। বিশ্ব পরিমণ্ডলে অধ্যাপক ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা কতটা, তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর।
প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে শুরু করে চীনের মতো বিপরীতমুখী শক্তিগুলোও সরকারকে স্বাগত জানায়। ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। বিশ্বের বহু দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অধ্যাপক ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা দেন।
ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সময় সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৭ জন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত হয়েছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক ইউনূসের অনুরোধে অতি অল্প সময়েই দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান তাদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা ও মুক্তি দেন। অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর পাকিস্তান সফর শেষে দেশে ফেরার সময় পাঁচ ঘণ্টার যাত্রাবিরতি দিয়ে বাংলাদেশ ঘুরে যান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
অনেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। ট্রাম্পের বিশ্বস্ত এবং তার সরকারের সরকারি কর্মদক্ষতা দপ্তরের দায়িত্ব পাওয়া বিশ্বের সফলতম টেক উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের সঙ্গে অধ্যাপক ইউনূসের রয়েছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ। বাংলাদেশে স্টারলিংকের ইন্টারনেট চালু করতে যোগাযোগও হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ সফরেরও সম্ভাবনা রয়েছে ইলন মাস্কের। এ ছাড়াও অধ্যাপক ইউনূসের অনুরোধে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আগামী ১৩ মার্চ চার দিনের সফরে আসছেন বাংলাদেশে। বৈশ্বিক পরিসরে তার যোগাযোগের এমন বহু নজির রয়েছে।
জাতিসংঘ সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূসের অর্জন
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দেড় মাসের মাথায় জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেয় বাংলাদেশ। তাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ওই সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। মাত্র চার দিনের সফরে অধ্যাপক ইউনূস তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ ১২টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর পাশাপাশি অধিবেশনের সাইডলাইনে ৪০টি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন।
নানা কারণে অধ্যাপক ইউনূসের এই সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা তখন বলছিলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের এক ধরনের দূরত্ব বিরাজ করছিল। তবে অধ্যাপক ইউনূসের ওই সফরে সেই সংকট অনেকটাই কেটে যায়। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকট অনেকটাই কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন অধ্যাপক ইউনূস। এর সঙ্গে তিনি পরিবর্তিত বাংলাদেশ নিয়ে তার সংস্কারের ধারণাও তুলে ধরেন।
জাতিসংঘ সম্মেলনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন অধ্যাপক ইউনূস। এই সফরে তিনি মোট ৪৭টি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি চারজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, চারজন মন্ত্রিপর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি, জাতিসংঘ বা সদৃশ সংস্থার ১০ জন প্রধান বা শীর্ষ নির্বাহী, ১০ জন সিইও বা উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব, নয়টি আয়োজিত অনুষ্ঠান (আনুষ্ঠানিক নৈশভোজ এবং মধ্যাহ্নভোজ), সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত আটটি আয়োজন এবং আরও দুটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন বলেও জানা যায়।
সেই সফরে একটি অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানকালে আত্মদানকারীদের দেশপ্রেমের বর্ণনা দেন ড. ইউনূস। যার একটি ভিডিও তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওতে ড. ইউনূসের বক্তব্যের সময় অতিথিদের নির্বাক হয়ে গভীর মনোযোগে শুনতে দেখা যায়।
সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যে কৌশলী
ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর ৬ আগস্টই অধ্যাপক ইউনূস ভারতের সংবাদমাধ্যম এনিডিটিভিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ততক্ষণে তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়ার খবর সামনে চলে আসে। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি অস্থিতিশীল থাকে, তা মিয়ানমার এবং সেভেন সিস্টার্সে (ভারতের উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্য) ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, এদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে, ফলে এটি বাংলাদেশের চারপাশে এবং মিয়ানমারে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো হবে। আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং যদি তা অর্জন করা না যায়, তাহলে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়বে।
অধ্যাপক ইউনূসের ওই বক্তব্যে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায়ের ক্ষেত্রে তার কৌশলী চিন্তার বিষয়টি সামনে আসে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতীয় মিডিয়াগুলো বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার চালানো শুরু করে। এর মধ্যেই ডিসেম্বরে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠক করেন। ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের অপপ্রচার, হস্তক্ষেপ ও উসকানির বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ারও পরামর্শ দেয় দলগুলো।
জানুয়ারিতে রাজবাড়ীতে সেনাবাহিনীর এক অনুশীলনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনা সদস্যদের সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। এর আগে ডিসেম্বরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখতে সর্বোচ্চ দেশপ্রেম, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করবেন-এটাই সকলের প্রত্যাশা। অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের সময়ে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের কয়েকটি স্থানে বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও বিজিবির বাধার মুখে পিছু হটে।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের কান্ডারি
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষক হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে নিজের ক্ষুদ্রঋণ তত্ত্বে ভর করে সুখে-শান্তিতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন ড. ইউনূস। সেই সুযোগ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসে গেছেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান যেমনি তিনি নিজে তৈরি করেছেন, তেমনই বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দেশের অর্থনীতিকেও করেছেন শক্তিশালী। সৃষ্টি করেছেন কর্মসংস্থান এবং ব্যবস্থা করেছেন আত্মকর্মসংস্থানের।
বহির্বিশ্বে যার এত সম্মান, দেশের মাটিতে টিকে থাকতে তাকে অনেক কাঠগড় পোহাতে হয়েছে। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের রোষানলে পড়ে নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকও ছাড়তে হয়েছিল তাকে। অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলা করতে হয়েছে। তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রম আইনের একটি হয়রানিমূলক মামলায় ছয় মাসের সাজা পর্যন্ত হয়েছিল তার। এই বয়সেও আসামি হিসেবে দাঁড়াতে হয়েছে লোহার খাঁচায়। দৌড়াতে হয়েছে আদালতের বারান্দায় বারান্দায়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, হাসিনার রক্তচক্ষুর ভয়ে দেশমাতৃকার মায়া ছেড়ে চলে যাননি অধ্যাপক ইউনূস। যে দেশকে তিনি এত ভালোবেসেছেন, সেই দেশের মানুষ একদিন প্রতিদান হয়তো দেবে, সেই আশাতেই বুক বেঁধেছিলেন। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের বিদায়ের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অবতীর্ণ হন জাতির কান্ডারি হিসেবে। শেষ বয়সে দেশকে খাদের কিনারা থেকে রক্ষা করতে তার কাঁধেই গুরুভার তুলে দেয় ছাত্র-জনতা।
তরুণদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা ইউনূসের সংকট মোকাবিলা, সংস্কার ধারণা
দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূসের নেওয়া নানা সংস্কার পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক সমর্থনই বলে দেয়, সংকটে কতটা অপরিহার্য ছিলেন তিনি। অনেকেরই শঙ্কা ছিল, পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানে অসংখ্য সামরিক-বেসামরিক লোকজনকে যেভাবে জীবন দিতে হয়েছিল, একই প্রেক্ষাপট হতে পারতো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিদায় নেওয়ার পর। তবে প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ইউনূসের আবির্ভাব দেশকে এমন সংকট থেকে রক্ষা করেছে। কারণ ‘বিদেশি কোনো প্রভাবে বা প্রলোভনে’ কোনো পক্ষ বা শক্তির মননে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ থাকলেও সামনে ড. ইউনূস থাকায় তাদের ভাবতে হয়েছে এবং নিরুৎসাহিত হতে হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, ড. ইউনূসকে চ্যালেঞ্জ বা প্রতিপক্ষ করে কারও ‘অর্জন’র সম্ভাবনা যেমন শূন্য, তেমনি বৈশ্বিক পরিসরে তাদের একেবারে ‘একঘরে’ হয়ে পড়ারও ঝুঁকি শতভাগ।
সচেতন মহল মনে করে, দেশি-বিদেশি যে ষড়যন্ত্র গত সাত মাসে মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তা হয়তো অধ্যাপক ইউনূস ছাড়া আর কারও পক্ষে সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। হয়তো আরও রক্তপাত হতো। এমনকি বিপন্ন হতে পারত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা। সেসব চ্যালেঞ্জ তিনি মোকাবিলা করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। এমনকি এসব মোকাবেলায় তেমন কঠোরতাও দেখাননি।
স্বৈরাচার হাসিনার দেড় দশকেরও শাসনকালে দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দেওয়া হয়। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে করে ফেলা হয় অন্তঃসারশূন্য। প্রকল্পের নামে লুটপাট করা হয় লাখো কোটি টাকা। খাদের কিনারে নিয়ে যাওয়া সেই অর্থনীতি শক্তিশালী করতে অধ্যাপক ইউনূস নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে রিজার্ভে সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তৈরি হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা। দুর্নীতি প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এসব পদক্ষেপের ফল স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিগত প্রায় সাত মাসে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জনপ্রশাসন, পুলিশসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। এরইমধ্যে ছয়টি কমিশন প্রতিবেদন দিয়েছে। সেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটা ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পদক্ষেপ শুরু হবে। রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিক হলে এই সংস্কার প্রক্রিয়া দেশে ভবিষ্যতে গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ক্ষমতা ধরে রাখার খায়েশ নেই, জাতির জন্য সুযোগ
অধ্যাপক ইউনূস বারবারই বলেছেন, তার ক্ষমতা ধরে রাখার ইচ্ছা নেই। ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতি তার যে বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ অন্যরাও তা বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন। বারবারই তিনি নির্বাচনের কথা বলছেন। এরইমধ্যে তিনি সম্ভাব্য সময়ও বলে দিয়েছেন। তবে নির্বাচনের আগে কিছুটা সংস্কার তিনি চান।
তিনি বারবার বলেছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পাওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ হাতছাড়া হলে বাংলাদেশের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। এটা কোনো রাষ্ট্র আর থাকবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশ, গণতন্ত্র, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসনের স্বার্থে এবং ৫৩ বছরের জঞ্জাল দূর করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের স্বার্থে অধ্যাপক ইউনূসের পাশে থাকার প্রয়োজনীয়তা সামনে চলে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তার পাশে থাকলে তিনি শক্ত হাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারবেন। দেশি-বিদেশি অপশক্তিও তার অগ্রগতির পথে বাধা হতে পারবে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধ্যাপক ইউনূসের পাশে থাকলেই বাঁচবে বাংলাদেশ। রক্ষা পাবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা। শক্তিশালী হবে অর্থনীতি। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে গণতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠিত হবে সুশাসন। এই সুযোগ জাতি হিসেবে সব রাজনৈতিক দল, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, তরুণ ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ সবাইকে কাজে লাগাতে হবে। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই সুযোগ কাজে না লাগালে জাতি হিসেবে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হবে।
বাংলাদেশ সময়: ০১৪৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৫
কেআই/আরএইচ/এজে