শনিবার (০৬ মে) দিনগত রাতে পুরো এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এপার-ওপারের হোটেল, ফেরির ক্যন্টিন কোথাও ইলিশ নেই। হোটেলগুলোতে কোনো বাস থেকে যাত্রী নামলে বা জ্যামের কারণে কোনো বাস দাঁড়ালেই শুরু হয় হাঁকডাক, এই খিচুড়ি ইলিশ, গরম গরম তাজা ইলিশ, পদ্মার ইলিশ, ভাজা ইলিশ।
জিভে জল আসা এমন হাঁকডাক শুনে ক্রেতাও ‘বোকা’ বনে যাচ্ছেন মুহূর্তেই। কেননা, যে মাছগুলো পদ্মার ইলিশ ভেবে দেখে নিয়ে ভেজে নিয়েছেন পাতে, মুখে দেওয়ার মাত্রই ভ্রু কুঁচকে উঠছে। ঠাহর হচ্ছে, মসলা মাখা টুকরো মাছগুলো যা ইলিশের মতোই দেখতে ছিলো, আদতে তা অন্য কিছু।
অন্তত ২০টি হোটেলের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন তথ্যই। হাঁকডাক করে আসলে ক্রেতাদের সঙ্গে রীতিমত প্রতারণাই করা হচ্ছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে এ রুটে প্রতিদিনই লাখো যাত্রী যাতায়াত করেন। এছাড়া ঢাকা থেকেও অনেক পর্যটক প্রায় প্রতিদিনই আসেন এখানে। পদ্মার ইলিশের প্রতি তাদের সবারই ব্যাপক চাহিদা থাকে। আর এ সুযোগটিই নেয় অধিকাংশ হোটেল-ফেরি-লঞ্চের ক্যান্টিনগুলো।
জানা গেছে, পদ্মার ইলিশের নামে যে মাছগুলো পরিবেশন করা হয়, তা মূলত সংকরায়ণ করা। বিদেশি প্রযুক্তিতে কৃত্রিমভাবে চাষ করা। আবার অনেক মাছ মায়ানমার বা অন্য দেশ থেকেও আসে। শ্যাডো ইলিশ নামেই এগুলো পরিচিত। অনেকেই এগুলোকে চান্দনী ইলিশ বা রুপালি ইলিশও বলেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এ মাছগুলো পদ্মার ইলিশ বা অন্য দেশের কোনো এলাকার ইলিশের চেয়ে বেশি চওড়া। দেখতেও ইলিশের চেয়ে চকচকে। আঁশটেও অনেক পাতলা। আর খেতে সুস্বাদু তো নয়ই বরং কিছুটা অস্বস্তিকর গন্ধও রয়েছে। আবার কিছু ইলিশ রয়েছে দেখতে একদম পদ্মার ইলিশের মতো কিন্তু মুখে নিলেই তফাত বোঝা যায়।
ক্রেতা সাধারণের সঙ্গে এ প্রতারণা চলছে একেবারে প্রশাসনের নাকের ডগায়। কেননা, পদ্মাপাড়ে বিষয়টা অনেকটা ওপেন সিক্রেটের মতো। সব সময়ই পুলিশের সবর উপস্থিতি থাকে এখানে। অথচ কেউ কিছু বলে না।
স্থানীয়রা বলছেন, এমন প্রতারণা বিরুদ্ধে কখনও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
হোটেল গ্রামীণ পরিবেশের কর্মচারী আফজাল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, পদ্মার তো নেই, বরিশালের ইলিশও নেই। এগুলো সব দেশের বাইরেই চলে যায়। মাঝে মধ্যে চাঁদপুরের ইলিশ আসে, তবে তা খুব কম।
‘এখানে যেসব ইলিশ খাওয়ানো হয়, তার সবই ‘নকল’ ইলিশ, চান্দনী ইলিশ। এগুলো দেশের বাইরে থেকে আসে। আর দেশের ইলিশের মধ্যে কেবল চট্টগ্রামের ইলিশ পাওয়া যায়। তবে এটা মোটেও স্বাদের নয়। ’
তিনি বলেন, কিছু করার নেই। মানুষের অনেক চাহিদা। চান্দনী ইলিশ ২শ টাকা কেজি দরে কেনা যায়। যেখানে প্রমাণ সাইজ পদ্মার ইলিশের কেজি ১ হাজার ৫শ টাকার ওপরে। তাই সবাই এটাকেই পদ্মার ইলিশ বলে চালিয়ে দিচ্ছে।
ভাষা শহীদ বরকত ফেরির ক্যান্টিন বয় ইমরান খান বলেন, নকল ইলিশগুলো ভাজা হয়। আর আসল ইলিশ রান্না করা হয়। তাও আসল ইলিশ বলতে চট্টগ্রামের ইলিশ। তবে, ভাজা ইলিশের চাহিদাই বেশি। ফেরি বা লঞ্চের ক্যান্টিন কিংবা হোটেলগুলোতে ইলিশ-ভাত, সবজি-ডাল প্যাকেজ হিসেবে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পরিবেশন করা হয়।
শুধু যে এ প্রতারণাই হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এখানে খাবার হোটেলগুলোতে খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না হয়। আর পরিবেশনও হয় একই পরিবেশে। ফেরি বা লঞ্চের ক্যান্টিনগুলোতে (দুই একটা বাদে) খুবই ঘিনঘিনে পরিবেশ। হোটেলগুলোর অবস্থাও ধুলোময়। সবকিছু মিলিয়ে পদ্মাপাড়ে খাবার নিয়ে রীতিমত অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ নিয়মিত যাতায়াতকারীদের। অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে এ খাবারগুলোই খেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ সময়: ১০২২ ঘণ্টা, মে ০৭, ২০১৭
ইইউডি/ওএইচ/এসএনএস
** মধ্যরাতেও ভোগান্তি ঘাটে